ক্ষেতের আইলে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী গৌরীপুরের গৃহিণীরা

বিশ্ব নারী দিবস আজ। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘নারীর সুস্বাস্থ্য ও জাগরণ।’ সমাজের অবহেলিত-নির্যাতিত ও নিপীড়িত নারীদের জাগরণে গৌরীপুরে কাজ করছেন একদল ‘ডাক্তারআপা’। আইলে ‘টাওয়ার পদ্ধতি’ মাধ্যমে গ্রামের কৃষকদের ভাগ্যের চাকা বদলে দেওয়ার সংগ্রামের অগ্রভাগের সৈনিক তারা। তাদের দেখানো পদ্ধতি অবলম্বন করে সবজি চাষ করে সফল হয়েছেন এ অঞ্চলের গৃহিণীরা।

পরিত্যক্ত জমিতে ফসল উৎপাদন, ফসলের রোগবালাই দমন ও বসতবাড়িতে পরিকল্পিত সবজি চাষের জন্য ‘ডাক্তারআপারা’ ছুটে চলেছেন বাড়ি বাড়ি।

‘ডাক্তারআপারা’ সবাই ময়মনসিংহের গৌরীপুরে অ্যাডরা বাংলাদেশের কমিউনিটি এম্পাওয়ারমেন্ট প্রজেক্টের অধীনের নারী কর্মী। নার্স বা ডাক্তারের ন্যায় সাদা অ্যাপ্রোন পরে ছুটে চলেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ঘরে-বাইরে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে দিনরাত পরিশ্রমী ওই নারী কর্মীরা পেয়েছেন ডাক্তারআপার স্বীকৃতিও।

ওই ডাক্তারআপারা হলেন— মিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজার দুলাল মিস্ত্রি, দিপালী দাশ, লাজিতা চাম্বুগং, আশা রানী দাশ, শিখা দেবনাথ, সোমা দে, সুমাইয়া আকাতার সুমি, লিমা আক্তার, সুব্রত সরকার, সিমা আক্তার, নিপা আক্তার, ফাহিমা আক্তার, হাওয়া আক্তার, তানিয়া আক্তার, মালা বসাক, কানিজ ফাতেমা, হাফিজা আক্তার, মৌসুমী সাহা, শিরিনা আক্তার ও জান্নাতুল ইসলাম।

প্রকল্পের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বাবুল সি গমেজ জানান, উপজেলার বোকাইনগর, রামগোপালপুর, অচিন্তপুর, গৌরীপুর সদর, ডৌহাখলা ও সহনাটী ইউনিয়নের ৯৮টি গ্রামে এই নারী কর্মীরা কাজ করছেন। নারী সমিতির সংখ্যা ১০০টি। সদস্য সংখ্যা চার হাজার ২৫০ জন। তাদের মধ্যে সবজি বাগানে ১৭৯, ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে ৩৮২, আইল ফসল ২০৯, নিবিড়ায়ন পদ্ধতিতে ধান চাষে ৩২৫ ও জলবায়ুসহিষ্ণু সবজি চাষের ১৬৭ জন কাজ করছেন। এক মাসে ১৬ হাজার ৫৫০ কেজি ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে জেলায় সর্বোচ্চ রেকর্ড অর্জন করেছে।
আইলে ফসল উৎপাদন করে সফল হয়েছেন ৩২৮ গৃহিণী।

তাদেরই একজন মিনা বেগম। তিনি উরুয়াকোনার শাহ জাহান মিয়ার স্ত্রী। নিজ জমির আইলে প্রায় ৬ হাজার টাকা খরচ করে ইতোমধ্যে ২০ হাজার টাকা ফসল বিক্রি করেছেন। আরও ৭-৮ হাজার টাকার অর্জন হবে বলে তিনি জানান। অতিরিক্ত এ আয়ে মিটে যাচ্ছে দুই সন্তানের স্কুলের খরচ।

রামগোপালপুরের আব্দুল্লাহর স্ত্রী ফাতেম খাতুন জানান, তিনি আইলে ফসল উৎপাদন করে বেশ লাভবান হয়েছেন। সবজি বিক্রির টাকায় তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে লেখাপড়া করছে। এসব আইলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বরবটি চাষ। এ ছাড়া উৎপাদন হচ্ছে লাউ, শিম, পুঁইশাক ও ঢেঁড়স।
অপরদিকে পুকুরপাড়ে সবজি চাষে সাফল্য পেয়েছেন সহনাটী ইউনিয়নের সোনামপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামের স্ত্রী পারভীন বেগমও। এসব নারীর বাড়তি আয়ে বদলে গেছে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থান।

এ ইউনিয়নের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজার (সিডিও) তন্ময় রায় জানান, এসব জমির আইল এক রকম পরিত্যক্ত ছিল, এখন সবুজে ছেয়ে গেছে। বাড়তি আয়ে পরিবারের সচ্ছলতাও এসেছে।

রামগোপালপুর ইউনিয়নের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজার (সিডিও) সুমাইয়া আক্তার সুমি জানান, যতদূর চোখ যায়, ততদূর আমরা ধানক্ষেতে সবজির দেয়াল করে দিয়েছি। এ অঞ্চলের কৃষকদের সহযোগিতায় গৃহিণীরা অতিরিক্ত মুনাফা পাচ্ছেন। পিছিয়ে পড়া এসব নারীকে কারিগরি সহযোগিতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন পথ দেখাচ্ছেন অ্যাডরা বাংলাদেশের কর্মীরা।

ক্ষেতের আইলে সবজি চাষ করে ৬৫৪ নারী আজ খুঁজে পেয়েছেন ক্ষুধা আর দারিদ্র্যতা বিমোচনের নতুন পথ।

প্রশিক্ষক নাসরিন আক্তার জানান, এবার কৃষকের দুঃস্বপ্নকে উড়িয়ে জলাবদ্ধতায় সবজি চাষের নতুন এক পদ্ধতির নাম ‘টাওয়ার’ পদ্ধতি। এ পদ্ধতি বিস্তারে নারী কর্মীরা ছুটে চলছেন বন্যা ও জলাবদ্ধ এলাকায়। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্যা কবলিক বা বর্ষা মৌসুমে কৃষকরা পানিতেই সবজি চাষ করছেন।

ব্যতিক্রমী উন্নয়নের বার্তা নিয়ে ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে কৃষকের দোরগোড়ায় ‘টাওয়ার পদ্ধতি’। পরীক্ষামূলক এ প্রকল্পে সফলতা আসায় এবার তা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে ফলদ বৃক্ষমেলায় এই টাওয়ার পদ্ধতি প্রদর্শিত হচ্ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাওয়ারও ওপরে উঠে যায়। পানি বাড়লেও ফসলের কোনো ক্ষতি হবে না বলে জানান প্রশিক্ষক নাসরিন আক্তার।

উপজেলা কৃষি অফিসার লুৎফুন্নাহার বলেন, কৃষককে নতুন ফসলের স্বপ্ন দেখাবে ‘টাওয়ার’। এ পদ্ধতি ছড়িয়ে গেলে পরিত্যক্ত জমিতে অতিরিক্ত ফসলও উৎপাদন হবে। জলবায়ুসহিষ্ণু চাষাবাদ পদ্ধতির আওতায় তাদের আবিষ্কার এখন ‘টাওয়ার’ পদ্ধতি।

সুপারভাইজার এনামুল হক জানান, বড় ড্রামেও এ পদ্ধতিতে ভাসমান সবজি চাষ করা যেতে পারে। পানি হলেও কৃষকের দুশ্চিন্তা থাকবে না।
ধানের ক্ষেতে সবজি আইল ছাড়াও এ সংস্থার মাধ্যমে সেলাই মেশিন, রাস্তার ধারে-পুকুরপাড়ে ও বসতভিটায় সবজি চাষ, ধাত্রী এবং ব্লকবাটিক কাজের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন প্রয়াসে জড়িয়ে আছেন নারীরা।

নাদিমুল হাসান জানান, আমরা পদ্ধতি ও কৌশল বাতলে দিচ্ছি, নারীরা শ্রমের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন।