রঙিন ফুলকপি, খেতে কি একই রকম?

বর্তমানের সবজি বাজারে ক্রেতিাদের নজর কাড়ছে অভিনব কিছু সবজি। যার একটি উদাহরণ হচ্ছে, নানা রঙের ফুলকপি। অনেকে একে বলে রেনবো ফুলকপি, অনেকে বলে রঙিন ফুলকপি, অনেকে বলে বিদেশি ফুলকপি।
সম্প্রতি সুপারমার্কেট কিংবা স্থানীয় বাজারগুলোতে এমন ফুলকপি খুব বেশি প্রচলিত না হলেও মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে। মজার বিষয় হলো, এ আমাদের সেই চিরন্তন সাদা রঙের ফুলকপি নয়, যেন রঙের নানা রকমফের।

এই ফুলকপিগুলো কখনো বেগুনি, কখনও কমলা কখনও বা তার রঙ সবুজ। তবে বাংলাদেশে সহজে চোখে পড়ে সবুজ রঙের ফুলকপি, যাকে আমরা ব্রোকলি বলি। গত কয়েক বছর ধরে বাজারে আসছে এই ধরণের রঙিন ফুলকপি। এবং ক্রমশ তা জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

কিন্তু কী এই রঙিন ফুলকপি? কেমন হয় তার স্বাদ? আর কীভাবেই বা রান্নার পরও এই রঙিন ফুলকপিগুলো ধরে রাখছে তাদের রঙিন জৌলুস? এ নিয়ে নিশ্চই বেশ প্রশ্ন আছে।

গোটা বিশ্ব পরিবেশে আজ পরিবর্তনের আবহাওয়া। চলছে বিপর্যয়। অসময়ের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে কৃষকদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সারা বছর ধরে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে ফসল ও আবাদি জমি নষ্ট হয়। চাষাবাদের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আনার জন্য বিভিন্ন দেশের কৃষি বিষয়ক গবেষক ও কৃষকরা শীতকালে বিকল্প ফসল চাষের পদ্ধতির পথ খুঁজেছেন কয়েক দশক ধরে।

শীতকাল মানেই বাজার জুড়ে ফুলকপি এবং বাঁধাকপির চাহিদা। তার ওপর বাড়তি পাওনা যদি হয় রঙিন বৈচিত্র্য, পুষ্টিগুণেও যদি হয় আগের মতোই ভরপুর! তাহলে তো সহজেই স্থানীয় বাজারে জায়গা করে নিতে পেরেছে এই শীতকালীন রঙ বেরঙের সবজিরা। এসব কারণেই কৃষি বিপ্লবের নতুন এই আবিষ্কারটি বেশ সাড়া পায়।

চিরন্তন সাদা রঙের ফুলকপি ছাড়াও আজকের বিশ্ববাজারে রয়েছে হলুদ, সবুজ, বেগুনি রঙের ফুলকপি। পাশাপাশি রয়েছে রঙিন বাঁধাকপিও।

আগে সাদা ফুলকপিই ছিল একমাত্র বিকল্প, এখন বাজারে জায়গা করে নিয়েছে তার রঙিন বন্ধুরাও। এই সমস্ত রঙিন ফুলকপিও সাদা ফুলকপির মতোই। এরা ‘ক্রুসিফেরাস উদ্ভিদ’ পরিবারের সদস্য। স্বাদে এবং গঠনে কোনো সাদা ফুলকপি থেকে আলাদা করা যায় না তাদের। আলাদা শুধু রঙে। এ ছাড়া পুষ্টি-মূল্যের সামান্য পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।এ যেন কৃষি বিজ্ঞানীদের এক আশ্চর্যজনক বৈকল্পিক পদক্ষেপ। যার দ্বারা ঐতিহ্যবাহী সাদা ফুলকপিগুলিকে পরিবর্তিত করে কমলা, বেগুনি এবং সবুজ করা হচ্ছে।

এই অভিনব ‘রেনবো ফুলকপি’ স্বাদে হয়তো রয়েছে একই রকম, কিন্তু রঙের গুণে তা সহজেই খাবার টেবিলে অন্য চমক তৈরি করছে। এই রঙিন কপিগুলো হলো কৃষির বিশেষ প্রজননের ফলাফল। কিছু বিজ্ঞানী এমন দাবি করেছেন যে, এই নতুন ফুলকপিগুলো যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর।

সাদা ফুলকপিগুলোকে সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখা হতো যাতে আলোর প্রভাবে সাদা ফুলকপিগুলো হলুদ রঙে পরিণত না হতে পারে। তাই পুরোনো জাতগুলোকে ব্লাঞ্চ করার দরকার পড়ত (আলোর অনুপ্রবেশের পরিমাণ কমাতে ভিতরের পাতাগুলো ছোট মাথার উপর আলগাভাবে বাঁধা হয়)। কিন্তু নতুন জাতগুলো নিজে থেকেই ব্লাঞ্চিং হয়। কারণ গাছপালা অভ্যন্তরীণ পাতা তৈরি করে যা আলোর অনুপ্রবেশ রোধ করে মাথাকে শক্তভাবে ধরে রাখতে পারে।

বেগুনি ফুলকপি তার রঙ পায় ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ থেকে, এটি একটি প্রাকৃতিক ফাইটোকেমিক্যাল যা অন্যান্য লাল, নীল বা বেগুনি রঙের ফল এবং সবজির পাশাপাশি লাল ওয়াইনেও পাওয়া যায়।

কমলা ফুলকপির রঙের পিছনে ‘ক্যারোটিনয়েড’-এর ভূমিকা রয়েছে। এই ক্যারোটিনয়েডগুলি গাজর, স্কোয়াশ এবং অন্যান্য হলুদ শাকসবজি এবং ফলগুলোতেও পাওয়া যায়। কমলা ফুলকপি আসলে একটি জেনেটিক মিউটেশন হিসেবে এসেছে যা এটিকে তার সাদা অংশের তুলনায় বেশি বিটা ক্যারোটিন ধারণ করতে দেয়।

সবুজ রঙের ফুলকপি, ‘ব্রোকোফ্লাওয়ার’ নামেও পরিচিত, যা ব্রকলি এবং ফুলকপির একটি সংকর। সবুজ ফুলকপিতে সাদা ফুলকপির চেয়ে বেশি বিটা ক্যারোটিন থাকে, তবে তা ব্রকলির চেয়ে কম।

যদিও সনাতনবাদীদের মতে, এই একাধিক রঙের সবজির প্রচলন এই প্রথমবার নয়। এর আগেও উদ্ভিদ প্রজননকারীরা সবজির চেহারা পরিবর্তন করেছেন। ১৭ শতক পর্যন্ত, ইউরোপে বেশিরভাগের খাদ্যতালিকায় কমন ছিল সাদা, হলুদ অথবা বেগুনি রঙের গাজর। হল্যান্ডের রাজপরিবারকে উদযাপন করে ডাচ উদ্ভিদ প্রজননকারীদের দ্বারা কমলা রঙের রঞ্জক যোগ করা হয়েছে আগেই।

গত কয়েক বছর ধরে ব্রিটেনের সুপারমার্কেটে হলুদ টমেটো এবং বেগুনি আলুসহ বেগুনি গাজরের প্রচলন দেখা গেছে। আমেরিকায়, এই রঙিন ফুলকপি বেশ কয়েক বছর ধরে পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয় আমেরিকার বাজারে যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছে এই সবজি। কমলা ফুলকপিতে বিটা ক্যারোটিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় থাকে। এটি ভিটামিন এ-এর একটি রূপ যা ত্বককে স্বাস্থ্যকর করে। বেগুনি রঙটি আসে অ্যান্থোসায়ানিন থেকে, যা রক্ত জমাট বাঁধা কমিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। আমেরিকায় কমলা ফুলকপির পরীক্ষায় দেখা গেছে যে সাধারণ ফুলকপির তুলনায় এতে বিটা ক্যারোটিনের ঘনত্ব প্রায় ২৫ গুণ বেশি থাকে।

নেদারল্যান্ডস এবং ফ্রান্সে রঙিন ফুলকপি এবং বাঁধাকপির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশের কৃষকরা এ ধরনের চাষে আগ্রহও দেখাচ্ছেন। তারা এই সবজির বাণিজ্যিক মূল্য বুঝতে পেরে ব্যাপকভাবে এই চাষে ঝুঁকছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক কৃষক রঙিন সবজি চাষ করেছেন। এই রঙিন ফুলকপি মন ভরাতে পেরেছে খাদ্যপ্রেমীদের।