পদ্মা সেতু কেন পৃথিবীর অন্য সেতুর চেয়ে আলাদা

ব্রাজিলের আমাজন নদীর পর প্রমত্তা পদ্মা বিশ্বে খরস্রোতা নদীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। সেই পদ্মার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে স্বপ্নের সেতু। পদ্মার প্রবল স্রোত উপেক্ষা করে ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে উভয় প্রান্তে। এখন নদীর উভয় তীরে দাঁড়ালেই দেখা যাচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। দেশি, বিদেশি ও নদীর নিজস্ব (গভীরতা-খরস্রোত) হাজারো প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘতম এই পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের পারাপারের জন্য উন্মোচিত হবে নবদিগন্তের দুয়ার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্তে এখন সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে দেশের মানুষ।
দ্বিতল পদ্মা সেতু দিয়ে বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে পারবেন সহজেই। পুরো সেতুতে পিলারের সংখ্যা ৪২টি। প্রতিটি পিলারের রাখা হয়েছে ৬টি পাইল। একটি থেকে আরেকটি পিলারের দূরত্ব ১৫০ মিটার। এই দূরত্বের লম্বা ইস্পাতের কাঠামো বা স্প্যান জোড়া দিয়েই সেতু নির্মিত হয়েছে। ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যান বসানো দেশের দীর্ঘতম এ সেতুটির আয়তন ৬.১৫ কিলোমিটার। বর্ষাকালে যখন অতিরিক্ত স্রোত থাকে, এই পদ্মার তলদেশের বালির মতো মাটি ধুয়ে চলে যায় এবং প্রায় ৬৫ মিটার গর্ত হয়ে যায়। মানে নদীর নিচ থেকে ৬৫ মিটার মাটি ধুয়ে চলে যায়। মানে ২১ তলা বিল্ডিংয়ের সমান হাইটের মাটি ধুয়ে চলে যায়। পদ্মার এই প্রায় ২১ তলার সমান মাটি ধুয়ে চলে যাবার রেকর্ড বা এত বেশি পরিমাণ সেডিমেন্ট (মাটির কণা) ট্রান্সপোর্ট করার রেকর্ড অন্য কোনো নদীর নেই। এ অবস্থায় পানির নিচে মাটি পেতে হলে আপনাকে নিচে নামতে হবে ৩৪ তলা! তাই সেতুর যে কলামগুলো দেয়া হয়েছে সেগুলোকে ১২২ মিটারের বেশি লম্বা করেই দিতে হয়েছে! মানে প্রায় ৪০ তলা বিল্ডিংয়ের চেয়ে লম্বা কলাম! এটা গেল পাইলের গভীরতা! এবার পাইলের সাইজ কেমন, আকার কেমন এগুলো দেখা যাক। পাইলগুলো গোল। গোল ৪০ তলা বিল্ডিংয়ের সমান লম্বা সিলিন্ডার! এ সিলিন্ডারের ব্যাস হলো ৩ মিটার। প্রায় ২০ তলা বিল্ডিংয়ের সমান লম্বা একটার সঙ্গে আর একটা ২০ তলার সমান লম্বা পাইল জোড়া দিয়ে বানানো হয়েছে একটা পাইল! এই পাইলগুলোর জন্যই জার্মানি থেকে স্পেশাল হ্যামার (হাতুড়ি) আনতে হয়েছে। একটা হ্যামার তো পদ্মা সেতুর জন্যই স্পেশালভাবে বানাতে হয়েছে। আরো আনতে হয়েছে স্পেশাল ক্রেন, স্পেশাল হ্যামার!
এ পাইলগুলো ফাঁপা। মাটিতে বসানোর পর, এদের মাঝে বালি দিয়ে ফিল করা হয়। পাইলগুলোতে জং ধরতে পারে। যদি বা ধরে ১০০ বছরে ক্ষয় হবে ১০ মিলিমিটার। ৫০-৬০ মিলিমিটার তখনো থাকবে। এত পানি প্রতিদিন পার হয়ে সাগরে যায় পদ্মা দিয়ে, এটা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড। প্রথম রয়েছে ব্রাজিলের আমাজান। পদ্মা হলো দ্বিতীয় খরস্রোতা। এই পানিটা নিতে হবে সেতুর নিচ দিয়ে। সেই ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে যেন পানি সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যেতে পারে। এই পানি কোনোভাবে যদি আটকা পড়ে একইসঙ্গে বন্যা হবে আপস্ট্রিমে (নদীর পশ্চিম-উত্তর দিকে) এবং একই সঙ্গে এই পানি সেতুর ওপর অনেক বেশি প্রেসার বা ধাক্কা দেবে। ফলাফল হিসেবে সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মাটি ১২০-১২২ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো একটি রেকর্ড। পৃথিবীর অন্য কোথাও কোনো সেতুতে পাইল এত গভীরে প্রবেশ করাতে হয়নি। পিলার এবং স্প্যানের মাঝে যে বেয়ারিং আছে সেটি ১০ হাজার ৫০০ টন ওজনের একেকটি বেয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে। পৃথিবীতে এর আগে এমন বড় বেয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি কোনো সেতুতে।
নদী শাসন করা হয়েছে ১৪ কিলোমিটার (১.৬ মাওয়া+১২.৪ জাজিরা) এলাকা। পিলারের ওপর স্প্যান বসাতে যে ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটি আনা হয়েছিল চীন থেকে। বিশ্বে প্রথম এই সেতু বানাতেই এত দীর্ঘদিন ক্রেনটি ভাড়ায় থেকেছে। আরেকটি রেকর্ড পদ্মা সেতুই বিশ্বে প্রথম যেটি কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে নির্মিত হয়েছে। শক্তিশালী হ্যামার দিয়ে নদীর তলদেশে মাটির গভীরে প্রবেশ করানো হয় এ লম্বা পাইলগুলো। এত লম্বা দৈর্ঘ্যরে পাইল ব্যবহার করা হয়নি পৃথিবীর আর কোনো সেতুতে। সেখানেও জটিলতা ছিল। এত লম্বা হওয়া সত্ত্বেও কয়েকটি পিলারের ক্ষেত্রে নদীর তলদেশে শক্ত মাটি খুঁজে না পাওয়ায় এ দৈর্ঘ্য বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে।
পাইলের দৈর্ঘ্য ঠিক রেখে প্রতিটি পিলারে ৬টির পরিবর্তে ৭টি করে খুঁটি বসানোর সিদ্ধান্ত হয় এখানে বাড়তি যোগ করা হয় গ্রাউটিং প্রযুক্তি। এছাড়া রিকটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও সেটি সামলে নিতে পারবে এ বিয়ারিংগুলো। ভূমিকম্প, মাটির ক্ষয়সহ যে কোনো আঘাত প্রতিরোধ করে ঠিকে থাকবে পদ্মা সেতু। সব ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে দীর্ঘদিন টিকে থাকার শক্তি রয়েছে পদ্মা সেতুর। আর সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার উপযোগী করেই নির্মাণ করা হয়েছে পদ্মা সেতুর অবকাঠামো। দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম এই অবকাঠামো গড়তে ছিল বেশকিছু চ্যালেঞ্জ। প্রকৌশলগত সব চ্যালেঞ্জ জয় করেই শেষ পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে এই সেতু। পদ্মা সেতু নির্মাণে কারচুপি হয়েছে কি হয়নি সে বিতর্কে না গিয়ে বলা যায় অন্য যে কোনো দেশের সেতুর সঙ্গে পদ্মা সেতুর তুলনা করার সুযোগ নেই। ব্রাজিলের আমাজন নদীর পর পদ্মাই বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরস্রোতা নদী। যে কোনো সেতুর ক্ষেত্রে পানির উপরিভাগে যা দেখা যায়, এটা মূলত কসমেটিক। মূল খেলা হলো পানির নিচে বা মাটির নিচে। বিশ্বের অন্য কোনো নদীতে সেতু বানাতে পানির যতটুকু গভীরতা, তার নিচে মাত্র কয়েক ফুট গেলেই পাওয়া যায় রক বা পাথরের আস্তর। এতেই ড্রিলিং করে ফাউন্ডেশন নির্মাণ করা যায়।
বড় যে কোনো সেতু নির্মাণে খরচের একটা বড় অংশ চলে যায় নদী শাসনের পেছনে। যেসব দেশে মাটি খুঁড়লেই পাথর বের হয়, সেসব দেশে নদীশাসন নিয়ে বেশি ভাবতে হয় না। ওই নদীগুলো পাড় ভাঙে না। আমাদের দেশের সব নদীর ক্ষেত্রেই এটির জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। পদ্মার ক্ষেত্রে তো আরো বেশি। পদ্মার স্রোত হলো সারফেসের অনেক নিচে, যাকে বলে আন্ডার সারফেস কারেন্ট। তাই পাড়ের ক্ষতি কতটুকু করছে, খালি চোখে দেখা যায় না। হঠাৎ করে কয়েকশ ফুট এলাকা ধসে পানিতে তলিয়ে যায়। আবার ঢেউয়ে ৬৫ মিটার পর্যন্ত গর্তের সৃষ্টি হয়ে যায়। এর জন্য এর নাম সর্বনাশা পদ্মা, প্রমত্তা পদ্মা। এর শাসনে কত খরচ বাড়তে পারে বিশ্বের অন্যান্য নদীর তুলনায়, ভাবাই যায় না। চিন্তা করতে হবে পদ্মার প্রেক্ষিত বিবেচনা করে অন্য দেশের নদীর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।
যে কোনো সেতু মজবুত তো হতেই হবে, কিন্তু সেতুটি কাঁপার সুযোগও থাকতে হবে, এমনভাবেই সেতু বানাতে হয়। কারণ এর ওপর ভারী বাস-ট্রাক গেলে ভাইব্রেশন তৈরি হবেই। ভূমিকম্প হলেও হয়। এই ভাইব্রেশন হজম করতে না পারলে ব্রিজে ফাটল ধরবে, একসময় ভেঙে পড়বে। এই ভাইব্রেশন হজম করাতে গেলে সেতুকে দুলতে দিতে হবে। এজন্যই সেতু পার্ট পার্ট করেই নির্মাণ করা হয় যেন পুরো সেতু একসঙ্গে না দুলে। কয়েক গজ পরপর রাস্তায় জোড়া দেখা যায়। কিন্তু যখন ট্রেন চলে, কতটা বিস্তৃৃত এলাকা একসঙ্গে ওজন এবং ভাইব্রেশন হজম করছে সেতু সে বিষয়টি ভাবতে হয়। তাই শুধু সড়ক পরিবহনের জন্য সেতু বানানো, আর ট্রেনসহ সেতু বানানোর খরচ কি আর এক হবে? আবারো দেখা যাক প্রাথমিক পরিকল্পনা এবং শেষ পর্যন্ত খরচের তুলনা করা হোক কোনো অসুবিধা নেই। এই প্রশ্ন তো করা যেতেই পারে। তবে অন্য দেশের সেতুর নির্মাণ খরচের সঙ্গে পদ্মা সেতু খরচের তুলনা করার কোনো সুযোগই নেই। এ সেতুর কারণে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব নেতৃত্বে ঈর্ষণীয়ভাবে অনন্য উচ্চতায় অবস্থান ধরে রেখেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।
বিবেকবোধসম্পন্ন সাধারণ মানুষও জানেন কেন পদ্মা সেতুর ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অব ওয়েলস বা সেভের্ন সেতুর সঙ্গে পদ্মা সেতু এবং এর টোলের তুলনা করে যারা অপপ্রচারে লিপ্ত আছেন তারা সবাই সঠিক তথ্য জনগণের সামনে ও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন।
৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পদ্মা সেতু- ৩৬ হাজার কোটি টাকা কি বেশি মনে হচ্ছে? ৬.১৫ কিলোমিটার সেতুর দৈর্ঘ্য। পদ্মা সেতু থেকে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে নির্মিত অ্যাপ্রোচ রোডের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১২.২ কিলোমিটার। সর্বমোট সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করতে হচ্ছে ১৯ কিলোমিটার আর নদী শাসনের বিষয়টি তো আছেই। সামগ্রিক দিক বিবেচনা করলে পদ্মা সেতুতে খরচ অনেক কম হয়েছে বলা যায়। আর টোল বাস্তবতার নিরিখেই নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে সরে গেলে ২০১২ সালের জুলাই মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেন যে সরকারের নিজস্ব তহবিল দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবেন। ২০১৬ সালে কানাডিয়ান সুপ্রিম কোর্র্টও পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে মামলাটি খারিজ করে দেন। বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর ‘চ্যালেঞ্জ’ জয় লাভ করে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের পথে। তাছাড়া পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতুই নয়, এটি আমাদের উন্নয়ন, অহংকার, অহংকারের প্রতীক। আত্মমর্যাদা, আত্মপরিচয়, যোগ্যতা সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রত্যয়ের ফসল। বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশের পথে বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।

হীরেন পণ্ডিত : লেখক ও গবেষক।