ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ

ইলিশ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সুস্বাদু এই মাছ উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থান আরও মজবুত করেছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশই উৎপাদিত হচ্ছে এই দেশে। মাত্র চার বছর আগেও এই উৎপাদনের হার ছিল ৬৫ শতাংশ।সরকারের নানা কার্যকর পদক্ষেপের ফলে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইলিশ উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশও বর্তমানে বাংলাদেশকে ইলিশ উৎপাদনের রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও মোহনা অঞ্চলে গবেষণা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কোন উন্নতমানের গবেষণা জাহাজ ছিল না। ইনস্টিটিউট কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় জাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে। গবেষণা জাহাজটিতে ফিশ ফাইন্ডার, ইকো-সাউন্ডার, নেভিগেশন এবং অত্যাধুনিক টেলি-যোগাযোগ ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি, ইলিশ গবেষণা ল্যাবরেটরি, নেটিং সিস্টেম, পোর্টেবল মিনি হ্যাচারিসহ অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। এ জাহাজ দিয়ে দেশের বড় বড় সবকটি নদ-নদী এবং সাগর উপকূলে এখন ইলিশ বিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এসব গবেষণালব্ধ ফলাফল আগামীতে নতুন নতুন প্রজনন ক্ষেত্র, বিচরণ পথ নির্ধারণ করে ইলিশের উৎপাদন কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ.ম রেজাউল করিম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়োপযোগী ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপের কারণে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ইলিশ আহরণ এক সময় কমে গিয়েছিল। পরবর্তীতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ইলিশ সম্পদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গবেষণালব্ধ ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সরকার ইলিশের অভয়াশ্রম সৃষ্টি ও অভয়াশ্রমে জাটকা ধরা বন্ধ করা, প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিপণন, মজুদ, ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধকরণ, নবেম্বর থেকে জুন ৮ মাস জাটকা ধরা বন্ধ করা, সমুদ্রে ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ করাসহ নানা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করেছে। পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ সকল কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ২০০৮-০৯ অর্থবছরের ২ দশমিক ৯৯ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৬৫ লক্ষ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।

ইনস্টিটিউট কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় জাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে। গবেষণা জাহাজটিতে ফিশ ফাইন্ডার, ইকো-সাউন্ডার, নেভিগেশন এবং অত্যাধুনিক টেলি-যোগাযোগ ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি, ইলিশ গবেষণা ল্যাবরেটরি, নেটিং সিস্টেম, পোর্টেবল মিনি হ্যাচারিসহ অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। এ জাহাজ দিয়ে দেশের বড় বড় সবকটি নদ-নদী এবং সাগর উপকূলে এখন ইলিশ বিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এসব গবেষণালব্ধ ফলাফল আগামীতে নতুন নতুন প্রজনন ক্ষেত্র, বিচরণ পথ নির্ধারণ করে ইলিশের উৎপাদন কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশের ইলিশ সম্পদের উন্নয়নে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে আধুনিক এ গবেষণা জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন যে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে দেশে ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য। তাছাড়া, সমুদ্রে ২২ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সমুদ্রে ইলিশের উৎপাদন ও সাম্প্রতিককালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি জানান।

ইলিশ উৎপাদন নিয়ে নতুন করে সুুখবর দিয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা। ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় বর্তমানে বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশের সর্বোচ্চ আহরণ মাত্রা ৭.০ লক্ষ মে.টন নির্ধারণ করা হয়েছে যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে আহরিত (৫.৫০ লক্ষ মে.টন.) ইলিশের চেয়ে ১.৫০ লক্ষ মে.টন বেশি। অর্থাৎ বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে আরও ১.৫ লক্ষ মে.টন অতিরিক্ত ইলিশ সহনশীল মাত্রায় আহরণ করা যাবে। একইসঙ্গে ইলিশের মজুদ নিরুপণ করা হয়েছে ৩ লক্ষ ৯৯ হাজার মে. টন। সম্প্রতি ইনস্টিটিউট কর্তৃক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত এতদসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

জলাশয়ে বর্তমান মজুদের বিপরীতে ৭.০ লক্ষ মে. টনের বেশি ইলিশ আহরণ করা হলে ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে গবেষকগণ জানিয়েছেন। উক্ত তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় দেশে ইলিশ আহরণ মাত্রা নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের কৌতূহলের অবসান হলো।

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি আয় ও আমিষ সরবরাহে ইলিশের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ (১২.১৫ ভাগ) এবং জিডিপিতে অবদান ১% এর বেশি। উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার প্রধান উৎস্য হচ্ছে ইলিশ। প্রায় ৬.০ লক্ষ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০-২৫ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। সারাবিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী থেকে।

বিএফআরআই কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত ইলিশের মজুদ নিরূপণ গবেষণায় বাংলাদেশের সমুদ্রে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থাৎ ১.৬২ লক্ষ মে.টন ইলিশ মজুদ আছে বলে জানা গেছে। এরপরেই মেঘনা (১.৫৮ লক্ষ মে.টন) এবং পদ্মা (৭৮.৫ হাজার মে.টন) নদীতে। মজুদের ওপর ভিত্তি করে সমুদ্রে ইলিশের সর্বোচ্চ সহনশীল উৎপাদন অর্থাৎ আহরণ মাত্রা নিরূপণ করা হয়েছে ৩,০৫,৭৪৯ মে.টন, মেঘনা নদীতে ২,৮৩,২৬১ মে.টন এবং পদ্মা নদীতে ৮১,৬৯৫ মে.টন। অর্থাৎ দেশের প্রধান ২টি নদী ও সমুদ্রে ইলিশের মোট মজুদ হচ্ছে ৩.৯৯ লক্ষ মে. টন এবং সর্বোচ্চ সহনশীল উৎপাদন/আহরণ মাত্রা হচ্ছে ৭.০ লক্ষ মে.টন।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশের সর্বোচ্চ সহনশীল উৎপাদন ছিল ৬.০৯ লক্ষ মে.টন- যা ২০১৯-২০ এ ৭.০ লক্ষ মে.টনে উন্নীত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, দেশে ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইলিশের রিক্রুটমেন্ট ভাল হচ্ছে এবং উৎপাদন ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইনস্টিটিউট হতে পরিচালিত অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, গতবছরে (২০২০-২১) ২২ দিন মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকার ফলে ৫১.৭৬% মা ইলিশ সম্পূর্ণভাবে ডিম ছেড়েছে। ফলে প্রায় ৪০ হাজার কোটি জাটকা নতুন করে ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছে।

গবেষকদের অভিমত, বর্তমান মজুদ নিয়ে আগামী ২-৩ বছর ৭.০ লক্ষ মে.টনের মধ্যেই ইলিশ আহরণ সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এর বেশি মাছ আহরণ করা হলে ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং ইলিশের প্রাকৃতিক মজুদ ও জাটকা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক ড. আশরাফুল আলম জানান যে, ইলিশের সর্বোচ্চ সহনশীল উৎপাদন প্রতিবছরের বিদ্যমান মজুদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মজুদ কম-বেশি হলে আহরণ মাত্রাতে পরিবর্তন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইলিশ মাছের মজুদ জলাশয়ের গতি-প্রকৃতি, আহরণমাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিএফআরআই হতে পর পর ২ বছর (২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০) বরগুনা, পটুয়াখালী, খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, বরিশাল, মুন্সীগঞ্জ ও রাজশাহীর বিভিন্ন নদ-নদী ও সমুদ্রের ১২টি নমুনা স্থান থেকে লক্ষাধিক ইলিশ মাছের ওপর গবেষণা পরিচালনা করে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণায় পদ্মা ও মেঘনা নদীতে ইলিশ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে ৩৪-৩৬ সে.মি. আকারের ইলিশ এবং এদের অবদান ১৫-১৯%। অপরদিকে, সমুদ্রে ৩২-৩৪ সে.মি. সাইজের ইলিশ সর্বোচ্চ ২২% অবদান রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন যে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে দেশে ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য। তাছাড়া, সমুদ্রে ২২ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সমুদ্রে ইলিশের উৎপাদন ও সাম্প্রতিককালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি জানান।

প্রতিবেদনে গবেষকগণ কতিপয় সুপারিশ প্রদান করেছেন। প্রধান প্রধান সুপারিশসমূহ হচ্ছে বর্তমান মজুদের বিপরীতে দেশের নদ-নদী ও সাগর থেকে আগামী ২-৩ বছর পর্যন্ত প্রতিবছর ৭ দশমিক শূন্য লক্ষ মে.টনের বেশি ইলিশ আহরণ না করা, প্রতিটি ইলিশকে জীবনচক্রে কমপক্ষে ১ বার ডিম ছাড়ার সুযোগ দেয়া, ইলিশের আহরণ মাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বজায় রাখার লক্ষ্যে ইলিশ ধরা জালের ফাঁসের আকার, নৌকার আকার, ধারণ ক্ষমতা ও নৌকা প্রতি জনবলের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে দেয়া এবং ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্রকে দূষণের হাত থেকে সুরক্ষা করা।

উৎপাদনের পরিমাণ ॥ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে, ২ দশমিক ৯৮ লক্ষ মে.টন। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ১৩ লক্ষ মে. টন। ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪০ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৬৫ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১২-১৩ তে ৩ দশমিক ৫১, ২০১৩-১৪ তে ৩ দশমিক ৮৫ লক্ষ মে. টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮৭ লক্ষ মে.টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৫ লক্ষ মে.টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৯৬ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ দশমিক ১৭ লক্ষ মে.টন। ২০১৮-১৯ এ ৫ দশমিক ৩৩ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫০ লক্ষ মে. টন।

ইলিশ সম্পদ রক্ষা ও উন্নয়নে যে সকল উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ॥ ইলিশ মাছ রক্ষায় বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, (১) ইলিশ রক্ষায় মৎস্য সংরক্ষণ আইনটি ইলিশের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজনন সময় বিবেচনা করে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে ভিত্তি করে সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ সময়সীমা এখন ২২ দিন করা হয়েছে। (২) প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ এবং জাটকা ধরা নিষিদ্ধ সময়ে জাটকা ও ইলিশ সমৃদ্ধ এলাকার জেলেদের জীবন ধারণের জন্য ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। (৩) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাটকা ধরা নিষিদ্ধ সময়ে দেশের ২০ জেলার ৯৬টি উপজেলায় জাটকা আহরণে বিরত মোট ৩ লক্ষ ১ হাজার ২৮৮ জন জেলে পরিবারকে ৪০ কেজি হারে ৪ মাসের জন্য প্রায় ৪৬ হাজার ৭৭৮.০৮ মে.টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০ জেলার ৯৮ উপজেলার জাটকা আহরণে বিরত ৩ লক্ষ ৭৩ হাজার ৯৯৬টি জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ৪ মাসের জন্য ৫৬,২২৪.৮৮ মে.টন চাল ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

(৪) বিগত ১২ (২০১০ থেকে ২০২১) বছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় জাটকা ধরা নিষিদ্ধ সময়ে জাটকা আহরণে বিরত জেলেদের মোট ৪ লক্ষ ১১ হাজার ৪০৭.৫০ মে.টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। (৫) ২০২০ সনে মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ সময়ের পূর্বেই দেশের ইলিশ সমৃদ্ধ ৩৬ জেলার ১৫২ উপজেলায় মোট ৫ লক্ষ ২৮ হাজার ৩৪২টি জেলে পরিবারকে ২০ কেজি হারে মোট ১০ হাজার ৫৬৭ মে. টন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। (৬) জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের কাক্সিক্ষত উন্নয়নে বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল এ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বৃহৎ প্রকল্প এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও এ সম্পদের উন্নয়ন টেকসইকরণের লক্ষ্যে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ মৎস্য অধিদফতর বাস্তবায়ন করছে। যার প্রত্যক্ষ সুফলভোগী হবে জেলে ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়। (৭) প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সামুদ্রিক জলসীমায় ৬৫ দিনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ সময়ের জন্য উপকূলীয় সকল জেলে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, এর আওতায় ২০২০ সালে মোট ৩ লক্ষ ৯৬ হাজার ৭৮৬টি জেলে পরিবারকে মোট ৩৫ হাজার ৩৫০.৫৬ মে. টন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এবং ২০২১ সালে ১ম কিস্তিতে মোট ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৫৯৫টি জেলে পরিবারকে মোট ১৬ হাজার ৭২১.৩২ মে. টন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। (৮) পদ্মা, মেঘনার উর্ধাঞ্চল ও নিম্ন অববাহিকায়, কালাবদর, আন্ধারমানিক ও তেঁতুলিয়াসহ অন্যান্য উপকূলীয় নদীতে মোট ৬টি ইলিশ অভয়াশ্রম স্থাপন ও অংশীদারিত্বমূলক ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ করা হয়েছে।

(৯) ইলিশসহ অন্যান্য সকল উপকূলীয় জলজ মেঘাফনা রক্ষায় এ বছরই নিঝুম দ্বীপ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ৩ হাজার ১৮৮ বর্গ কিঃমিঃ আয়তনের সামুদ্রিক সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে।

(১০) ইলিশের পোনা জাটকা যেন ইলিশ ধরার জালে আটকে না যায় তাই সরকার ফাঁস জালের মেস সাইজ ৬.৫ সেমি নির্ধারণ করেছে যা জাটকা রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখবে। (১১) জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিবছর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, পুলিশ, র‌্যাব, নৌ-পুলিশ এবং মৎস্য অধিদফতর কর্তৃক সম্মিলিতভাবে অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়ে থাকে। (১২) জাটকা ও ইলিশ রক্ষায় সর্বসাধারণকে সম্পৃক্ত করার জন্য দেশব্যাপী বিভিন্ন ধরনের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে।

ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প ॥ ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প ৪ বছর মেয়াদী ৩১ জানুয়ারি ২০২১ সাল থেকে শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি রাজস্ব বাজেটে ২৪৬.২৭ কোটি টাকায় ২৯টি জেলার ১৩৪ উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ইলিশ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মধ্যে সচেতনতা সভা, ৬টি ঘোষিত অভয়াশ্রম সংলগ্ন ইউনিয়নে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত রাখতে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা কার্যক্রম জোরদারকরণ, মৎস্য সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দরিদ্র জেলেদের উপকরণ সহায়তা প্রদান, উপকরণ ট্রেডভিত্তিক আবাসিক হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান, উপকূলবর্তী ৭টি জেলায় বৈধ জাল বিতরণসহ ১৪টি জেলার ৭১টি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় কম্বিং অপারেশন নামে সম্মিলিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এছাড়া ১৯টি জেলায় এফআরপি বোট ক্রয়ের মাধ্যমে পেট্রোলিং কার্যক্রম জোরদারকরণ করা হবে।