মুজিবকিল্লা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্যোগ

উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ : ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা আর এর প্রভাবে ব্যাপক প্রাণহানি, কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি সর্বোপরি অবর্ণনীয় অবস্হা এক ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয় তা ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে ‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘রোয়ানা’, ‘মোরা’ এবং ‘আম্ফান’ এর প্রভাব বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হবে।

বদ্বীপ অঞ্চলের উপকূলীয় দুর্যোগ ঐতিহাসিকভাবেই স্বীকৃত। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা এবং এর প্রভাবে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি আজ কারো অজানা নয়। সরকারিভাবে বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল ২৭.৭৩৮ বর্গ কিলোমিটার। আর সংশ্লিষ্ট জেলা রয়েছে ১৯টি। জেলাগুলো হলো :বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, গোপালগঞ্জ, যশোর, ঝালকাঠি, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নড়াইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা এবং শরীয়তপুর। উল্লিখিত জেলাসমূহসহ দীর্ঘ এই উপকূলীয় অঞ্চলে সব সময়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং এর প্রভাবে আর্থসামাজিক ক্ষয়ক্ষতিতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। আর এই ঝুঁকিতে ঐ অঞ্চলে বসবাসরত লক্ষকোটি জনসাধারণ।

বিশেষ করে, প্রাণহানি তথা মৃতু্য, নিখোঁজসহ আর্থসামাজিক সব ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ততা ও ঝুঁকির সম্মুখীন এই আপামর জনসাধারণ। উপকূলীয় দুর্যোগে আক্রান্ত জনগণ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যার প্রভাবে প্রতিবার যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘসময় লেগে যায়। আবার অনেক পরিবার নিঃস্ব, অসহায় হয়ে চরম দারিদ্র্যে নিপাতিত হয়। উঠে দাঁড়ানো সম্ভব হয় না যদি সরকারি, বেসরকারি সহযোগিতা যথাযথভাবে না পায়।

প্রাসঙ্গিকভাবে এই আলোচনায় সংক্ষিপ্তভাবে এতদঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কিছু বিষয় উপস্হাপন করা যায়। যেমন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগের বছর অর্থাৎ ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উল্লেখযোগ্য। বলা হয়ে থাকে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত মর্মান্তিক। প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় এবং ক্ষয়ক্ষতি হয় ব্যাপক। সে সময়ে বেসরকারি উদ্যোগের সহায়তা সবার দৃষ্টিগোচর হয়। আন্তর্জাতিক সাহাঘ্য সংস্হাগুলো এগিয়ে আসে সহায়তার জন্য। বিশেষ করে ‘লিগ অব রেডক্রস’, ‘অক্সফাম’, ‘কোর (যা বর্তমানে ‘কারিতাস’ নামে পরিচিত)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্হাগুলো ব্যাপক ত্রাণ সহায়তায় অংশ নেয় দুর্দশাগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

পাশাপাশি স্হানীয়, দেশীয় সমাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। জানা যায়, ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্বাচনি কর্মসূচি স্হগিত রেখে নিজেসহ তার দলের কর্মীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, সাহাঘ্য-সহযোগিতা করার জন্য। বঙ্গবন্ধু নিজে ত্রাণকার্যে অংশ নিয়ে যে লব্ধজ্ঞান অর্জন করেন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, তার উল্লেখযোগ্য ফলাফল দেখা যায় দেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী সময়ে।

এই ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং জান-মাল, গবাদি পশু, কৃষিজ সম্পদ রক্ষায় বঙ্গবন্ধু স্হানীয় সামাজিক উগ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। বঙ্গবন্ধু নির্দেশনা দেন স্হানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে ‘মাটির কিল্লা’ নির্মাণের। আর এর প্রতিফলন দেখা যায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্হানে সরকারি সহযোগিতায় এবং স্হানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে ‘মাটির কিল্লা’ নির্মাণের, যা পরবর্তীকালে উপকূলীয় অঞ্চলের জনসাধারণের কাছে ‘মুজিবকিল্লা’ নামে পরিচিত। এই ‘মুজিবকিল্লা’ তৈরি হতো মাটি দ্বারা তৈরি উঁচু ভিটা, যার উচ্চতা জলোচ্ছ্বাস, বন্যার পানির মাত্রা থেকে ওপরে। যেখানে স্হানীয় জনসাধারণ তাদের গবাদি পশুসহ কৃষিজ সম্পদ স্হানান্তর করে দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতেন।

এছাড়া বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় প্রায় ২০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হয়েছিল দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্রিয় অংশগ্রহণে দুর্গত মানুষের সহযোগিতার জন্য। সদ্য স্বাধীন দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাজেটের সীমাবদ্ধতাসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশনা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি করে। যার ফলে স্হানীয় জনগণ উদ্যোগী হয়ে সরকারের সহযোগিতায় স্হানীয় পর্যায়ে ‘মুজিবকিল্লা’ নির্মাণ করেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বড় বড় দুর্যোগ মোকাবিলা করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়, প্রয়োজন সবার সহযোগিতা। আর এক্ষেত্রে সামাজিক সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকরী।

স্হানীয় জনসাধারণকে সংগঠিত করে তাদের সহযোগিতায় যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করা সহজ; যা সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত। আর এই সামাজিক উদ্যোগের বহুবিধ ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। স্হানীয় পর্যায়ের জনসাধারণের সংগঠিত উদ্যোগ শুধু যে দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে তা নয়, বরং স্হানীয় পর্যায়ের অন্যান্য সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অন্তভু‌র্ক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত হবে।

সুতরাং স্হানীয় জনসাধারণের সংগঠিতকরণ, অন্তভু‌র্ক্তি, তথা অংশগ্রহণের সমন্বিত রূপই হলো সামাজিক উদ্যোগ। আর তাই এই সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগই বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্ববহ, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যকরী হয়েছিল।

ফিরে আসি প্রাসঙ্গিক আলোচনায়। বর্তমান সরকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা থেকে জনসাধারণকে রক্ষার জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যা বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনা এবং নির্দেশনার আলোকে সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন বলে প্রতীয়মান হয়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২১ সালের ২৩ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলোতে ১১০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, ৩০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৩০টি জেলা ত্রাণগুদাম তথা দুর্যোগ ব্যবস্হাপনা তথ্যকেন্দ্র এবং পাঁচটি ‘মুজিবকিল্লা’ উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে তিনি ৫০টি মুজিবকিল্লার ভিত্তিপ্রস্তরও স্হাপন করেন।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যসূত্রে জানা যায় ইতিমধ্যেই ২৩০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও ৩২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ১৬টি জেলার ৮২টি উপজেলায় ২২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ২৬৭টি উপজেলায় ৪২৩টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। ৬৩টি জেলায় দুর্যোগ ব্যবস্হা-কাম-তথ্যকেন্দ্র স্হাপন করা হয়েছে। এজন্য ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত ‘মাটিরকিল্লা’ যা পরবর্তীকালে উপকূলীয় অঞ্চলের জনসাধারণ ‘মুজিবকিল্লা’ নামে আখ্যায়িত করেছেন, তারই আধুনিক রূপে বর্তমান সরকার উপকূলীয় ও বন্যা উপদ্রুত ১৪৮টি উপজেলায় ৫৫০টি ‘মুজিবকিল্লা’ নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রেখেছেন।

আধুনিক এই ‘মুজিবকিল্লা’তে একদিকে যেমন উপকূলীয় দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে অন্যদিকে গবাদি পশু, কৃষিজ সম্পদ রক্ষা করতে পারবে। পাশাপাশি জনগণের সামাজিক ও বাণিজ্যিক (হাট বা বাজার) কার্যক্রমের জন্যও ব্যবহার করা যাবে। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সুদূরপ্রসারী এবং সুপরিকল্পিত, যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ বটে। মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তাধারা, নির্দেশনা, উদ্যোগসমূহ সর্বোপরি তারই মহান নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বলেই অনুমিত।

বঙ্গবন্ধুর ধ্যানজ্ঞানই ছিল দেশের উন্নয়ন এবং আপামর জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়ন। জনগণই ছিল তার প্রধান শক্তি। আর তাই এই জনসাধারণকে উন্নয়নের অংশীজন করে দেশের সার্বিক উন্নয়নে যথাসময়ে যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে উন্নয়ন ধারণা বিস্তৃত করেছিলেন জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্তভু‌র্ক্তির মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ভাবনায় সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ ধারণাটিও প্রাধান্য পেয়েছিল। যেহেতু বর্তমান সময়ে নব নব উন্নয়নধারণায় উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে জনগণের অন্তভু‌র্ক্তিকরণ ও নেতৃত্ব দান বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, সেহেতু স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ধারণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে প্রতীয়মান।

অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান সরকারের অন্য সব উন্নয়ন পদক্ষেপের সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্হাপনা তথা দুর্যোগ মোকাবিলায় সব কার্যক্রমে স্হানীয় জনগণের অন্তভু‌র্ক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগকে গুরুত্বারোপ করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে সব পর্যায়ের দুর্যোগ মোকাবিলায় স্হানীয় জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে সংগঠিত করা, স্হানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি ক্রীড়া সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা, স্হানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বেসরকারি সংস্হাকে (এনজিও) অন্তভু‌র্ক্ত করা, স্হানীয় জনসাধারণ দ্বারা ব্যবস্হাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করাসহ সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ অপরিহার্য।

লেখক:প্রফেসর ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন
উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়