বাংলাদেশকে যেভাবে সমৃদ্ধ করছেন তিনি

পাকিস্তানি দুঃশাসনের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর মাত্র কয়েক কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল যে ছোট্ট দেশটি, সেই দেশের বাজেট আজ ৫ লক্ষ কোটিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ছোট্ট অর্থনীতির দেশটা আজ পরিচিতি পেয়েছে এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমি’ হিসেবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের যে কোনো সূচকের বিচারে গত দুই দশকের বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে অভূতপূর্ব। ১৯৯০-এর পর সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। দারিদ্র্যের হার কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। মেয়েদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের হার দ্রুত বেড়েছে। জনসংখ্যা, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকে পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। যে পাকিস্তানের থেকে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ, সেই পাকিস্তানিরা আজ বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে দেখে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রার পেছনে সুদক্ষ কারিগরের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন এদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার শেষ ভরসাস্থল, জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

যে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন, যে অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছিলেন মানুষের, যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন সবার জন্য, তারই সুযোগ্য কন্যা সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে সে পথেই তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন—এইচএসবিসির সর্বশেষ গ্লোবাল রিসার্চে বলা হয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) নিরিখে বিশ্বের ২৬তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে ৪২তম। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ২০৩০ :আওয়ার লং-টার্ম প্রজেকশনস ফর ৭৫ কান্ট্রিজ’ শিরোনামের এই রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১৬ ধাপে উন্নীত হবে, যা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ তালিকায় বাংলাদেশের পরেই ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার নাম এসেছে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে উন্নত দেশ নরওয়ের চেয়েও বাংলাদেশের বেশি সম্ভাবনা রয়েছে বলে এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সবই সম্ভব হয়েছে এদেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ফলে।

শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে বৈদেশিক পণ্য রপ্তানি আয়ে অর্জিত হয়েছে নতুন মাইলফলক। এ সরকারের আমলে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এইচএসবিসির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন মডেলে দেখানো হয়েছে, ২০৩০ পর্যন্ত প্রতি বছর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গড়ে ৭.১ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে, যা রিপোর্টে উল্লিখিত ৭৫টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। জিডিপির হিসেবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪৪তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় ৩৩তম| আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় অবস্থানে|

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। শুধু যে মানুষের আয় বেড়েছে তা নয়, বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে বাজেটের আকার। বাজেট বাস্তবায়নে পরনির্ভরতাও কমছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে দৃশ্যমান। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সক্ষমতাও বাড়ছে। পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট নিজেদের টাকায় করার মতো দুঃসাহস এখন বাংলাদেশ দেখাতে পারে। আকাশে উড়িয়েছে নিজস্ব স্যাটেলাইট। নিজস্ব স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি দিয়েই চলছে দেশের সম্প্রচার কার্যক্রম। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। গত এক দশকে কেবল তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষের। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আরো ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান এ খাতে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসছে দারিদ্র্য।

শেখ হাসিনা সরকারের যুগোপযোগী উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধারাবাহিকতা অর্জন এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। মূলত বিপুল পরিমাণ প্রবাসীর পাঠানো আয়, তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এবং কৃষির সবুজ বিপ্লব দারিদ্র্য কমিয়ে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। শেখ হাসিনা সরকার পিছিয়ে পড়া ও অতিদরিদ্রদের জন্য সামাজিক কর্মসূচি খাতে অব্যাহতভাবে বাজেট বাড়িয়েছে। দেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি অতিদরিদ্র মানুষ এখন এই কর্মসূচির আওতায়।

গত এক দশকে বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে ৬ শতাংশ থেকে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে কমেছে মজুরি ব্যবধানও। রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশের কারণে অধিক হারে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন বিদেশিরা। বিগত বছরে দেশে ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় শক্তিধর দেশগুলো যখন নাকানিচুবানি খাচ্ছে, তখন শক্ত হাতে শেখ হাসিনা এই অদৃশ্য ভাইরাস সামাল দিচ্ছেন। অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এখনো আক্রান্ত ও মৃতের হার কম। বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালীন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ জাতিসংঘ (UN), বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফোর্বসসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা থেকে শুরু করে চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে তিনি নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং করোনা মহামারির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র মানুষকে ত্রাণ সহযোগিতার পাশাপাশি জীবিকা ও অর্থনীতি বাঁচাতে নিয়েছেন কার্যকরী পদক্ষেপ। দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখতে কৃষি ও শিল্পসহ অর্থনৈতিক খাতগুলোতে সময়োপযোগী প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি রোল মডেল হিসেবে পরিগণিত হয়। শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বের জন্যই করোনাকালে দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮.২ ধরে সংসদে চলতি অর্থবছরের বাজেট পাশ করা হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে নিজ দেশের মর্যাদা সমুন্নত রেখে কি প্রতিবেশী কি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখেই বাংলাদেশ উন্নয়নে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নেতৃত্বে এখন শেখ হাসিনার অবস্থান সবার শীর্ষে। দক্ষিণ এশিয়া তথা সার্কভুক্ত আট দেশের মধ্যে বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত যা পারেনি; বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকদের জন্য শেখ হাসিনা হয়ে গেছেন একজন অনুকরণীয় নেতৃত্ব। তিনি দেশ-বিদেশের নেতাদের কাছে আস্থা ও ভরসাস্থল।

ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে মনোযোগী হয়েছেন। গভীর সমুদ্রের তলদেশে অপটিক্যাল ফাইবার, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মোবাইল ব্যাংকিং, উপজেলা শহরে ব্যাংকের এটিএম বুথ, সহজলভ্য ইন্টারনেট-সেবা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তার ‘ঘরে ফেরা’ কর্মসূচি ও নাগরিকদের ‘আইডি কার্ড’ দেওয়ার কর্মসূচি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। করোনার এই দুঃসময়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা যেন বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইন ক্লাস চালু হয়েছে শেখ হাসিনার নির্দেশে। বর্তমানে দেশের সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস চালু হয়েছে। অনলাইনে চলছে ব্যবসায়-বাণিজ্য। এর সবই শেখ হাসিনা সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ফল।

করোনাকালে ৭ কোটি মানুষকে খাদ্যসহায়তা দিয়েছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সরকার। ২ কোটি পরিবারকে অর্থসহায়তা দিয়েছেন ডিজিটাল ব্যাংকিং চ্যানেলে। করোনা দুর্যোগে সবকিছু বন্ধের মধ্যেই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। গত জুন মাসে ১৮৩ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কারণ শেখ হাসিনা রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দিয়েছেন। সময়োপযোগী বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে তার জুড়ি মেলা ভার।

একসময় কেবলই স্বপ্ন মনে করা হতো যে মেট্রোরেলকে শেখ হাসিনা সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে স্বপ্নের মেট্রোরেল। জলবায়ু পরিবর্তনের ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা নামে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে শেখ হাসিনার সরকার। সমগ্র বাংলাদেশ এই মহাপরিকল্পনার আওতাভুক্ত। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ‘ডেল্টা প্ল্যান’ নামে পরিচিত শত বছরের এ মহাপরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ২১০০ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নকাজ চলবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এভাবে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অচিরেই সুখী-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় হবে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

ড. এ কে আব্দুল মোমেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার