নীড় খেলা সিংহের দেশে বাঘের রাজত্ব

সিংহের দেশে বাঘের রাজত্ব

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয়

৩৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে একাই দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংয়ে ধস নামান তাসকিন - এএফপি

রং খেলার দিন শেষ হয়ে গেছে আগেই। প্রিয় দলের জয় দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে দেশের মানুষ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ জয়ে তাই রাজপথে রঙের হোলি খেলা না হলেও বিজয়ের রঙে রাঙা হয়েছে ১৭ কোটি বাঙালির হৃদয়। সেঞ্চুরিয়ন থেকে পলাশের রং ছড়িয়ে উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা। টাইগারদের আফ্রিকা বিজয়ে ড্রেসিংরুমে নেমেছে উৎসবের ঢল। ইতিহাস রচনায় গাওয়া হয়েছে বিজয় গীত, ‘আমরা করব জয়… আমরা করেছি জয়।’ যেমন গাওয়া হয়েছিল নিউজিল্যান্ডে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে, সেন্ট কিটসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এক দিনের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার পর।

সেঞ্চুরিয়নে সমতা নিয়ে শুরু হয়েছিল সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচটি। সিরিজটি নিজেদের করে নিতে উন্মুখ হয়ে ছিল বাংলাদেশ। স্বপ্ন পূরণে খেলেনও তারা মরিয়া হয়ে। ভেতরের উত্তেজনা চাপা রেখে বারুদ বোলিং দিয়ে স্বাগতিকদের ১৫৪ রানে গুঁড়িয়ে দেন তাসকিন আহমেদরা। বোলিংয়ে আঁকা হয় জয়ের পথ। জিততে ব্যাটারদের শুধু আনুষ্ঠনিকতা দিতে হতো। তামিম ইকবাল ও লিটন কুমার দাস সে দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেন ১২৭ রানের জুটি গড়ে। ঐতিহাসিক জয়টি আরও বর্ণিল হতে পারত ১০ উইকেটে জেতা গেলে। লিটন কুমার দাস ৪৮ রানে আউট হয়ে সেখানটায় কিছুটা অপূর্ণতা রেখে দিলেন। হয়তো সাকিব আল হাসানকে ব্যাটিংয়ের সুযোগ দিতেই ক্রিকেট দেবতার এই খেলা। লিটনকে ড্রেসিংরুমে পাঠিয়ে বাঁহাতি এই অলরাউন্ডারকে সুযোগ করে দেন সব্যসাচী হয়ে ওঠার। ৯ উইকেটে জয়ের ম্যাচে ৮৭ রানে অপরাজিত তামিম ইকবাল। বাউন্ডারি দিয়ে খেলা শেষ করা সাকিবের রান ১৮।

বিশ্বকাপ সুপার লিগে বাংলাদেশ বছর শেষ করল ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে। বিদেশের মাটিতে টাইগারদের এটি সপ্তম সিরিজ জয় হলেও বড় দলের বিপক্ষে দ্বিতীয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় হলো স্বপ্ন পূরণ। সিংহের দেশে প্রতিষ্ঠিত হলো বাঘের রাজত্ব।

স্মরণীয় এই সিরিজের শেষটা পূর্ণতার সুন্দর একটি ছবি। যেখানে আঁকা হয়েছে তাসকিন আহমেদের ডানা মেলার ছবি। যে ছবি ভয়ংকর সুন্দর, উইকেট পাওয়ার পর সবুজ চিল হয়ে ওড়া। তাসকিন আহমেদের এই উদযাপন পুরোনো হলেও নতুনত্বে ভরপুর। বাঙলার চিল হয়ে গতকাল সেঞ্চুরিয়নে পাঁচবার দুই বাহু প্রশস্ত করে দিজ্ঞ্বিদিক ছুটলেন মুখে স্মিত হাসি নিয়ে। তাসকিনের পাঁচ উইকেট পাওয়ার আনন্দ ড্রেসিংরুম থেকে ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির ঘরে ঘরে। কী দারুণ ছিল মুহূর্তগুলো। লেখক হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে লিখতেন বড়ই সৌন্দর্য। তাসকিন সত্যিই মারাত্মক বোলিং করেন গতকাল সেঞ্চুরিয়নে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে। তিনি পাঁচ উইকেট নেওয়াতেই প্রোটিয়াদের ১৫৪ রানে বেঁধে রাখা গেছে। বড়ই সৌন্দর্য এই বোলিং।

সেঞ্চুরিয়নে প্রথম ম্যাচেও ভালো বোলিং করেন তাসকিন। ৩৬ রান দিয়ে নেন গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উইকেট। সে ম্যাচে জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই মাঠ, সেই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন তাসকিন। সবাইকে ছাপিয়ে বোলিংয়ের সব আলো কেড়ে নেন তিনি। যদিও তাকে দিয়ে বোলিং ওপেন করানো হয়নি। শরিফুল ইসলাম ও মুস্তাফিজুর রহমান শুরু করেন। প্রথম স্পেলে এ দুই পেসার ব্রেক থ্রু দিতে না পারায় পঞ্চম ওভারে মুস্তাফিজের জায়গায় স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজকে বোলিংয়ে আনেন অধিনায়ক তামিম। কুইন্টন ডি কককে আউট করে ব্রেক থ্রু দেন তিনি। অষ্টম ওভারে বোলিংয়ে এসেই আগুনে ডেলিভারি দেন তাসকিন। যদিও প্রথম স্পেলের দুই ওভারে উইকেটশূন্য ছিলেন। পরের স্পেলে এসেই বিস্ম্ফোরণ ঘটান। প্রথম বলে চার খেলেও তৃতীয় বলে ভ্যারোনিকে বোল্ড করেন। যদিও আহামরি কোনো বল ছিল না। ভ্যারোনি নিজের দোষে আউট হন। নিজের পরের ওভারেও উইকেট নেন। এক্সট্রা বাউন্স দিয়ে জানেমান মালানকে ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেন। ২৬ বছর বয়সী এ ফাস্ট বোলারের দ্বিতীয় স্পেলটি তিন ওভারের। তৃতীয় স্পেলে এসেও জুটি ভাঙেন তাসকিন প্রিটোরিয়াসকে ড্রেসিংরুমে ফিরিয়ে। পরে মিলার ও রাবাদার উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান। এক দিনের ক্রিকেটে তার প্রথম পাঁচ উইকেট ছিল ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অভিষেক ম্যাচেই বাজিমাত করেছিলেন। যদিও সে ম্যাচে হেরেছিল বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশি বোলারের প্রথম পাঁচ উইকেট পাওয়া।

তাসকিন পাঁচ উইকেট পেলেও বাকিরা খারাপ করেননি। ইউনিট হিসেবে বোলিং করে গেছেন পাঁচ বোলার। রান দেওয়ায় সবাই ছিলেন কৃপণ। ভালো জায়গায় বল করায় স্বাগতিক ব্যাটাররা রানও বের করতে পারছিলেন না সেভাবে। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়ায় ব্যাটাররা সিঙ্গেল নিতে সাহস পাচ্ছিলেন না। স্বাগতিকরা দেড়শ রানের মধ্যে ৭৮ রানই নিয়েছে বাউন্ডারি থেকে। বড় শট খেলতে গিয়ে উইকেটও হারায়। সাকিব দুই উইকেট পেলেও রান দেওয়ায় ছিলেন মিতব্যয়ী। ৯ ওভারে ২৪ রান খরচ হয় তার। শরিফুল সাত ওভারে ২৭ রানে পান একটি উইকেট। মুস্তাফিজ উইকেট শূন্য। দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৭ ওভারে অলআউট হওয়ায় মিরাজ পাঁচ ওভার ভাগে পান।

বাংলাদেশের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার এটাই সর্বনিম্ন স্কোর। আগের সর্বনিম্ন ছিল ১৬২ রানের। ২০১৫ সালে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে প্রোটিয়াদের অলআউট করে জিতেছিল বাংলাদেশ। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এত ভালো পারফরম্যান্স এই প্রথম। জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় ওয়ানডেটি বাদ দিলে বিশ্বকাপ সুপার লিগের এই সিরিজে ফেভারিটের মতো খেলেছে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে ৩১৪ রান করে একপেশে বানিয়ে ফেলে ম্যাচ। সে ম্যাচেও প্রোটিয়াদের অলআউট করে ৩৮ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে টাইগাররা। বাংলাদেশ দল এই প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকাকে তাদের মাঠে দু’বার দুই ম্যাচে অলআউট করল। এদিক থেকেও টাইগারদের ঐতিহাসিক সিরিজ এটি। স্বাগতিকরা প্রথম ম্যাচে কিছুটা লড়াই করতে পারলেও শেষ ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। শুরুতে মেরে-কেটে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতটা দেখালেও সে দাপট বেশিক্ষণ টেকেনি। বোলিং ইউনিট বারুদ জ্বালিয়ে সেঞ্চুরিয়নে উৎসবের উপলক্ষ এনে দেয়। বাংলাদেশ এই সিরিজ জিতে বিশ্ব ক্রিকেটে বার্তা দিল- দেশের পর বিদেশের মাটিতেও জিততে শিখে গেছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে কোনো দলই নিজেদের মাঠেও নিরাপদ নয়।

বিশ্বকাপ সুপার লিগের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকে সিরিজটি শুরু করে বাংলাদেশ। ১৫ ম্যাচ থেকে ১০০ পয়েন্ট অর্জন ছিল টাইগারদের। ১৮ ম্যাচে সেটা বেড়ে হলো ১২০ পয়েন্ট। এই সিরিজ জেতায় ২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠেয় ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গেল। দক্ষিণ আফ্রিকা অবশ্য অতটা স্বস্তিতে নেই। ১২ ম্যাচ থেকে ৪৯ পয়েন্ট তাদের।