পদ্মা সেতু ও পাকিস্তানের গণমাধ্যম

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস
চাটুকারিতা তৈল মর্দন বা মোসাহেবি শব্দগুলো সমাজে বহুল প্রচারিত। অফিস-আদালত আর রাজনীতির মাঠে প্রায়শই এগুলোর দেখা মেলে। বিশেষ করে দলীয় রাজনীতিতে পদ-পদবি টিকিয়ে রাখতে এগুলোর প্রয়োগ খুবই লক্ষণীয়। ‘প্রশংসা’ শব্দটির সঙ্গে এগুলোর তুলনা করা কখনও সঠিক নয়। প্রশংসার সঙ্গে ‘সত্য’ শব্দটির সম্পৃক্ততা রয়েছে। অন্যগুলো মিথ্যার মোড়কে বাঁধা। চাটুকারিতার সঙ্গে সত্যের কোন লেশ খুঁজে পাওয়া যায় না। চারদিকে শুধুই মিথ্যার বেসাতি। মিথ্যা খুবই ক্ষণস্থায়ী সত্য দীর্ঘস্থায়ী। গোয়েবলস মিথ্যাকে সত্য বলতে বলতে কখনও মনে হয় মিথ্যা বুঝি সত্য হয়ে গেল। মিথ্যা শেষ বিচারে মিথ্যাই থেকে যায়। যেমন হিটলার শেষ বিচারে হিটলারই থেকে যায়। শান্তির দূত হতে পারেননি। ধ্বংসের প্রতীক হয়েই বিশ্ব ইতিহাসে চিহ্নিত রয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখনও সমাজে, রাষ্ট্রে গোয়েবলসদের কিন্তু অভাব নেই। তারা সক্রিয়। বিফলতাই তাদের শেষ পরিণতি।

তবে এটাও সত্য যে, প্রশংসা কিন্তু শুধু মিত্ররাই করেন না। বিবেকের তাড়নায় এককালের শত্রুরাও কারও প্রশংসা করে থাকেন। কোন বিবেকবান মানুষ তা না করে পারেন না। যেমনটি পারেননি পাকিস্তানের পাঞ্জাবের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক মালিকা-ই-আবিদা খাত্তাক। পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা ‘ডেইলি টাইমস’ ও ‘উইকলি ফ্রাইডে টাইমস’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তাঁর নিবন্ধে। তাঁর নিবন্ধটির নাম ‘বাংলাদেশে পদ্মা সেতুর গল্প : একটি সেতুর চেয়ে বড়’। তাঁর নিবন্ধে মালিকা বলেন, ‘পদ্মা সেতুর মতো অবকাঠামো নির্মাণ করে বাংলাদেশের উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক শেখ হাসিনা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং আস্থা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ আনলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন- ‘আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করব।’ কানাডার একটি আদালতে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ আনলে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশের মুষ্টিমেয় কিছু লোক দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করে দুর্নীতির অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা তা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রসঙ্গে মালিকা আরও বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংক দাতা সংস্থাগুলো অর্থায়নে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় একসময় পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তখন সমালোচকরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনোভাব প্রকাশ করেছিল। এ ষড়যন্ত্রকারীরা গুজব ছড়াতে লাগল। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে। সবটাই মিথ্যা প্রমাণিত করে বঙ্গবন্ধুকন্যা সেতুটি নির্মাণ করেছেন।’

এখন প্রশ্ন হলো পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন নিয়ে যেসব বিতর্ক আজ দেশের রাজনৈতিক আকাশকে ঘোলা করছে এর কি কোন যুক্তি আছে? যদি যুক্তি থেকে থাকে তাহলে পাকিস্তানের গণমাধ্যম এবং সেদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মালিকা-ই আবিদাকে চ্যালেঞ্জ করা উচিত। সেটাতো করা হচ্ছে না। পদ্মা সেতুর বিষয়ে মালিকার কথাগুলো যদি সত্য হয় তাহলে ঐ সব বিতর্ক সৃষ্টি করার কি কোন যুক্তি থাকতে পারে? অবশ্যই কোন যুক্তি থাকতে পারে না। এতে করে দেশেরই উন্নয়নই বাধাগ্রস্ত হয় মাত্র। আমাদের দেশ সম্পর্কে পাকিস্তানের উদারমনের মানুষ যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের মুষ্টিমেয় কিছু লোক দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করে দুর্নীতির অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়েছিল, তখন সেই ‘মুষ্টিমেয়’দের তো লজ্জা পাওয়া উচিত। তবে এটাও ঠিক যে ঐসব ‘মুষ্টিমেয়’রা সব কালে, সব দেশেই এমন দেশবিরোধী, জাতিবিরোধী ষড়যন্ত্র করে থাকে। যেমনি করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও এমন কিছু মুষ্টিমেয়দের আমরা দেখা পাই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত একটি গানের কলি হলো- ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।’ ঐ মুষ্টিমেয়দের দেখা চিরদিন না পেলেই দেশ ও জাতির মঙ্গল।

এখানে একটি বিষয় আমাদের জাতি হিসেবে খুবই দুর্বলতা এই যে কোন গুজবকে আমরা দলমত নির্বিশেষে প্রতিরোধ করতে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে পারি না। অথচ যে কোন দেশের যে কোন দেশপ্রেমিকের ক্ষেত্রেই তা অবশ্যই করণীয়। ঐ যে ‘পদ্মা সেতু মাথা চায়’ গুজবকে আমরা কি ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে পেরেছি? পারিনি। এটাতো অবশ্য আমাদের সকলের ব্যর্থতা। এতে করেই বোধহয় আমাদের দেশপ্রেমের মাপকাঠি নির্ধারণ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে দুজন বিজ্ঞজনের বিখ্যাত দুটি উক্তি উল্লেখ করতে চাই। ‘স্বদেশ প্রেম অবিরাম ত্যাগ চায়’- চিয়াং কাইশেখ এবং দ্বিতীয়টি হলো- ‘সত্যিকারের দেশপ্রেম নিজ দেশের অন্যায়কে বেশি ঘৃণা করে’- ক্লারেন্স ড্যারো। বড় দুঃখ লাগে যখন দেখি পাকিস্তানের গণমাধ্যম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মডেলের প্রশংসা করে সেদেশের গণমাধ্যম চমৎকার নিবন্ধ প্রকাশ করে, তখন আমরা তেমনটি পারছি না। এ প্রসঙ্গে একটি কথাই বলা যায়- জেনে শুনে মিথ্যাচার কিন্তু ‘জেনে শুনে বিষপানের’ই নামান্তর।

আর প্রশংসা? কর্মের প্রশংসা চাওয়া কোন অন্যায় না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘প্রশংসা আমাকে লজ্জিত করে, কিন্তু গোপনে আমি প্রশংসার জন্য প্রার্থনা করি।’ শেখ হাসিনা যদি তাঁর কর্মের জন্য প্রশংসা চেয়েই থাকেন তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হতে পারে না। এটাও সত্য যে, কীর্তির স্বীকৃতি খুবই জরুরী বিষয়। আমাদের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান যথার্থই বলেছেন- ‘স্বীকৃতি ব্যতীত সৃজনশীলতা সম্প্রসারিত হয় না।’ নিবন্ধের শেষে এসে শেক্সপিয়ারের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়েই শেষ করতে চাই আর সেটি হলো- ‘কীর্তির স্বীকৃতি না পাওয়ায় কত সাগর শুকিয়ে গেছে।’

আমাদের প্রার্থনা- শুধু আজ নয়, কাল নয়, যুগে যুগে, কালে কালে যেন কোন কীর্তির স্বীকৃতি না পেয়ে কোন সাগর শুকিয়ে না যায়।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা