স্বাদে অতুলনীয় কুষ্টিয়ার চালকুমড়ো বড়ি

দেখতে যেমন সুন্দর, খেতে তার চেয়ে বেশি সুস্বাদু। খুব সহজেই গ্রামের নারীরা তৈরি করে থাকেন। প্রায় প্রতিটি সবজি বা মাছ রান্নায় দিলে বেড়ে যায় স্বাদ। বলা হচ্ছে কুমড়ো বড়ির কথা। শীতের শুরুতেই এ বড়ি তৈরি শুরু করেন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নারীরা। বাণিজ্যিকভাবে বড়ি বিক্রি করেও অনেকে সংসারে আনেন স্বচ্ছলতা।

সম্পূর্ণ দেশীয় উপাদানে তৈরি করা হয় এ কুমড়ো বড়ি। গাছপাকা সাদা বর্ণের চালকুমড়া কুচি কুচি করে কাটতে হয়, অনেকে কুড়ে কুড়েও তোলেন। তারপরে কলাইয়ের ডাল ভিজিয়ে সেটা বেটে, চালকুমড়া আর কলায়ের ডাল একসঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে ভালো করে মথে (মাখা) বাঁশের চাটাইয়ের ওপরে ছোট ছোট করে বড়ি বিছিয়ে দেওয়া হয়। তারপর দুই-তিন দিন ভালো করে রোদে শুকালেই খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায় সুস্বাদু কুমড়ো বড়ি।

শীতের আভাস আসার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের নারীরা বড়ি তৈরি করে থাকেন। সেটা পুরো শীতকাল জুড়েই বিভিন্ন সবজির সঙ্গে রান্না করে খাওয়া হয়। জেলার মিরপুর উপজেলার আমলা এলাকার আছিয়া খাতুন। প্রতি বছরের মতো এবারও তিনি কুমড়ো বড়ি তৈরি করেছেন।

তিনি বলেন, শীত আসলেই শীতের জন্য আমরা মজাদার চালকুমড়ার বড়ি তৈরি করি। শীতকালীন সবজির সঙ্গে এ বড়ি রান্না করলে পরিবারের সবাই খুব পছন্দ করে। আলু, বেগুন মাছ আর পালং শাকের সঙ্গে কুমড়ো বড়ি খেতে খুব ভালো লাগে।

বড়ি তৈরি সম্পর্কে জানতে চাইলে আছিয়া খাতুন বলেন, শীতের শুরুতেই পাকা চালকুমড়া আমরা কুড়ে নেই। তারপর কাঁচা কলাইয়ের ডাল ভিজিয়ে বেটে ময়দা মাখানোর মতো করি। খোলা পুকুরে কিংবা নদীর পানিতে ভালো করে সেটা ধুয়ে নিই, যাতে বড়িটার রং ধবধবে সাদা হয়। টিউবওয়েলের পানিতে ধুলে বড়িটা লালচে হয়ে যায়। কুমড়া আর কলাইয়ের ডাল যদি ভালো করে মেশানো না হয়, তাহলে সেটার স্বাদ কমে যায় এবং রান্না হতে দেরি হয়। বাঁশের মইয়ের ওপরে চাটাই বিছিয়ে তার ওপরে ডাল আর কুমড়ার মিশ্রন ছোট ছোট বড়ির মতো করে বসিয়ে রোদে শুকাতে দেই। তারপর তিন-চার দিন রোদে শুকালেই তৈরি হয়ে এ কুমড়ো বড়ি।

একই ইউনিয়নের কচুবাড়ীয়া গ্রামের ভানু খাতুন বলেন, প্রায় প্রতিটি সবজির সঙ্গেই রান্না করা যায় এ কুমড়ো বড়ি। শীতে উৎসবের আমেজে আমরা বড়ি তৈরি করি। সাধারণত বড়িতে কুমড়ার চেয়ে ডালের পরিমাণ বেশি হলে স্বাদ বেশি হয়। একটা মাঝারি সাইজের কুমড়ার সঙ্গে দুই কেজি কলাই দিলে ভালো হয়।

যারা বাড়িতে বড়ি তৈরি করেন না, তারা শীতে বাজার থেকে এসব বড়ি কিনে থাকেন। স্থানীয় বাজারে এর চাহিদা বেশি থাকায় দামও বেশ ভালো।

মৌসুমি কুমড়ো বড়ি ব্যবসায়ী নিমতলা এলাকার সুমন জানান, শীতকালে এ কুমড়ো বড়ি বিক্রি বেশি হয়। তাই বাড়িতে এসব বড়ি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। এখন প্রতিদিন আমি ১৫-২০ কেজি কুমড়ো বড়ি বিক্রি করি। সাদা বড়ির চাহিদা বেশি। ২০০-২৫০ টাকা কেজি দরে এসব বড়ি বিক্রি করি। এভাবে পুরো শীত মৌসুম চলে বড়ি বিক্রি।

খয়েরপুর এলাকার বাসিন্দা হালিম শেখ বলেন, বাজারের সাদা বড়িগুলো বেশিরভাগই ভালো হয় না। বিক্রেতারা কুমড়ার পরিবর্তে পেঁপে আর আটা মিশিয়ে থাকে। এজন্য আমি প্রতিবছর ডাল আর কুমড়া কিনে বাড়িতে বড়ি তৈরি করি। এ বছর আমি কুমড়া কিনেছি পাঁচটা, ৩০০ টাকায় আর কলাইয়ের ডাল কিনেছি ৬০০ টাকার। এতে ৫০০-৫৫০টি কুমড়ো বড়ি পাব। তা দিয়ে যা বড়ি হবে, পুরো শীতকাল খেতে পারব। তাছাড়া আত্মীয়-স্বজনদেরও দিতে হয়। বাড়িতে বানানো বড়ি বাজারের গুলোর চাইতে অধিক স্বাদের।

আমলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম মালিথা জানান, শীতের শুরুতেই এ অঞ্চলের কৃষাণীরা মজাদার কুমড়ো বড়ি তৈরি করেন। যা খেতে খুবই সুসাদু। সেই সঙ্গে অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে বড়ি তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, মাঠে মাঁচা তৈরি করে এবং বাড়ির আঙ্গিনায়, টিনের ঘরের চালে কৃষকরা চালকুমড়ার চাষ করে থাকেন। টিনের চালে উৎপাদিত চালকুমড়া থেকে এসব বড়ি তৈরি করা হয়। সেই সঙ্গে শীতে এ বড়ি তৈরির প্রধান উপকরণ চালকুমড়ার চাহিদা বাড়ে। তাই অনেক কৃষক চালকুমড়াও বাণিজ্যিকভাবে চাষ করেন।