ওদের মুখে দেশপ্রেমের কথা মানায় না

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেটাকে কেন্দ্র করে এখনই শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমি দু-একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই।

আজ আমরা যে অর্থনৈতিক উন্নতির কোঠায় এসে পৌঁছেছি এবং যে হারে এগিয়ে যাচ্ছি তাতে ২০২৫ সালে আমাদের ৫০০ বিলিয়ন ডলার জিডিপি হবে। যেটা ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের চেয়ে বেশি। আজ আমাদের অর্থনীতি এ রকম পর্যায় এসেছে যে আমরা শুধু এগিয়ে যাব। আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। আজ আমাদের জিডিপি প্রায় ৩৭৫ বিলিয়ন ডলার। আমাদের মাথাপিছু আয় বর্তমানে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার। পদ্মা সেতু হয়েছে এবং অন্যান্য ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে যা প্রণিধানযোগ্য। পদ্মা সেতু কীভাবে হলো সারা দেশ সারা পৃথিবী তা জানে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বের ফলেই আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। তবে নিজস্ব অর্থায়নে এমন একটি সেতু নির্মাণ করতে যাওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। আর বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। কারণ পদ্মা বহুমুখী সেতু কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই বদলে দেবে। ২০৩৫-৪০ সালে বাংলাদেশ যে উন্নত দেশ হবে, সে ক্ষেত্রেও এ সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছিলেন তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না নেওয়ায় এবং অবসরের বয়সসীমা না মানায় বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের ওই পদ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছিল। যেহেতু তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী হতে পারেন না, সেজন্য আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট, বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী চেরি ব্লেয়ার সবাই মিলে অনুরোধ করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনটাকে পরিবর্তন করে বয়সের সীমা বাড়িয়ে যেন তাঁকে গ্রামীণ ব্যাংকের একই পদে বহাল রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁদের এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি। যখন এটা হলো না তখন বিশ্বব্যাংক আমাদের সমাজের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটা মিথ্যা মামলা দিল যে পদ্মা সেতু অর্থায়নে তাঁরা দুর্নীতি করেছেন! তাঁদের শুধু মানহানি করাই হলো না বরং সমাজের কাছে তাঁদের অন্যায়ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হলো। এক বছরের ভিতরেই কানাডার আদালত বিশ্বব্যাংকের দেওয়া দুর্নীতি মামলার অভিযোগ নাকচ করে দিল। আর বলা হলো, আপনাদের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এটা একটা মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা। এ কথাগুলো আজ বলার প্রয়োজন আছে বলে আমি বলছি। এ ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণ, দেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে নিজ অর্থায়নে এ পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন। এর দুই বছর পর বিশ্বব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্ট কৌশিক বসু ঢাকায় এসে বলে গেলেন যে তাঁরা ভুল করেছিলেন। ভুল হতেই পারে কিন্তু এও স্বীকার করতে হবে যে বিশ্বব্যাংক সারা পৃথিবীতে যে কাজ করছে, সাহায্য করছে, আর্থিক সহায়তা করছে যা কি না এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী ধরে মানবসভ্যতাকে এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে কাজ করে যাচ্ছে সেটা আমরা কৃতজ্ঞতাসহকারে স্মরণ করছি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অনেকেই অনেক ধরনের মন্তব্য করছেন। বিএনপি মহাসচিব ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে দেশ শ্রীলঙ্কার মতো হবে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ চলে যাবে।

নির্বাচন কেন্দ্র করে সমালোচনা বা বিরোধিতা হবে সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক এবং অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। যেভাবে কথা বলা হচ্ছে তেমনটি বাংলাদেশ কিছু লোকে চেয়েছিল ১৯৭৫ সালের পর। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তারা দেশে সামরিক শাসন নিয়ে এলো। বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারকে যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো তার কোনো বিচার হলো না। বরং বিচারিক প্রক্রিয়া বন্ধে একটা আইন করা হলো অর্থাৎ ‘ইনডেমনিটি আইন’ জারি হলো যাতে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার না করা হয়। আর এটা করলেন কে? জিয়াউর রহমান। এবং খুনিদের বিভিন্ন দেশে কূটনীতিবিদ করে পাঠানো হলো। অনেক দেশ তাদের অগ্রাহ্য করেছে, তাদের পোস্টিং গ্রহণ করেনি। সেই সামরিক ও আধাসামরিক শাসনে ২১ বছর বাংলাদেশে কী হয়েছে- যাঁরা কথা বলছেন তাঁরা নিশ্চয় অবগত আছেন। তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত ছিল? শতকরা ১.৫ থেকে ২-এর বেশি হয়নি। তখন আমাদের সার্বিক অর্থনীতি কেমন ছিল তা আমাদের জানা আছে। আমাদের মাথাপিছু আয় কত ছিল তা-ও জানা আছে। সব মিলিয়ে আমি বলার চেষ্টা করছি যে এ কথাগুলোর ভিতরে রাজনীতি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু না বলাই ভালো। এতে মঙ্গল বয়ে আনবে না। ১৯৭৫ সালের আগে সেই বাসন্তীর জালের ইতিহাসের মতো আরও কিছু ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল। নারী নির্যাতন এবং তাদের নিয়ে রাজনীতি করা হলো সেই বাসন্তীর জালের মতোই। বাংলাদেশের মানুষ এখনো ভোলেনি যে সারের জন্য যখন মানুষ বিএনপি প্রশাসনের কাছে গিয়েছিল তখন গুলি করে ২১ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। এও মানুষ জানে যে কোনো ইলেকট্রিসিটির আয়োজন না করেই ঢাকা-চট্টগ্রাম ইলেকট্রিসিটির পোল লাগানো হলো; কিন্তু কোনো সংযোগ নেই! এগুলো কে বা কারা করেছে তা দেশের মানুষ জানে। দেশের মানুষ আরও জানে যে ১৫ আগস্ট বেগম জিয়ার জন্মদিন নয়, কিন্তু প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ওইদিনই তিনি জন্মদিন পালন করেন। একটা রাষ্ট্র প্রশাসনকে খুব ভেবেচিন্তে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশের ভিতরে মানুষের ভিতরে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। যে রকম বাসন্তীর জালের কথা বলে বিদ্বেষ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। যিনি বাসন্তীর জাল লিখেছিলেন পরবর্তীতে তিনিই স্বীকার করেছিলেন যে এটা মিথ্যা ও বানোয়াট ছিল। উদ্দেশ্য একটাই- সরকারকে নিচু করা, ছোট করা, মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা।

আমি জানি, যারা এ দেশে এখন কথা বলছেন তখন কিন্তু তাদের কথা আমি শুনিনি। আমি দেশে ছিলাম, বিদেশে ছিলাম। সামরিক শাসনের সময় প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে দেড় শ থেকে দুই শ ক্যাম্প করেছিল উলফাসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপ। আর এটা হয়েছিল জিয়াউর রহমান ও বেগম জিয়ার শাসনামলে। তারা ভারতের উত্তর-পূর্ব বিভিন্ন রাজ্য থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ে এসে তাদের খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিত এবং পাকিস্তানের আইএসআইয়ের মাধ্যমে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে গোলাবারুদসহ ভারতে পাঠিয়ে দিত বিধ্বংসীমূলক কর্মকান্ড করার জন্য। এটা আন্তর্জাতিক ও আমাদের দেশি আইনের লঙ্ঘন।

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি শেখ হাসিনা সরকার ১৯৯৬ সালের জুনে ক্ষমতায় এসেই এ ক্যাম্পগুলো বন্ধের ব্যবস্থা করল। ১৫০টি ক্যাম্প বন্ধ করা হলো এবং সেখানে পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও ইউএস ডলারের সঙ্গে আইএসআইয়ের এজেন্টদের ধরা হলো। আমরা ক্যাম্প ভাঙা শুরু করেছিলাম ১৯৯৭ সালে। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে উলফার জেনারেল সেক্রেটারি অনুপ চেটিয়াকে দুই সহযোগী লক্ষ্মীপ্রসাদ ও বাবুল শর্মাসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। ২০০৯ সালের শেষ দিকে উলফার চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়াসহ সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব নেতাকে বাংলাদেশ থেকে ধরে ভারতে হস্তান্তর করা হয়। যেসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারতবিরোধী কাজ করছিল তাদের একে একে ধরে গ্রেফতার করে, জেল থেকে বের করে ভারতকে দিয়ে দেওয়া হলো।

আজ বাংলাদেশ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনোরকম ধ্বংসাত্মকমূলক কর্মকান্ড হচ্ছে না। শেখ হাসিনা সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন যে স্বদেশে যাতে বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রের বিপক্ষে এ রকম ভয়ংকর কর্মকান্ড আর না হয়। কাজেই যারা দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি করতে দিয়েছেন, তাদের ভাবতে হবে- দেশপ্রেমের কথা তাদের মুখে মানায় না। আপনারা রাজনীতির কথা বলেন, রাজনীতির উন্নতির কথা বলেন, দেশের উন্নয়নের কথা বলেন কিন্তু দেশপ্রেমের কথা না বলাই ভালো। দেশের মানুষকে কীভাবে সংগ্রাম করতে হবে, কীভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এটা যারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি তারাই ভালো জানে। ভুলবেন না যে প্রথমবার আর্মি রুলের সময় জিয়াউর রহমান এবং বেগম জিয়া কত মুক্তিযোদ্ধাকে চাকরিচ্যুত করেছেন কোনো কারণ ছাড়াই। আর্মি থেকে ১৬ জন ব্রিগেডিয়ার, অগণিত কর্নেল-মেজর, অনেক মুক্তিযোদ্ধা, সিভিল সার্ভিস এবং ব্যাংকার্স- এ রকম শত শত মানুষকে বিনা কারণে চাকরি থেকে অবসর দিয়েছিলেন। তাঁদের একমাত্র অপরাধ, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। এ ইতিহাসগুলো আমি বলছি এ জন্য যে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি দেখেছি, আমি চাক্ষুষ তার সাক্ষী। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তার প্রতিবাদে ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরের ১৩ ও ১৭ তারিখ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স ((BILIA) দুটি সেমিনার আয়োজন করলাম। Politics of the Generals and Military Intervention in Developing Countries শীর্ষক ওই সেমিনারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। তখন বিলিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত কূটনীতিবিদ, আইনজীবী ও লেখক কামরুদ্দীন আহমদ। আমি ছিলাম বিলিয়ার আজীবন সদস্য। তাঁকে নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করলাম। তখন মোজাম্মেল হক সাহেব অক্সফোর্ড থেকে এসেছিলেন, তিনি প্রোগ্রামে একটা পেপার পড়েছিলেন। সেখানে আমার সঙ্গে ছিলেন আমার সহকর্মী প্রয়াত মঞ্জুরুল আলম ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। সে সেমিনারটি করতে অনেক রকমের অসুবিধা হচ্ছিল। কেউ সাহস পাচ্ছিল না। আমরা সেটা করলাম।

সেই মিটিং থেকে এসে পরদিন আমি মিনিস্ট্রিতে গেলাম। তদানীন্তন পররাষ্ট্র সচিব রাজাকার তবারক হোসেন আমাকে একটি নোটিস দিলেন। নোটিসে উল্লেখ ছিল আমি কেন সেই মিটিং করলাম। তিনি আমিসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে রীতিমতো কোণঠাসা করে ফেললেন। তখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি চেষ্টা করছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করতে।

আমি বললাম যেটা করেছি ঠিক করেছি। তখন ফরেন সেক্রেটারি আরও বললেন, তুমি ছোট্ট একটা মুচলেকা দাও যে তুমি এটা ভুল করেছ। আমি বললাম, ‘দেখুন আমি মুচলেকা দেব না, আই ডিড দ্য রাইট থিঙ্ক।’ যাই হোক, কিছুদিনের মধ্যেই দেখি আমাকে ওএসডি করা হয়েছে। আমি হলাম সেকেন্ড ওএসডি। প্রথম ওএসডি ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তাঁর অপরাধ, তিনি কেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় দিলেন ১৫ আগস্টের পর। এ ইতিহাসগুলো আমরা ভুলিনি। কাজেই যখন আপনারা দেশপ্রেমের কথা বলবেন তখন ভাবতে হবে এবং যখন বলছেন বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ চলে যাবে সেটা আপনারাই ভাবতে পারেন যারা বাসন্তীর জাল নিয়ে রাজনীতি করেছিলেন। তাদের মুখে এগুলো ভালো শোনায় না। এগুলো হলো ‘ভূতের মুখে রাম নাম’। জনগণ আর এগুলো গ্রহণ করবে না। মানুষ শান্তি চায়, মানুষ শান্তিতে আছে। মানুষ উন্নয়ন চায় উন্নয়ন পেয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে মানুষ ভালো থাকতে চায় ভালো আছে। আজ গ্রামে-গঞ্জে যে উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নতি যারা এসব কথা বলছেন তাদের গ্রামে গিয়ে দেখে আসা উচিত।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ট্রাজেক্টরি আমাদের দিয়েছে তাতে আমাদের যে প্রবৃদ্ধি সেটা চলবে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এবং যাব।

কাজেই নির্বাচনের দোহাই দিয়ে যে কথাগুলো বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়। জনগণকে উসকানি না দেওয়াটা ভালো হবে। এতে মঙ্গল বয়ে আনবে না। আমরা সবাই চাই নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। আমি মনে করি সরকার এ ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের সরকার এবং তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ করে চলে। বঙ্গবন্ধু যেমন সব সময় দেশের কথা, জনগণের কথা চিন্তা করে কাজ করে গেছেন তাঁর সুযোগ্য কন্যাও সে পথে হাঁটছেন। তিনি এবং সঙ্গে যাঁরা সরকারি দলে দেশ চালাচ্ছেন তাঁরা ভেবেছেন, ভাবছেন আগামীর জন্য বাংলাদেশের যে গন্তব্যপথ ঠিক করা হয়েছে সে পথে আমরা কীভাবে এগিয়ে যাব। গণতান্ত্রিক পথেই আমরা এগিয়ে যাব, অগণতান্ত্রিক পথে নয়। যা নিয়ে আমাদের বন্ধুরা অনেক সময় গর্ববোধ করেন এবং সেগুলো তারা ভেবেছেন দেশের লোক ভুলে গেছে কিন্তু ভোলেনি। বাসন্তীর জাল বাংলার ইতিহাসে লেখা থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যারা কাজ করেছে, যারা যুদ্ধাপরাধী তাদের বিচার হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেটা নুরেমবার্গ ট্রায়ালের আদলে সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে যখন কাদের মোল্লা ও মুজাহিদকে ফাঁসি দেওয়া হলো, তখন জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিও সে ফাঁসিকে গ্রহণ করেনি। পাকিস্তান পার্লামেন্টে সেই ফাঁসির বিরুদ্ধে একটা রেজুলেশন করা হয়েছে যে তারা ছিল সাচ্চা মুসলমান, সাচ্চা পাকিস্তানি। দেশের মানুষ সব বোঝে, সব জানে। ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে অবৈধ মিলিটারি শাসনের সময় ফাঁসি দেওয়া হলো সেটাও কিন্তু বাংলার ইতিহাসে লেখা থাকবে। যার জন্য প্রয়াত বিচারপতি কে এম সোবহান প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি সেই মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন। এর ফলে তাঁকে জোরপূর্বক অবসর দিয়ে পূর্ব জার্মানিতে [বর্তমানে বিলুপ্ত] বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হলো। এ ইতিহাসে বাংলাদেশ ফিরতে চায় না। এগুলো আমি মনে করাচ্ছি এ কারণে যে যারা আপনারা বিভিন্ন সময়ে কথা বলছেন তারা ইতিহাস ভুলবেন না। ইতিহাস মনে রাখবেন। তবে হ্যাঁ, সরকার চালাতে গেলে ভুলভ্রান্তি হবে, এটা সব ক্ষেত্রেই হয় কিন্তু সেটাকে উসকানি দিয়ে জনগণের মধ্যে না ছড়িয়ে আপনারা গঠনমূলক আইডিয়া দিয়ে সাহায্য করুন। কারণ এ দেশে তিনি একা বাস করেন না, এ দায়িত্ব তাঁর একার নয়, এ দেশ আমাদের সবার, দায়িত্বও সবার। নির্বাচন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল সঠিক উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অনেকেই অনেক ইচ্ছা ব্যক্ত করতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলো মতামত দিতে পারে। তবে কোন পদ্ধতিতে ভোট হবে, নির্বাচন কমিশনই সে সিদ্ধান্ত নেবে।

নির্বাচন নিয়ে যেসব বিতর্কমূলক কথাবার্তা বলছে বিএনপি ও তাদের দোসররা; এগুলো মানুষের মনে একটা নির্বাচনবিরোধী চিন্তার উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। সরকার নির্বাচন চায়, দেশের মানুষ নির্বাচন চায়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে এবং সময়মতোই হবে।

ওয়ালিউর রহমান
লেখক : ফরগোটেন ওয়ার : ফরগোটেন জেনোসাইড।