আমের অর্থনীতি ও রফতানি

বাজারে এসেছে দ্যাখো
রাশি রাশি আম
আছে এর নানা স্বাদ
বিচিত্র নাম।

ছড়াটি দিয়েই লেখাটি শুরু করতে চাই। ফলের রাজা আম। কার না ভাললাগে এ আম! হরেকরকম আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম স্থানে রয়েছে। এটি দেশের জন্য গৌরবের বিষয়। আম চাষী, ফল বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ এবং পরিকল্পনাবিদ সকলেই এ গৌরবের অংশীদার। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির কারণে আম উৎপাদন, বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রফতানিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে আমের অর্থনীতির অবদান কোন অংশে কম নয়। বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব মোকাবেলায় এই অর্থনীতি সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। আমের আদি নিবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। বাংলাদেশে ১৫২ জাতের আম রয়েছে, যার মধ্যে ৩১টি জাত অধিকহারে চাষাবাদ হচ্ছে। বারি এ যাবত ৪টি হাইব্রিডসহ ১৮টি উচ্চফলনশীল আমের জাত উদ্ভাবন করেছে। দেশে আম উৎপাদন প্রায় ২৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।

ফলের পুষ্টির চাহিদার বড় অংশের যোগান দেয় আম। ভিটামিন ‘এ’-এর উৎস হিসেবে আমের স্থান পৃথিবীর সব ফলের ওপরে। আম হজমশক্তি বৃদ্ধিতে, শরীর ফিট রাখতে, দেহের শক্তি বাড়াতে এবং শরীরের ক্ষয়রোধ করতে সহায়তা করে। আমে উচ্চ পরিমাণ প্রোটিনের উপস্থিতি, যা জীবাণু থেকে দেহকে রক্ষা করে, পুরুষের যৌনশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে এবং শুক্রাণুর গুণগত মান ভাল রাখে। লিভারের সমস্যায় কাঁচা আম বেশ উপকারী। আম শরীরের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং হার্টকে সুস্থ ও সবল রাখে। পর্যাপ্ত পরিমাণে এ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপস্থিতির কারণে শরীরের ক্যান্সার প্রতিরোধে আম বেশ সহায়ক।

দেশের প্রধান আম উৎপাদন এলাকা হিসেবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর বেশ সুখ্যাতি রয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্রে দৈনিক পত্রিকার বরাতে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ৯০১ কোটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩ হাজার ১৫০ কোটি ও নওগাঁয় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে জানা যায়। বারি আম-৪, বারি আম-৩ (আ¤্রপালি), গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, রানীপছন্দ, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনাসহ বাহারি জাতের আমের সমাহার রয়েছে এসব অঞ্চলে। ইতোমধ্যে বিক্রির জন্য বাজারে আসতে শুরু করেছে হরেকরকম আম। গত দুই বছর করোনার কারণে আমের দাম না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হয়েছে। রফতানিও উল্লেখযোগ্যহারে হয়নি। কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি আম রফতানির ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন। গত বছর ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ২৩টি দেশে ১৬২২ টন আম রফতানি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়। চলতি মৌসুমে করোনার প্রভাব কেটে যাওয়ায় ও বাজারজাতকরণে বাধা না থাকায় আমের ভাল দাম পাওয়ার আশা করছেন আম চাষীরা। আম রফতানির ক্ষেত্রেও হাতছানি দিচ্ছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বৃহত্তর রাজশাহী ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুরে বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদন হচ্ছে। শিবগঞ্জ ও সাতক্ষীরার আম রফতানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। তাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। দেশ-বিদেশে রাজশাহীর আমের চাহিদাও বেশ। শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলও আম উৎপাদনের অন্যতম একটি হাব। বিগত দশক থেকে পার্বত্য অঞ্চলে আমের নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এক সময় উত্তরাঞ্চল থেকে আম পাহাড়ে আসত। এখন পাহাড়ের আম দেশের প্রায় সব জায়গায় যাচ্ছে। পাহাড়ী আমের আলাদা সুখ্যাতি রয়েছে। পাহাড়ে উৎপাদিত আমের জাতের মধ্যে বারি আম-৩, বারি আম-৪, বারি আম-৮, ব্যানানা ম্যাংগো বেশ সাড়া ফেলেছে। বিদেশ থেকে অনেক রঙিন জাতের আমও আবাদ হচ্ছে। এসব বিদেশী আম গবেষণায় নিয়ে আসা জরুরী। অন্যথায় বিদেশ থেকে আসা অজানা রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থেকে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, রাঙ্গামাটি অঞ্চল, ২০২২-এর তথ্যানুসারে তিন পার্বত্য জেলায় ২০২০-২১ সালে আমের উৎপাদন এলাকা ১৪ হাজার ৫৩৮ হেক্টণ্ড যার মোট উৎপাদন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০৪ টন। যার মোট আর্থিক মূল্য হিসাব করা হয়েছে ১৬৪ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এটি একটি ইতিবাচক দিক। পার্বত্য অঞ্চল থেকেও আম রফতানির সুযোগ রয়েছে। এর জন্য সঠিক আম চাষী নির্বাচন ও কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে উত্তম কৃষি চর্চার অনুশীলন কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানো দরকার।

খাগড়াছড়ির আম বাগান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি দিবাকর চাকমার হিসাব মতে ২০২১ সালে শুধু তাদের সমিতিভুক্ত ১৫০ জন বড় বাগানির প্রায় ৫০০০ টন আম উৎপাদন হয়েছিল। এ আম দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে। এ অঞ্চলে দেশী-বিদেশী হরেকরকমের আম উৎপাদন হয়। তবে রফতানিযোগ্য আম কোন্গুলো সেটি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা দরকার। সেভাবে তাদের কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এ যাওয়া উচিত। বারি আম-৩ (আ¤্রপালি), বারি আম-৪ এবং ব্যানানা ম্যাংগো এ অঞ্চলের রফতানিযোগ্য আম বলে বিবেচিত। বিদেশে বারি আম-৩-এর যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে বলে জানা যায়। এক সময় দিবাকর চাকমা হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের সহায়তায় তার বাগানের আম যুক্তরাজ্যের ওয়ালমার্টে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমে মাছি পোকা ও এনথ্রাকনোজ পাওয়ার কারণে ওয়ালমার্ট পরবর্তীতে আম নেয়া বন্ধ করে দেয়। সে কারণটির পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সেজন্য ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন অনেকে। বান্দরবানের মেরিডিয়ান এগ্রো-ফার্মের কামাল পাশা, মহালছড়ির হ্লাশিং মং চৌধুরীর মতো অগ্রগামী অনেক চাষী আম রফতানির আগ্রহ দেখাচ্ছে বেশ।

রফতানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, তাদের নিয়ে বাগান পরিদর্শন করা, তাদের সহায়তায় তারা যেমনটি চায় সেভাবে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করা, তাদের দেয়া প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা, উত্তম কৃষি চর্চার যথাযথ প্রয়োগ ঘটা এবং মনিটরিং টিম গঠন করে বাগান নিয়মিত পরিদর্শন করা প্রয়োজন। রফতানিকারকসহ কৃষি বা কৃষি বিপণন বিভাগের কর্মকর্তার সহায়তায় রফতানিযোগ্য আমের ন্যায্যমূল্য ঠিক করা যেতে পারে। এসব কাজ সঠিকভাবে করতে পারলে মানসম্মত আম রফতানি করা সহজ হবে। বিদেশী কোন আমদানিকারকের সঙ্গে পরিচয় থাকলে তাদের বাগান পরিদর্শনে নিয়ে আসতে পারলে আরও ফলপ্রসূ হয়। যেসব দেশ যে শর্তে আমাদের দেশ থেকে আম নিতে ইচ্ছুক তাদের সেভাবে দেয়া উচিত। কনটেইনার, বিমানবন্দর বা কার্গোতে কৃষিপণ্য পরিবহনে যেসব সমস্যা রয়েছে সেসব স্বল্প সময়ে দূর করা জরুরী।

ইসমাইল খান শামীম, সেক্রেটারি অব শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতে, যদি রফতানি বাড়াতে চাই তাহলে আমের আধুনিক উৎপাদন কলাকৌশল রপ্ত করার পাশাপাশি রফতানি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি মাল্টি-স্ট্যাকহোল্ডার প্লাটফর্ম গঠন করা অত্যাবশ্যক। বর্তমানে আম রফতানির প্রধান প্রতিবন্ধকতা কি রয়েছে তা জানতে বারির সিনিয়র ফল বিজ্ঞানী ও রফতানি বিষয়ে অভিজ্ঞ ড. শরফ উদ্দিনের সঙ্গে ফৌনিক আলাপ হয়। তিনি জানান, আম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা সঠিকভাবে নির্ধারণ না হওয়া এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকা রফতানির জন্য প্রধান অন্তরায়। তিনি বিস্তৃতভাবে বলেণ্ড কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে কার কাছ থেকে কতটুকু কোন্ জাতের আম রফতানির জন্য নেয়া হবে সেটির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট স্ট্যাকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। তিনি আরও জানান, রফতানিযোগ্য আমের বৈশিষ্ট্য বা মানদ- কি হবে তা চাষীদের অজানা। তার ব্যাপক প্রচার দরকার। তাছাড়া মানসম্মত আম উৎপাদনে উত্তম কৃষিচর্চা অনুশীলনে কৃষক পর্যায়ে মনিটরিং প্রয়োজন। মনিটরিং কাঠামো প্রণয়ন জরুরী। তিনি বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদনকারীর প্রধান প্রধান এলাকাগুলোতে আধুনিক মানের ওয়্যার-হাউস স্থাপনের দাবি জানান। কেননা এটির অভাবে রফতানিযোগ্য আমের আনুষঙ্গিক কাজসমূহ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ড. শরফ উল্লেখ করে বলেন, কোন্ এলাকায় কোন্ সময় কোন্ জাতের আম সংগ্রহ করা দরকার সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতামত নেয়া যেমন দরকার রয়েছে, তেমনি পুরো রফতানি চেইনে গবেষকদের সংশ্লিষ্টতা থাকাও আবশ্যক। তার মতে এসব প্রতিবন্ধকতা সহসায় দূর করা গেলে আম রফতানি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছবে।

বিদেশে আম রফতানির সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি আমের প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানিরও সুযোগ রয়েছে। দেশে আম প্রক্রিয়াজাতকরণের এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। আম থেকে বিভিন্ন রকম ভ্যালু এ্যাডেড পণ্য তৈরি করা সহজ। যেমন- আমের আচার, আমের চাটনি, আমের জুস, আমসত্ত্ব, আমের জ্যাম/জেলি, ড্রাইড ম্যাংগো, আমের ফ্রেশ-কাট, গ্রীন ম্যাংগো জুসসহ আরও হরেকরকম প্রক্রিয়াজাত পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। দেশে উৎপাদিত শতকরা ৮০ ভাগ আম সরাসরি ভক্ষণ করা হয় আর বাকি ২০ ভাগ আম প্রক্রিয়াজাত হয়। কৃষকের আমের ন্যায্যমূল্য পেতে প্রক্রিয়াজাতকরণের কোন বিকল্প নেই। কেননা কৃষক পর্যায়ে এক কেজি কাঁচা আমের দাম ১০/২০ টাকা। শহরে এক গ্লাস গ্রীন ম্যাংগো জুসের দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা। অথচ একটি আম দিয়েই কয়েক গ্লাস জুস বানানো যায়। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কৃষি ব্যবসার প্রসার ঘটবে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি হবে। তার জন্য সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বেসরকারী প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে। আম উৎপাদনের বাণিজ্যিক এলাকায় গড়ে তুলতে হবে আধুনিক মানের প্যাক-হাউস। সে সঙ্গে ক্ষুদ্র বা মাঝারি আকারের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলতে পারলে সুফল মিলবে। নতুবা কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সরাসরি লিংকেজ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এসব পণ্যের প্রসার ঘটানো সম্ভব। এসব কাজ সফলভাবে করার মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে দেশ থেকে আমের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের রফতানির সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। পরিশেষে দেশে আম শিল্প হিসেবে গড়ে উঠুক, দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এ আম আরও অবদান রাখুক সেটি প্রত্যাশা করি।

লেখক :ড. মোঃ জামাল উদ্দিন
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র বিজ্ঞানী, বারি;
সাবেক ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট, এফএও, জাতিসংঘ