উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় ওষুধ শিল্প পার্ক

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ২১৬ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে ওষুধ শিল্প পার্ক। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ, তবে ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের কারখানা এখনও গড়ে তোলেনি সেখানে। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটলে এ শিল্প পার্ক ওষুধ শিল্পকে সুরক্ষা দেবে।

ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ‘অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই)’ বা ‘ওষুধ শিল্প পার্ক’ নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক যুগ আগে। এখন সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে চলছে।

রাজধানী থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর পাড় ঘেঁষে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ২১৬ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিল্প পার্কের ‘সরকারি অংশের অবকাঠামো উন্নয়নকাজ’ শেষ হলেও উৎপাদন শুরু হয়নি এখনও।

উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় ওষুধ শিল্প পার্ক

 

প্রকল্প এলাকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২১৬ একর জমিতে ৪২টি প্লট ২৭টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে ২০১৭ সালে বুঝিয়ে দেয়া হলেও মাত্র দুটি কোম্পানির কারখানা দৃশ্যমান। দুটির আংশিক কাজ হয়েছে। বাকিগুলোর ভবন নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজ শুরুই হয়নি এখনও।

প্লট বরাদ্দ পাওয়া অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কবে নাগাদ কারখানা নির্মাণ করে উৎপাদনে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান দাবি করেছেন, ওষুধ শিল্প পার্ক পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাবে আগামী এক বছরের মধ্যে।

 

 

ওষুধ শিল্প পার্ক সরেজমিন পরিদর্শনকালে নিউজবাংলা কথা বলেছে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। তারা বলেছেন, সরকারের যে দায়িত্ব ছিল অবকাঠামোর উন্নয়ন করা, তা শেষ হয়েছে গত বছরের জুনে। এখন নিজস্ব কারখানা স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় ওষুধ শিল্প পার্ক

 

প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সরকারি অংশের অবকাঠামো উন্নয়নকাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন উদ্যোক্তাদের অংশের কাজ বাকি। তারা দ্রুত কারখানা স্থাপন করলে উৎপাদনে যাওয়া সহজ হবে।’

তিনি জানান, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়। এখন করোনার ভয় কেটে গেছে। সব কিছু স্বাভাবিক হচ্ছে। ফলে কাজের গতি এসেছে। অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে আসছেন। এরই মধ্যে ভবন নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে দু-তিনটি প্রতিষ্ঠান। শিগগিরই উৎপাদনে যাবে তারা।

সব প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে আরও দুই বছর সময় লাগবে বলে মনে করেন তিনি।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও হাডসন ফার্সাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শফিউজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা ঠিক, প্লট বরাদ্দ পাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও এপিআইতে যায়নি। তার মানে এই নয় যে তারা এপিআইতে কারখানা করছে না। অগ্রগতির শেষ ধাপে রয়েছি আমরা।’

উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় ওষুধ শিল্প পার্ক

 

তিনি জানান, ইতোমধ্যে কিছু কিছু শিল্প ইউনিট তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যে বড় চারটি শিল্প ইউনিট তাদের অবকাঠামো নির্মাণ শেষে জুনের মধ্যে ট্রায়ালে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

২০২৩ সালের প্রথম দিকেই এপিআই পার্ক পুরোপুরি উৎপাদনে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

দেশীয় ওষুধ শিল্পের প্রসার, প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, ওষুধের মান উন্নয়নে গবেষণা এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যেন বাংলাদেশেই উৎপাদন করা যায়, সেই লক্ষ্যে ২০০৮ সালে দেশে একটি আলাদা ওষুধ শিল্প পার্ক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে এ-সংক্রান্ত প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায়।

শুরুতে ওষুধ শিল্প পার্ক বানাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৩ কোটি টাকা, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং নানা জটিলতার কারণে এই প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ দুটোই বেড়েছে।

শুরু থেকে এ পর্যন্ত তিন দফা সংশোধন হয় এ প্রকল্পের। সবশেষ ব্যয় ধরা হয় ৩৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেয়া ৩০১ কোটি টাকা ব্যয় হয় মূল প্রকল্পের অবকাঠামো উন্নয়নে। আর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি নির্মাণেই বরাদ্দ দেয়া হয় ১২০ কোটি টাকা। ওষুধ কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির অর্থে নির্মাণ হয় সিইটিপি।

এপিআই পার্কের অবকাঠামো কাজ শেষ হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো কেন কারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসছে না, তা জানতে চাইলে একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান সিনহা বলেন, ‘এপিআই পার্ক বড় ব্যয়বহুল ইন্ডাস্ট্রি। দেশে এপিআই পার্ক নতুন, তবে বিনিয়োগের ঝুঁকিটাও কম নয়। অনেকে হয়তো সেই ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ঝুঁকির কথা চিন্তা না করেই এগিয়ে এসেছি। আশা করছি বাকিরাও শিগগিরই চলে আসবে, তবে করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েছেন।’

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাটি ভরাট, রাস্তা, ড্রেন, কালভার্ট, অ্যাপ্রোচ রোড, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ, গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন, ড্রেন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে।

উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় ওষুধ শিল্প পার্ক

 

প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ শহীদুল ইসলাম দাবি করেন, ওষুধ শিল্প পার্ক চালু হলে এখান থেকে শতভাগ কাঁচামাল উৎপাদন করা যাবে। ফলে ওষুধ সস্তা হবে। এটি উৎপাদনে গেলে সরাসরি কর্মসংস্থান হবে ২৫ হাজার লোকের।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হেলথকেয়ার এবং একমি ল্যাবরেটরিজের কারখানার কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। তাদের নিজস্ব অবকাঠামো শেষ হওয়ার পথে।

যন্ত্রপাতিও আমদানির প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান কর্মকর্তারা।

হেলথকেয়ার ২০১৯ সাল থেকে এখানে তাদের নিজস্ব অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ শুরু করে। এরই মধ্যে তারা ল্যাবরেটরি এবং গবেষণার কাজ সম্পন্ন করেছে।

গত নভেম্বর থেকে ‘পরীক্ষামূলক উৎপাদন’ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। কর্মকর্তারা জানান, নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে তারা ওষুধের তিনটি কাঁচামাল উৎপাদনের পরীক্ষা চালিয়ে সফল হয়েছেন।

হেলথকেয়ার কেমিক্যালস লিমিটেডের এপিআই প্রকল্পের সহকারী ব্যবস্থাপক হাসিবুর রহমান নিউজবাংলাকে জানান, দুই মাসের মধ্যে তারা পাইলট উৎপাদনে যাবেন। পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাবেন এ বছরের ডিসেম্বরে।

এখানে ৪০টি ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন করবে হেলথকেয়ার। সেগুলো নিজেরাই পেটেন্ট করে নেবে প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘বাণিজ্যসংক্রান্ত মেধাস্বত্ব’ (ট্রিপস) আইনে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ওষুধের পেটেন্ট ছাড় পেয়ে আসছিল ৯৫ ভাগ ওষুধের ক্ষেত্রে। এ কারণে অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ সস্তায় ওষুধ উৎপাদন করতে পারছে।

২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটলে এই সুবিধা আর থাকবে না। তখন ওষুধ উৎপাদনে বিদেশি পেটেন্ট ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে রয়ালটি বা ফি দিতে হবে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়তে পারে ওষুধের দামের ওপর।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে নিজেদের কাঁচামাল তৈরি করতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন দ্রুত ওষুধ শিল্প পার্ক চালু করা।

উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় ওষুধ শিল্প পার্ক

 

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর।

পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ যদি কাঁচামালও উৎপাদন করতে পারে, তবে বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন বা ৬০ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি আয় করা সম্ভব।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ড. আ ব ম ফারুক বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের পর আমাদের কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। সমস্যা হতে পারে ২০৩৩ সালের পর। তার আগেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।’

হেলথকেয়ারের এপিআই প্রকল্পের সহকারী ব্যবস্থাপক হাসিবুর রহমান বলেন, ‘এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আমাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। কারণ তার আগেই ওষুধ শিল্প পার্ক উৎপাদনে যাবে।’

একই মন্তব্য করে ওষুধ শিল্প পার্কের প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ শহীদুল ইসলাম বলেন, এলডিসি উত্তরণের আগেই এপিআই উৎপাদনে যাবে।

উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় ওষুধ শিল্প পার্ক

 

কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের কাজ প্রায় শেষ

পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে প্রকল্প এলকায় দুই ইউনিটের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইপিটি) নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয় ১২০ কোটি টাকা। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রেমকি এনভায়রো সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড এটি নির্মাণ করছে।

প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট শচিন ওটারকার জানান, প্রথম ইউনিটের কাজ প্রায় শেষ। আট মাস পর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ হবে। দুই ইউনিটের কাজ শেষ হলে সিইপিটি থেকে বর্জ্য শোধন করা যাবে দৈনিক ২০ লাখ লিটার।

এপিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক সার্ভিসেস লিমিটেডের সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান বলেন, এই সিইপিটির মাধ্যমে ‘শূন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ নিশ্চিত করা হবে। পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না।