বাঁশের নতুন তিন প্রজাতি উদ্ভাবন

বাঁশের তিনটি নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বাঁশের এই তিনটি নতুন লাইন (প্রজাতি) উদ্ভাবনের পর মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ করেছে সংস্থাটি। এখন নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন বিএফআরআই’র গবেষক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বাঁশের এই তিন প্রজাতি উদ্ভাবনের পর আমরা মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছি। ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাঁশগুলো পরিপক্ব হয়ে যায়। অন্য বাঁশ থেকে এইগুলোর ফলন অনেক বেশি পেয়েছি। মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষার পর এগুলো নিবন্ধনের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। গত ৬ জানুয়ারি নিবন্ধন প্রত্যয়ন কমিটি গঠন করার জন্য আমাদের এখান থেকে মন্ত্রণালয়কে আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগির এগুলোর নিবন্ধন হয়ে যাবে।

নতুন উদ্ভাবিত বাঁশের তিনটি প্রজাতি হলো, বিএফআরআই বাঁশ লাইন বিবি-১, বিএফআরআই বাঁশ লাইন বিএস-১ ও বিএফআরআই বাঁশ লাইন বিএন-১। ২০০৮ সালে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বাঁশের এই তিনটি জাত উদ্ভাবন করা হয়। এরপর গত ১০ বছর ধরে এসব বাঁশের ওপর মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় বন গবেষণা ইনস্টিটিউট। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এখন বাঁশগুলোর নিবন্ধনের কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ঘটনায় দুই দফায় মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন তারা। সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি এ বিষয়ে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বিএফআরআই।

জ্বালানি খরচবিহীন সেচযন্ত্র তৈরি করে এলাকায় আলোড়ন তুলেছেন কৃষকজ্বালানি খরচবিহীন সেচযন্ত্র তৈরি করে এলাকায় আলোড়ন তুলেছেন কৃষক
সংস্থাটির পরিচালক ড. রফিকুল হায়দার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কৃষি সেক্টরে নিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত ফসলের উদ্ভাবিত নতুন জাত বা বীজের নিবন্ধন প্রক্রিয়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি উপকরণ বিভাগের বীজ অনুবিভাগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে ফরেস্ট্রি সেক্টরের জন্য এ ধরনের কোনো সংস্থা নেই। এমতাবস্থায় বিএফআরআই উদ্ভাবিত বাঁশের নতুন জাত বা লাইনগুলির নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি বিএফআরআইসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩/৫ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে সম্পন্ন করা যেতে পারে। চিঠিতে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো একটি অনুবিভাগকে সার্বিক দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

বাঁশের প্রজাতি সংরক্ষণে ১৯৭৩ সালে বিএফআরআই-এ গবেষণা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। এরপর ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (আইডিআরসি) আর্থিক সহায়তায় চট্টগ্রাম নগরীর ষোলোশহর এলাকায় বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পর্যন্ত এই ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে গাছ এবং উদ্ভিদের ২৬টি নতুন প্রজাতির উদ্ভাবন করা হয়। এর মধ্যে ৬টি গাছের,৭টি ওষধি গাছ এবং বাঁশের ১৩টি নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করেন এই ল্যাবরেটরির গবেষকেরা। এর মধ্যে ১৯৯০ সালে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে প্রথম মূলি বাঁশের নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করা হয়। এরপর ২০১৯ সালে এসপার নামে বাঁশের ১৩ তম নতুন প্রজাতিটির উদ্ভাবন করা হয়। এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন উদ্ভাবিত বাঁশের এই তিন প্রজাতি।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর করোনা প্রতিরোধী স্প্রে উদ্ভাবনবাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর করোনা প্রতিরোধী স্প্রে উদ্ভাবন
বন গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, লবণাক্ত মাটি ছাড়া সব ধরনের মাটিতে নতুন প্রজাতির এই তিন ধরনের বাঁশ উৎপাদন করা যাবে। জুন থেকে আগস্ট মাসে এই বাঁশ রোপণ করতে হবে। এরপর শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে আর্দ্রতার জন্য সামান্য পানি দিতে হবে। তবে বর্ষার মৌসুমে পানি সেচ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বর্ষায় এক মাসের কম সময় পানির নিচে থাকলেও বাঁশের কোড়লগুলোর কোনো সমস্যা হবে না। মাঠ পর্যায়ে বান্দরবানের পাইথং, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও উত্তরাঞ্চলের বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট-ঈশ্বরদীতে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হয়।

মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় কি ফলাফল পাওয়া গেছে জানতে চাইলে ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, যে বাঁশ থেকে আমরা যে লাইনটা উদ্ভাবন করেছি, সেখানে দেখা গেছে এই বাঁশগুলো আদি প্রজাতি (প্যারেন্টিং বাঁশ) থেকে কয়েকগুণ বেশি উৎপাদন হচ্ছে। নতুন তিন প্রজাতির বাঁশ ৩ বছর বয়সেই অন্য বাঁশ থেকে তিনগুণ বেশি বাঁশ উৎপাদন করে এবং শতভাগ কোড়লই বেঁচে থাকে। এসব বাঁশের উচ্চতা এবং আকার অন্য যে কোনো বাঁশ থেকে অনেক বেশি। এসব বাঁশের রোগ বালায়ের আক্রমণ দেখা যায়নি।