শতভাগ বিদ্যুতায়নের সাফল্য: নজর থাকুক নবায়নযোগ্যতে

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের যে ঘোষণা দিয়েছেন, এর তাৎপর্য বহুমাত্রিক। আমাদের মনে আছে, এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল- মুজিববর্ষ উপলক্ষে দেশের সব এলাকা বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা হবে। সোমবারের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি পালিত হলো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম শতভাগ বিদ্যুতায়নের সাফল্যের জন্য আমরা বর্তমান সরকারকে অভিনন্দন জানাই। বস্তুত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখার বিষয় কেবল নয়; বিদ্যুতায়নের সঙ্গে উন্নয়ন ও উৎপাদনের সম্পর্কও ভুলে যাওয়া চলবে না। আর আমরা যে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের স্বপ্ন দেখছি, তা বাস্তবায়নে শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যুতায়ন যাতে টেকসই হয়, একই সঙ্গে নজর দিতে হবে সেদিকেও। বিশেষত নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে। লক্ষণীয়ভাবে এই ঘোষণা এসেছে এমন একটি জ্বালানি স্থাপনার উদ্বোধন অনুষ্ঠান থেকে, যেটা দেশের সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্র দেশের বিদ্যুতায়ন পরিস্থিতি উন্নয়নে নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে; কিন্তু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে গোটা বিশ্বই যে ক্রমে সরে আসছে, তা ভুলে যাওয়া চলবে না।
আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নতুন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। সম্প্রতি সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, এই মহাপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশে উন্নীত করার চিন্তাভাবনা চলছে। সেই লক্ষ্যে কয়লার ব্যবহার কমানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নে ধীরগতিসম্পন্ন ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গত বছর বাতিলের ঘোষণা ছিল তারই নজির। কিন্তু মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি আনা এবং প্রতিশ্রুতির তুলনায় প্রয়োগে জোর দেওয়া ছাড়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন। আমরা দেখেছি- আগের মহাপরিকল্পনায় প্রথমে ২০১৫, পরে ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সোমবার যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করা হলো, সেটা আবার কয়লাচালিতই। মনে রাখতে হবে, বর্তমানে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারিত হলেও বায়ু ও জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে আমরা রয়েছি অনেক পিছিয়ে। এখন এদিকে জোর দেওয়া যেতে পারে। হিমালয় অঞ্চলের খরস্রোতা প্রবাহগুলোকে কেন্দ্র করে লক্ষাধিক মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এখন জোর দিতে হবে বাস্তবায়নে।
স্বীকার করতেই হবে- শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার টানা তিন মেয়াদের প্রথম থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে এসেছে। আমরা দেখছি, দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা এরই মধ্যে ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। অথচ ‘ফাইভ ডিজিট’ উৎপাদনে পৌঁছার কথা মাত্র এক দশক আগেও ভাবা যেত না। বিশেষত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা চার হাজার মেগাওয়াটও ছুঁতে পারেনি। বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে আবাসন ব্যবসা এবং শিল্প স্থাপনেও এসেছিল স্থবিরতা। গ্রামীণ জনপদেও বিদ্যুতের অভাবে চাষাবাদ বিঘ্নিত হতে দেখা গেছে। কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ খাতে সম্পূর্ণতা অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বর্তমান সরকার ‘কুইক রেন্টাল’ ও প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মতো উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি। কিন্তু বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে যতখানি মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল, সংশ্নিষ্টরা সম্ভবত তা দিতে পারেনি। আমরা মনে করি, শতভাগ বিদ্যুতায়নের সাফল্যের এ উপলক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার দিকেও জোর দিতে হবে এখন। জোর দিতে হবে বিদ্যুতের মূল্য সাশ্রয়েও- প্রচলিত ও নবায়নযোগ্য, দুই খাতেই। যে সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য শতভাগ বিদ্যুতায়ন করা হচ্ছে; বিদ্যুৎ তাদের কাছে যদি সুলভ করা না যায়, তাহলে তো সকলই গরল ভেল!