‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের পরশপাথর’

সারাদেশের ৪৯২টি উপজেলায় একযোগে ৩২ হাজার ৯০৪টি পরিবারকে সেমিপাকা ঘরসহ দুই শতক জমির দলিল হস্তান্তর করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই ঘর পেয়ে আপ্লুত ছিন্নমূল মানুষ। তারা প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করছেন, তার দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন।

মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দিয়ে একযোগে এসব উপজেলায় ছিন্নমূল মানুষকে উপহারের ঘর তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। ভিডিও কনফারেন্সে চারটি উপজেলার উপকারভোগীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। এসময় পূর্বে যারা ঘর পেয়েছেন তাদের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প শোনেন প্রধানমন্ত্রী। নতুন ঘর পাওয়াদের উচ্ছ্বাসও উপভোগ করেন তিনি।

এসময় একজন উপকারভোগী প্রধানমন্ত্রীকে ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের পরশপাথর’ বলে আখ্যায়িত করেন। আরেকজন বলেন, ‘আপনি আমার সোনার বাংলার পরশপাথর, আপনার ছোঁয়ায় আমার জীবনটাই পাল্টে গেছে।’

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার পোড়াদিয়া বালিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে এক বছর আগে ঘর পাওয়া সাবিরুন আক্তার বলেন, প্রধানমন্ত্রী চার বছর আগে আমি স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে ভাইদের সংসারে আশ্রয় নিই। ভাইদের অভাবের সংসারে সেলাই কাজ করে যা আয় হতো, তা দিয়ে সাহায্য করতাম। আপনার দয়ায় ও আল্লাহর রহমতে আমি একটি পাকা সুন্দর ঘর পেয়েছি। এখানে এসে সেলাইয়ের কাজ করে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে দিন কাটতো আমার। নতুন ঘর পাওয়ার পর জমানো সঞ্চয় দিয়ে এবং কিছু লোন করে স্বামীকে অটোরিকশা কিনে দেই।

তিনি বলেন, আমি শুধু সেলাই কাজ নয়, ঘরের মধ্যে টুকটাক কাপড়চোপড়েরও ব্যবসা করি। এখন আমাদের মাসিক আয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। আমি সংসার ও নতুন ঘর পেয়ে খুবই খুশি ও আনন্দিত। আমার স্বপ্ন, আমি কয়েকটি সেলাই মেশিন কিনে গার্মেন্টস (কারখানা) করবো। আপনি আমার সোনার বাংলার পরশ পাথর, আপনার ছোঁয়ায় আমার জীবনটাই পাল্টে গেছে। আপনাকে দূর থেকে নয়, কাছ থেকে দেখতে চাই। আপনার দাওয়াত থাকলো।

একই জায়গায় নতুন ঘর পাওয়া উষারাণী মালো বলেন, আমি বাবার বাড়িতে অনেক কষ্ট করেছি। এসএসসি পাশ করেছি। আমার স্বামী নৌকার মাঝি। আর মাছ ধরে। সেই মাছ বিক্রি করে কোনোরকমে সংসার চলে। আমাদের কোনো জায়গা-জমি ছিল না। জীবনেও ভাবিনি কোনো দিন ঘর হবে। আপনি আমাদের জমিসহ একটি পাকা ঘর দিয়েছেন। এই ঘর পেয়ে আমরা অনেক খুশি। এখানে অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে। মন্দির-মসজিদ আছে, স্কুল, পুকুর, খোলা মাঠ আছে। বাড়ির সামনে একটি নদীও আছে। আমার স্বামীর ধরা মাছ আপনাকে খাওয়াতে চাই। আপনি আমাদের দেখতে আসবেন। প্রার্থনা করি আপনি দীর্ঘজীবী হোন।

বরগুনা সদরের খাজুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে তৃতীয় লিঙ্গের শিমু বলেন, আমার বয়স যখন ১০/১২ বছর, তখন পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। এখানে-সেখানে গিয়েছি, কেউ ঘর ভাড়া দিতো না। মুজিববর্ষে দুই শতক জমি ও পাকা ঘর পেয়েছি। আমরা এখন নিজের ঘরে ঈদ করতে পারবো। এর চেয়ে আনন্দের কিছু হতে পারে না। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম, এখানে একটা নতুন সমাজ পেয়েছি। আমাদের সবার পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনাকে ও আপনার পরিবারকে ভালো রাখুক।

একই এলাকা থেকে ভিক্ষুক নাসিমা বেগম বলেন, আমি নদীভাঙনের শিকার পরিবারের সদস্য। আমার স্বামী নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আর আসেনি। আমি মানুষের বাড়ি কাজ করে খেতাম। আমার জমি বা ঘর ছিল না। আপনি আমাকে দুই শতক জমিসহ পাকা ঘর দিয়েছেন। আমি অনেক খুশি। আমি নামাজ পড়ে আপনার জন্য দোয়া করি। আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ দেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন এখানে থেকে ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে।

সিরাজগঞ্জ সদরের খোকশাবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি ওয়াপদার ঢালে ছিলাম, ভাত খাইতে বসলে বালু আসতো। ১১ মাস হলো দুই শতক জমি ও ঘর পেয়েছি। দিনে ২৫০ টাকা হাজিরায় বেকারির কাজ করতাম। আমার ছেলেও ৫০ টাকা হাজিরা পেতো। বাপ-বেটার ইনকামের টাকা জমিয়ে নিজের ঘরেই বেকারি করেছি। আল্লাহ এই দিন আমাদের দেবে, কোনো দিন কল্পনাও করিনি। এখন আমার বেকারিতে দুজন কর্মচারীও কাজ করে।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুব খুশি হলাম। আপনি শুধু নিজের ব্যবস্থা নিজে করেননি, অন্যের কাজেরও সুযোগ করতে পেরেছেন। এভাবেই লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান পাবে।

একই এলাকায় নতুন ঘর পাওয়া এক ছাত্রী আজিজা সুলতানা স্মৃতি বলেন, আমি সরকারি কলেজের ছাত্রী এবং ক্রিকেটার। আমার বাবা নেই। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। ঈদে আমরা একটা ঘর পেয়েছি। ঈদে ঘর পেয়ে আমরা খুবই খুশি। এমন খুশির ঈদ আমরা কখনো পাইনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আগে আমার পড়াশোনার কোনো স্থায়ী জায়গা ছিল না। এখন সেটি হয়েছে। আমি আগের চেয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারবো। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এটি একটি খেলার মাঠ। আপনি দোয়া করবেন, যাতে আমি পাড়াশোনার পাশাপাশি আশ্রয়ণের ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে পারি।

স্মৃতি আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের জন্য আদর্শ। জাতির পিতার সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার। সেই স্বপ্ন আপনার হাত দিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আমরা দৃঢ়ভাবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, আপনি আমাদের বাংলাদেশের উন্নয়নের পরশপাথর। আমরা সবাই আপনার জন্য দোয়া করি। আপনি যেন আমাদের মাঝে বার বার প্রাধানমন্ত্রী হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আপনিও আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমরা যেন সুনাগরিক হয়ে আপনার দেখানো পথে চলতে পারি, দেশের জন্য কাজ করতে পারি। আপনাকে সামনে থেকে দেখার খুবই শখ, ঈদে সিরাজগঞ্জে আসবেন, দাওয়াত থাকলো।

এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক ধন্যবাদ, খুশি হলাম তোমার কথা শুনে। তোমরা মন দিয়ে পড়াশোনা করো। তুমি যেটা বললে, বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা করবে, সেটা অবশ্যই করবে। তোমরাই আমাদের নতুন প্রজন্ম, লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে এবং এ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সবার প্রতি আমার দোয়া ও ভালোবাসা।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাজীগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে রহিমা বলেন, আমি ছেলে-মেয়েদের আরবি শিক্ষা দেই। অনেকদিন অন্যের বাসায় ছিলাম। আমার কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। এখন একটা ঘর পেয়েছি। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র, বিল্ডিংটা দেখলে মনে হয় ফাইভস্টার হোটেল। আমি অনেক খুশি হইছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে যাতে প্রতিদিন দেখতে পাই, সেজন্য ঘরে টিভি নিয়েছি। আমি আপনার দেওয়া ঘরে বসে দুটো কাঁথা সেলাই করেছি। সেগুলো অবশ্যই আপনি আমার কাছ থেকে নেবেন।

এসময় উচ্ছ্বসিত প্রধানমন্ত্রী তাকে উড়ন্ত চুমু দেন। আনোয়ারা উপজেলার আরেক উপকারভোগী ইয়ার মোহাম্মদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমি নদীভাঙন কবলিত মানুষ। জেলের কাজ করি। কিছু নেই। থাকার জায়গা নেই। আমার মতো একজন জেলেকে দুই শতক জমি ও পাকা ঘর দিয়েছেন। আমি আপনার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ। আমার হিসেবে, আপনি আমাকে ২০ লাখ টাকার মালিক বানিয়ে দিয়েছেন। আপনার জন্য দোয়া করি। আপনি যদি আমাদের দেখতে আসেন, আমরা আরও খুশি হবো।

এসময় জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইনশাআল্লাহ সুযোগ পেলে আসবো। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।