কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করবে সরকার

কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্ল্যান্ট স্থাপন করবে। এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রতি বছর ৩৫ হাজার মেট্রিক টন টাটকা আম ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হবে। রপ্তানি বাড়ানো এবং দেশে নিরাপদ কৃষিপণ্যের যোগান বৃদ্ধির জন্য ‘বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্ল্যান্ট স্থাপন’ নামে একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তাতে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, প্রকল্পটির যৌক্তিকতা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে একটি সভা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিএডিসি সাভারে এবং বিএমডিএ রাজশাহীতে দুটি প্ল্যান্ট স্থাপন করবে। এই প্ল্যান্টগুলোতে আম ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হবে।

এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে মূলত ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও পোকার ডিম মুক্ত করা হবে। প্রতি বছর ১০ হাজার টন আম ও ২৫ হাজার টন সবজি প্রক্রিয়াজাতের সক্ষমতা থাকবে প্ল্যান্ট দুটিতে।

পরিকল্পনা কমিশন তাদের মতামতে বলেছে, বাষ্প তাপ প্ল্যান্টটির প্রধান কাজ হলো কেমিক্যালমুক্ত প্রক্রিয়ায় আম পরিশোধনের মাধ্যমে আমের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধিসহ ত্বকের ফাঙ্গাস দূর করা এবং গ্রেডিং ও সর্টিং করে রপ্তানিযোগ্য আম পৃথক করা।

প্রকল্পটির মেয়াদকাল তিন বছর ধরা হলেও পরিকল্পনা কমিশন অবশ্য এর কার্যক্রম দুই বছরের মধ্যে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দুটি প্ল্যান্ট স্থাপন না করে যেকোন একটি প্রতিষ্ঠানের আওতায় প্ল্যান্ট স্থাপনের সুপারিশও করা হয়েছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায়।

বিএডিসি বলছে, পিইসির সুপারিশ অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠান বাছাই করবে কৃষি মন্ত্রণালয়। তারপর সেটা সংশোধনী আকারে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

বিএডিসির পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘সামান্য কিছু সংশোধনী আনতে হবে। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুতই সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।’

পিইসি সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর ১৪শ মে. টন নিরাপদ আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আম রপ্তানির জন্য কৃষক ও ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তা গ্রুপ গড়ে তোলার কাজ করা হবে।

পরিকল্পনায় বিএডিসি সাভারে তাদের নিজস্ব জমিতে প্ল্যান্ট তৈরির পরিকল্পনার কথা বলেছে। একইসঙ্গে অটো কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইন তৈরির জন্যও একটি মেশিন স্থাপন করবে।

বিএডিসি বলছে, গত আমের মৌসুমে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আমের একটি চাহিদা তৈরি হয়েছে। স্বল্প পরিসরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে আম রপ্তানিও হচ্ছে। তাছাড়া বেশ কিছু প্রজাতির আমে আন্তর্জাতিক চেইন শপ ওয়ালমার্টও আগ্রহ দেখিয়েছে। রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে আম নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে।

তবে ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি মেনে চলতে হয়, যার চর্চা বাংলাদেশে খুব একটা নেই। বাষ্প তাপ প্রয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হলে রপ্তানিকৃত আমের উজ্জ্বলতা বাড়বে এবং ত্বকে দাগ থাকবে না। ফলে বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি গতি পাবে।

রাশিয়া, জাপানসহ বেশ কিছু দেশে কৃষিপণ্য রপ্তানির পূর্বশর্ত হলো সেগুলোতে বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি ব্যবহার করা।

কৃষিবিদরা বলছেন, মুকুল থেকে আম সৃষ্টির সময় ত্বকে বিভিন্ন কীট ডিম পাড়ে। আম পাকলে ডিমগুলো ফুটে আমে পচন ধরায়। ফলে পূর্ণতা লাভের পর আম বেশিদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। নির্দিষ্ট সময়ে আম সংগ্রহ করে বাষ্প তাপ প্ল্যান্টের মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট করা হলে ডিমগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এতে করে আমের দ্রুত পচন রোধ সম্ভব হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে গত মৌসুমে ১৭শ মে. টন আম রপ্তানি হয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় আম ও সবজি রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি করতে চায়। এর জন্য যত ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করার উদ্যোগ নিচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলারের তাজা শাকসবজি রপ্তানি হয়েছে।

প্রকল্প পরিকল্পনায় শুধু রপ্তানির কথা বলা হলেও পরিকল্পনা কমিশন বলছে, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ইত্যাদি মূলত বেসরকারি খাতের কার্যক্রম। এসব অবকাঠামোর জন্য বেসরকারি খাতের সক্ষমতা থাকায় এক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের যৌক্তিকতা তুলে ধরা প্রয়োজন। এছাড়া রপ্তানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে বিপণনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকা আবশ্যক।