ভাসানচরে মুক্ত জীবনে রোহিঙ্গারাঃ চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক চলাফেরার স্বাধীনতা ও সুযোগ-সুবিধায় স্বাচ্ছন্দ্য

 

স্বপ্নেও ভাবিনি এমন বাড়ি পাব। কক্সবাজারের ক্যাম্পের সঙ্গে এর কোনো তুলনা হবে না। ক্যাম্পে ছিল পলিথিনের ঘর, এখানে কংক্রিটের বাড়ি। এত সুবিধা পৃথিবীতে আমাদের জন্য আর কোথাও নেই। এমন বাসায় আমরা আগেও থাকতে পারিনি। ভবিষ্যতেও পারব কিনা জানি না। এসব বক্তব্য কক্সবাজার ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া মোহাম্মদ মাহমুদ উল্লাহর। আগের দিন নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরিত হওয়া ১৬৪২ রোহিঙ্গার একজন তিনি। মাহমুদ উল্লাহর মতো চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক দেখা গেল রোহিঙ্গাদের চোখে-মুখে। চলাফেরার স্বাধীনতা ও সুযোগ-সুবিধায় স্বস্তি ফুটে উঠেছে প্রায় সব রোহিঙ্গার মাঝে। গতকাল সকালেই দেখা গেল ক্লাস্টার ভবনের সামনে দোকানে রোহিঙ্গাদের জটলা। কেউ জিনিসপত্রের দাম জিজ্ঞাসা করছে। কেউ নিজেদের মধ্যেই আলোচনায় ব্যস্ত। শিশুরা দলবেঁধে খেলায় মেতেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার পৌঁছাতেই ব্যস্ত হয়ে গেলেন মহিলা। পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার বুঝে নিলেন ঘরে বসেই। ভাসানচরের ৬ ও ৭ নম্বর ক্লাস্টার ঘুরে কথা হয় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে। তাদের প্রত্যেককে শুক্রবার ছয়টি জাহাজে করে চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয় নোয়াখালীর ভাসানচরে। থাকার পরিবেশ ও নতুন ঘর পেয়ে ভাসানচরে নতুন জীবন শুরু করে মিয়ানমারে অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া এসব রোহিঙ্গা।

কক্সবাজারের বালুখালী ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে আসা মোহাম্মদ আলী উল্লাহ বলেন, অনেক ধরনের ভয় দেখানো হয়েছিল। বলা হচ্ছিল, পানি উঠবে। ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। কুমিরে খাবে। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম কিছুই না। পানি ওঠার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আলী উল্লাহ জানান, কক্সবাজারের ক্যাম্পের রাস্তায় যাওয়া যেত না। রাত ১০টায় যখন তখন ধরে নিয়ে যেত। টাকা-পয়সা কেড়ে নিত। কিন্তু এখানে নিরাপত্তার কোনো সংকট নেই। সারা রাত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক পাহারায় আছে। চলাচলেও কোনো বাধা দিচ্ছে না।

আবদুস শুকুর বলেন, এখানে এসে ভুল ভেঙেছে। আগে বেড়ার বাইরে যাওয়ার কথা ভাবাও যেত না। কিন্তু এখানে নেই বিধিনিষেধ। মুক্ত জীবনের যে মজা তা এখানে পাচ্ছি। এখন কাজ করতে চাই। এখানে অনেক জায়গাজমি আছে। সেখানে চাষাবাদের সুযোগ পেলে ভালো হয়। মোহাম্মদ হোসেন জানান, মিয়ানমার থেকে বাবা-মাসহ চার ভাই প্রত্যেকের পরিবার নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। প্রত্যেকেই আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারের ক্যাম্পে। তার মধ্যে আমি এখানে এসেছি পরিবার নিয়ে, বাকিরা আছে কক্সবাজারে। এখানে দেখতে চাই, যা বলা হচ্ছে সব হবে কি না। মাসখানেক সময় নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে কথা বলল। তখন তারা আসতে চাইলে আসবে। যোবায়ের হোসেন বলেন, আত্মীয়স্বজন যারা ক্যাম্পে আছে তাদেরও এখানে আসতে বলব। তারা যদি এখানে আসতে না চায় তাহলে আমরা বেড়াতে যাব। কিন্তু আমরা এ দ্বীপ ছেড়ে যাব না। চাকরি পেলে চাকরি করব। না হলে যে কোনো কাজ করে জীবিকানির্বাহ করব। মোছাম্মত ফাতেমা বলেন, ২০১২ সালে মিয়ানমার থেকে আসার পর এত শান্তিতে আর কোনো রাত কাটাইনি। আমি খুবই খুশি। সরকারকে ধন্যবাদ আমাদের জন্য এত সুন্দর বাড়ি ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ায়। আবদুর রহমান বলেন, বালুখালী ক্যাম্পে চলাচল করতে গিয়ে অনেক সময় গায়ে হাত দিত। ক্যাম্পের বাইরে গেলে চোর বলত। আবার বেড়ার ঘরে চোর ঢুকত। কিন্তু এখানে পাকা ঘর। কেউ চাইলেও আমার ঘরে ঢুকতে পারবে না। তালা দেওয়া থাকলে পুরোপুরিই নিরাপদ। সামাদ বলেন, এখানে মাদরাসা আছে, স্কুল আছে। খেলার মাঠ আছে। অনেক খোলামেলা। আগের চিপা পরিবেশে আর থাকতে হচ্ছে না। তাই আমরা খুবই খুশি।

বালুখালী ক্যাম্প থেকে আসা মাজেদা বলেন, সরকার যেভাবে খুশিতে রাখছে, আমরা চাই সরকার সেভাবেই আমাদেরকে খুশিতে রাখুক। একটা কথা আছে যে, ছেলেমেয়েরা সরকারের কথা মানবে, তারা কখনই কষ্ট পাবে না। আমরা সরকারের কথা মানছি, আমরাও কষ্ট পেতে চাই না। অতিরিক্ত শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ শামছুদ্দৌহা বলেন, ভাসানচরে আসা প্রত্যেককে আমরা নিয়মিত মানবিক সহায়তা করে যাব। ইতিমধ্যে তাদের নিজেদের যেসব মালামাল কক্সবাজার থেকে নিয়ে এসেছে সেগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেককে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। তবে আমরা দ্রুত সবাইকে সেটেল্ড ডাউন করার চেষ্টা করছি। দু-এক দিনের মধ্যে সবার জন্য চুলার ব্যবস্থা করা হবে। সেখানেই তারা রান্না করে খেতে পারবে। পাশাপাশি অন্য সব মানবিক সহায়তা আমরা করে যাব। ভাসানচরে আসা ২২টি বেসরকারি সংস্থার জোট এনজিও অ্যালায়েন্স অব ভাসানচরের সমন্বয়ক ও পালস বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী কলিম জানান, প্রত্যেকের জন্য খাবার সরবরাহের পাশাপাশি কম্বল, শীতের কাপড়, শুকনো খাবার সরবরাহ করা হবে। পরবর্তীতে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সবজি, চাল, ডাল ইত্যাদি সরবরাহ করা হবে। পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে চাষাবাদের পাশাপাশি নারীদের জন্য সেলাই মেশিন ও অন্যান্য জীবিকার চাহিদা মেটানোর। ভাসানচরে থাকা নোয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সমন্বয়ক ডা. মাহতাব উদ্দিন বলেন, ভাসানচরে আসা প্রত্যেক রোহিঙ্গার করোনাভাইরাস সংক্রান্ত স্ক্রিনিং করা হয়েছে। এর বাইরে কারও জ¦র সর্দি বা আনুষঙ্গিক উপসর্গ আছে কিনা সে খবর রাখা হচ্ছে। ভাসানচরের প্রকল্প পরিচালক কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভাসানচরে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য চিকিৎসার সব সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ২০ শয্যার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি তিনজন ডাক্তার ও ছয়জন প্যারামেডিক কাজ করছেন। পাশাপাশি নৌ বাহিনীর মেডিকেল কোরের দল আছে সহায়তার জন্য। স্থানান্তরের জন্য স্পিডবোট রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি যে কোনো পরিস্থিতিতে যোগাযোগের সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিমান বাহিনী। সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, মূলত ক্লাস্টার হাউস, শেল্টার স্টেশন বা গুচ্ছগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প। আপাতত চারটি ক্লাস্টার হাউস ব্যবহার হলেও প্রকল্পে রয়েছে মোট ১২০টি ক্লাস্টার হাউস। পরিকল্পিত নকশায় ভূমি থেকে প্রতিটি ক্লাস্টার হাউস চার ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি হাউসে ১২টি বাড়ি এবং প্রতিটি গৃহে ১৬টি রুম। প্রতিটি রুমে পরিবারের চারজন করে থাকতে পারবে। নারী-পুরুষের জন্য রয়েছে আলাদা টয়লেট ও গোসলখানা। খাদ্য মজুদের জন্য এখানে সুবিশাল গোডাউন নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে চারটি সুরক্ষিত ওয়্যার হাউস (খাদ্যগুদাম)। এসব গুদামে তিন মাসের খাবার মজুদ রাখা যাবে। নামাজ আদায়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে তিনটি মসজিদ। পরিকল্পনা রয়েছে মোট ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থান দেওয়ার।