রাবার চাষে সমৃদ্ধ হবে অর্থনীতি

ফেনীর পরশুরামে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মির্জানগর ইউনিয়নের জয়ন্তীনগর-বীরচন্দ্র নগর গ্রামে একটি রাবার বাগান থেকে বাণিজ্যিকভাবে রাবার বিক্রি শুরু হয়েছে, যা অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা।
বাংলাদেশ রাবার গার্ডেন ওনার্স এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিএফআইডিসি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি রাবার বাগান রয়েছে। এর মধ্যে বিএফআইডিসির ১৮টি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ১১টি। বাকিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনী ও টাঙ্গাইল এলাকার প্রায় এক লাখ একর জমিতে রাবার চাষ হয়। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক রাবার বাগানে কাজ করেন।
চাষের উপযোগী পরিবেশ আর তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচের কারণে ‘সাদা স্বর্ণ’ হিসেবে পরিচিত রাবার দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত হতে পারে। তবে এর জন্য দরকার সরকারি সহযোগিতা। রাবার বোর্ডের তথ্য মতে দেশে এখন রাবারের চাহিদা রয়েছে ৩০-৩৫ হাজার টন। দেশীয় বাগানে রাবার উৎপাদন হয় ২০-২২ হাজার টন। ঘাটতি থাকে ১০-১২ হাজার টন।
মির্জানগরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মোস্তফা ২০ একর জমিতে রাবার বাগান করেছেন। বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাতও শুরু হয়েছে। বাগান মালিক ১২ বছর আগে লাগানো গাছগুলো থেকে গত তিন বছর ধরে রাবার সংগ্রহ করছেন। বাগানটি ফেনীর অন্যতম পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে । রাবার বাগান দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীর ভিড় দেখা যায়।
এ ব্যাপারে মোস্তফা ভোরের কাগজকে বলেন, ২০০৯ সালে ২০ একর জমিতে ১০ হাজার রাবার চারা রোপণ করেছিলাম। বর্তমানে বাগানের ৪ হাজার গাছ থেকে রাবার উৎপাদন করা হচ্ছে। রাবার সংগ্রহের জন্য গাছ উপযুক্ত হতে সময় লেগেছে দশ বছর। কয়েকবছর পর বাকি গাছগুলো থেকেও রাবার উৎপাদন শুরু হবে। বাগানের পরিচর্যাকারী হিসেবে এখানে ১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। শীতের চার মাস রাবার উৎপাদন বেশ ভালো হয়। বর্ষায় উৎপাদন তুলনামূলক কম হয়। রাবার উৎপাদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, ভোররাত থেকে প্রথমে রাবার বাগান থেকে কষ বিভিন্ন পাত্রে সংগ্রহ করা হয়। পরে শুকনো রাবার শিটে পরিণত করে রোলার মেশিনের সাহায্যে পানি বের করা হয়। এরপর ড্রিপিং শেডে শুকিয়ে পোড়ানো হয়। তিনি বলেন, একটি গাছ থেকে দৈনিক প্রায় ৩০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম রাবার পাওয়া যাচ্ছে। বাজার দর অনুযায়ী প্রতি লিটার রাবার ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। একটি রাবার গাছ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে রাবার উৎপাদন করা যায়।
এ কাজে নিয়োজিত এক শ্রমিক বলেন, ২-৩ মাস পর পর রাবারগুলো বিক্রি হয়। প্রতি লটে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার রাবার বিক্রি হয়। তবে এখনো লাভ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। কিছুদিন পর সব গাছ থেকে কষ সংগ্রহ করলে লাভ হবে। বাগানটি পিকনিক স্পট হিসেবে বাইরের অনেক জেলার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বাগান মালিক মোস্তফা বলেন, রাবার বাগানে মাসিক দেড় লাখ টাকা খরচ হলেও তেমন লাভ হচ্ছে না। পুরোদমে রাবার সংগ্রহ শুরু হলে আশা করি লাভের মুখ দেখব। চট্টগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এই বাগান থেকে রাবার কিনছে। ভবিষ্যতে এখানে একটি শিশুপার্ক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আবদুল মান্নান জানান, পার্বত্য এলাকার লোকজন রাবার উৎপাদনের কাজ করত, এখন স্থানীয়রা করছে। এতে গ্রামের বেকার জনগোষ্ঠীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। রাবার ছাড়াও বাগানের মধ্যে মাছ চাষ, স্বল্প পরিসরে আম ও লিচু উৎপাদন করা হচ্ছে। রাবার বাগানের সারিবদ্ধ গাছ, রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের দৃশ্য, পাশের সীমান্তের দৃশ্য ও প্রাকৃতিক সজীবতা দেখে মুগ্ধ হন পর্যটকরা। তবে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটির অবস্থা খারাপ থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেসরকারি এ উদ্যোগকে কাজে লাগাতে পারে সরকার। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাগান বাড়বে এবং অনেকে রাবার চাষে উদ্বুদ্ধ হবে।
এ ব্যাপারে পরশুরাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, সমতল ভূমি থেকে একটু উঁ আর পাহাড়ি এলাকা রাবার বাগানের জন্য উপযোগী। সাধারণত রাবার উৎপাদনের উপযুক্ত পরিবেশ বিবেচনায় পাহাড় বা উচুঁ স্থান, যেখান থেকে বৃষ্টির পানি সহজে নেমে যেতে পারে তা বেশি উপযোগী। সে হিসেবে জয়ন্তীনগর গ্রামে গড়া ওঠা বাগানটিও উঁচু ছোট পাহাড়ি স্থান যা রাবার উৎপাদনের উপযুক্ত। রাবার বাগান হতে পারে এমন আরো অনেক উঁচু এলাকা রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে রাবার চাষ এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে এবং অনেকের কর্মসংস্থান হতে পারে। তিনি আরো বলেন, কৃষি দপ্তর থেকে সব ধরনের কৃষি উৎপাদনে সার্বিক সহেযাগিতা করা হচ্ছে।