মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়

মুক্ত জলাশয় আর ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে চাষের মাছে দেশে রুপালি বিপস্নব ঘটেছে। জাতিসংঘের দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যায়াকালচারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয় আর প্রথম চীন। ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে দেড় যুগ ধরেই বাংলাদেশ মাছ চাষে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে। ২০০৬ সালেও বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠেছিল। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ের পর বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য আহরণ বাড়ছে বলে জানানো হয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের।

বাংলাদেশের মৎস্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত মাছের জাত এবং তা দ্রম্নত সম্প্রসারণের ফলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে বলে মনে করছেন মৎস্য গবেষকরা। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, গাজীপুর, বগুড়া ও কুমিলস্না জেলায় পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঘেরে মাছ চাষে রীতিমতো বিপস্নব ঘটে গেছে। গত তিন দশকে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২৫ গুণ। অন্যদিকে, মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১০ গুণ। মাছ রপ্তানিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ বিষয়ে সাফল্য এসেছে ব্যাপক। দেশে মোট কৃষিজ আয়ের শতকরা ২৪ ভাগের বেশি অবদান মৎস্য খাতে। মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এতে করে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন চীনকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে পৌঁছাবে যাবে বাংলাদেশ।

বিবিএসের সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী দেশে বছরে গড়ে ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চাষ করা মাছের পরিমাণই প্রায় ২০ লাখ টন। ইলিশের উৎপাদন প্রায় চার লাখ টন। সরকার মাছ রপ্তানি করে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আয় করছে। চিংড়ি এখন দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি পণ্য। দেশে প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ মৎস্য সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে বেকার তরুণ মাছ চাষে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট মৎস্য গবেষক ড. এম এ ওয়াহাব বলেন, আশির দশকে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত জাতের পাঙাশ, রুই, কাতল, তেলাপিয়া চাষ তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। চাহিদার সঙ্গে পালস্না দিয়ে উন্নত জাতের কই, শিং, মাগুর, শোল মাছের চাষ ব্যাপক হারে বেড়েছে। বর্তমানে পুঁটি, সরপুঁটি, বাইন, টাকি, পাবদা, ফলি, মলা, গোলসা, টেংরা, ভেদা, বোয়াল, কালো বাউশ মাছের চাহিদা দেশে-বিদেশে বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিদিন একজন মানুষের প্রায় ৬২ গ্রাম আমিষের প্রয়োজন। আর এই আমিষের প্রধান চাহিদার উৎস হচ্ছে মাছ। বাজারে দুই অঙ্কের নোটেই মিলছে মাছ। দাম সাধারণের নাগালে থাকায় দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে শতভাগ।

সরষে ইলিশ, ইলিশ পাতুড়ি, ইলিশ ভাজা হরেক পদের রান্না, হরেক রকম স্বাদ। বাঙালির বর্ষবরণ ইলিশ ছাড়া হয় না। ওপার বাংলায় জামাইষষ্ঠীতে ইলিশ লাগবেই। গত অর্থবছরে ইলিশ মাছের উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হিসাবে যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, যে হারে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে তাতে আগামী কয়েক বছরে উৎপাদন আরও বাড়বে। বিশ্বের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন দেশ হবে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে বাংলাদেশ হবে শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। নানামুখী উদ্যোগে আবারও নদীতে ফিরতে শুরু করেছে ইলিশের ঝাঁক। এক দশকে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে যে উদ্যোগটি সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে তা হলো অভয়াশ্রম গড়ে তোলা। এ পর্যন্ত ইলিশের ছয়টি এলাকাকে অভয়াশ্রম।