বিদেশ যাচ্ছে জয়পুরহাটের আলু, খুশি কৃষকরা

কৃষির ওপর নির্ভরশীল উত্তরের জেলা জয়পুরহাট। এখানে মোট কৃষি জমির ৮০ শতাংশ জমিতে আলু চাষ করেন কৃষকরা। আলু উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা জয়পুরহাটে এবারও বাম্পার ফলন হয়েছে। যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তার চেয়ে অধিক পরিমাণ জমিতে আলু চাষ হয়েছে।

বীজ, সার ও কীটনাশকের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং রোগবালাই কম হওয়াসহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আলুর ভালো ফলন হয়েছে। ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার আলু জেলা ও উপজেলায় সরবরাহসহ বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। বাজারে আলুর ভালো দাম পাওয়ায় লাভের মুখ দেখছেন স্থানীয় চাষিরা।

জয়পুরহাটে যেসব আলু উৎপাদন হয়, সেগুলো হচ্ছে-উফশী জাতের মিউজিকা, ডায়মন্ড, এস্টোরিক্স, কার্ডিনাল, রোজেটা, ক্যারেজ, স্থানীয় পাকড়ী জাতের তেল-পাকড়ী, পাহাড়ি-পাকড়ী, বট-পাকড়ী ও ফাটা-পাকড়ী। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে মিউজিকা, ডায়মন্ড, এস্টোরিক্স, কার্ডিনাল, ও রোজেটা জাতের আলু চাষ হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, জেলায় এবার ৪০হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৮৩ মেট্রিক টন ধরা হলেও এটি অতিক্রম করবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। জেলায় পাঁচ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় কালাই উপজেলায়। কালাই পৌরসভাসহ উপজেলার মাত্রাই, উদয়পুর, পুনট, জিন্দারপুর ও আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে ১০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ২০০ হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে উফশী জাতের আলু এবং স্থানীয় ৩৫০ হেক্টর জমিতে পাকড়ী জাতের আলু চাষ হয়েছে। আলু উৎপাদনের জন্য এবার কৃষকদের জমি লিজসহ, বীজ, জমি চাষ, সার-ওষুধ, সেচ, নিড়ানি, বাঁধাই, আলু উত্তোলনসহ প্রতি বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে খরচ হয়েছে গড়ে ১২-১৪ হাজার টাকা।

জয়পুরহাটের বিভিন্ন বাজারে আগাম জাতের আলু জাতভেদে প্রতি মণ সর্বোচ্চ ৫৫০-৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বাজারে আমদানি বেশি হওয়ায় তা কিছুটা নেমে ৫০০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হয়। বর্তমানে খুচরা বাজারে আলু জাত ভেদে ৪৫০-৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। এভাবে বাজার থাকলে বিঘা প্রতি আলুতে ১৮-২৩ হাজার টাকা লাভ করতে পারবেন কৃষকরা।

জয়পুরহাটে আলুর বাম্পার ফলন হওয়ায় স্থানীয়ভাবে চাহিদা মিটিয়ে এখানকার আলু ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, ফেনী ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও, কালাইয়ের আলু মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

কালাই উপজেলার ১০-১৫টি স্থান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ হাজার মণ বিভিন্ন জাতের আলু কিনছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়াও, উপজেলার বিভিন্ন মাঠ থেকে রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিরা পরিপক্ক আলু সংগ্রহ করে তা বাছাই করে নেটের হলুদ প্যাকেটে প্যাকেটজাত করছেন। এখানকার আলু বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় বাজারে আলুর চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। আলুর ভালো দাম পাওয়ায় স্থানীয় চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে।

কালাই উপজেলার আপলাপাড়া গ্রামের আলুচাষি আব্দুল হান্নান বলেন, ৮ বিঘা জমিতে এস্টোরিক্স ও কার্ডিনাল জাতের আলু চাষ করেছি। বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় আলু পেয়েছি প্রায় ১০০ মণ। বিদেশি এক কোম্পানির এজেন্টের কাছে ওইসব আলু বিক্রি করেছি। সব খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে আলুর বাজার দর অনুযায়ী প্রতি বিঘায় লাভ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।

কালাই উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের আলুচাষি রাজ্জাক বলেন, মালয়েশিয়ার মাসাওয়া কোম্পানির এজেন্টের কাছে প্রতি মণ ৫৩০ টাকা দরে দুই বিঘা জমির মিউজিকা জাতের আলু বিক্রি করেছি। এবার বাজারে আলুর দাম ভালো পাওয়ায় অনেক খুশি হয়েছি।

কালাই উপজেলার নান্দাইলদীঘি গ্রামের মালয়েশিয়ার মাসাওয়া কোম্পানির আলু কেনার এজেন্ট মো. বাশেদ ও রফিকুল বলেন, মালয়েশিয়ার মাসাওয়া কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন ১৩ টাকা কেজি দরে প্রায় ৪০০ মণ বিভিন্ন জাতের আলু কিনতে হচ্ছে। আর এভাবে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত আলু কিনতে হবে।

জয়পুরহাট সদরের বম্বু গ্রামের কৃষক মোফাজ্জল হোসেন, ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের কৃষক আমজাদ হোসেন, আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর গ্রামের কৃষক লোকমান মিয়া, পাঁচবিবি ফিসকাঘাটের একাধিক কৃষক জানান, প্রতি বিঘা জমিতে জাতভেদে ৭০-১০০ মণ পর্যন্ত আলু উৎপাদন হয়েছে।

কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নীলিমা জাহান বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। মান ভালো করতে আমরা প্রতিনিয়ত কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। কৃষকরা যাতে ভালো ফলন পান, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। আলুর দাম ভালো পেয়ে কৃষকরা অনেক খুশি।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের আলু ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে না করে হাইজেনিক পদ্ধতিতে আলু চাষ করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। হাইজেনিক পদ্ধতিতে আলু চাষ করলে প্রতি বছর বিদেশিদের কাছে চাহিদা বাড়তেই থাকবে।

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার বিদেশে আলুর চাহিদা বেড়েছে। আলু পাঠাতে কৃষি বিভাগ যদিও রপ্তানিকারকদের সাথে যুক্ত নয়, তারপরও পরামর্শসহ সহযোগিতা করে আসছে। যাতে দেশের আলু পৃথিবীর সব দেশে রপ্তানি করা যায়।