জিডিপিতে নারীর অংশ ২০ শতাংশ

নারীরা সংসারের বিপুল ঝক্কি সামলান বিনামূল্যে। এর বাইরে অর্থের বিনিময়ে বাজারজাতযোগ্য উৎপাদন ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা। এতে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তাদের অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। এর সঙ্গে সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরলে তাদের অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী-পুরুষের অবদান সমান সমান।

জিডিপিতে নারী-পুরুষের অবদান আলাদাভাবে দেখানো হয় না সরকারি কোনো তথ্যে। তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে নারী-পুরুষের অবদান পৃথকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তাদের করা গবেষণা ‘রিয়ালাইজিং দ্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট ইন বাংলাদেশ প্রমোটিং ফিমেইল লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন’-এ বের করেছে, জিডিপিতে নারীর ভূমিকা ২০ শতাংশ। এটি একজন নারী বছরে যত কাজ করেন, তার মাত্র ১৩ থেকে ২২ শতাংশের হিসাব। বাকি ৭৮ থেকে ৮৭ শতাংশ কাজের বিনিময়ে কোনো মূল্য পান না তারা। তাই ওই কাজের হিসাব জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। এটি যুক্ত হলে জিডিপিতে নারীর অবদান হতো পুরুষের সমান। তবে নারীর ওপর চলা সহিংসতায় যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তার পরিমাণ জিডিপির ২ শতাংশের সমান। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির আকার প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। এর ২০ শতাংশ হিসাব করলে বছরে নারীর আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক খাতে অর্থের বিনিময়ে করা কাজের মূল্য দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, নারীর কাজের অর্থনৈতিক অবদান তিন ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো মজুরির বিনিময় ও টাকার বিনিময়ে স্বনিয়োজিত কাজ, যা জিডিপির হিসাবে যুক্ত হয়। দ্বিতীয়ত, নারীর মজুরিবিহীন কিছু পারিবারিক কাজও জাতীয় হিসাবে যুক্ত হয়। তৃতীয়ত, নারীর গৃহস্থালি কাজ, যা বাজারজাত করা যায় না, তা জিডিপিতে যুক্ত হয় না, শ্রম শক্তির হিসাবেও গণ্য হয় না। অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের মূল্যের ‘ছায়া হিসাব’ করে বেসরকারি সংস্থা সানেম। তাদের তথ্য অনুযায়ী, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের মূল্য হিসাব করে তারা পেয়েছে, এমন কাজে পুরুষের ভাগ জিডিপির ৯ শতাংশ ও নারীর ৩৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটা গবেষণা করে দেখেছি, নারীর কাজের ৭৮-৮৭ শতাংশই হিসাবে আসে না। এই অংশটা ছেড়ে দিয়েই জিডিপি হিসাব করা হচ্ছে।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন নারী বাসায় যে কাজ করছে, যেমন কাপড় ধোয়া, সেটা হিসাবে আসছে না। যদি লন্ড্রির দোকানে ধোয়া হতো, তাহলে তার জন্য দোকানদারকে টাকা দিতে হতো। এখন গৃহস্থালি বা গৃহস্থালির বাইরেও নারী অনেক কাজ করছে, যেটা হিসাবে আসছে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অন্য একটি গবেষণায় দেখেছি, নারীরা পারিবারিকভাবে যে সহিংসতার শিকার হয়, তাতে তারা অনেক কাজ করতে পারে না। ফলে মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা কমাতে পারলে এই ক্ষতিটা হতো না।’ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঘরে-বাইরে নারী যে কাজ করে, তার পুরোটা আর্থিকভাবে হিসাব করলে জিডিপিতে নারী-পুরুষের অবদান প্রায় সমান হবে।’ তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নারীকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও কাজের আরও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়বে, উন্নয়নের গতিও তত বাড়বে। কারণ জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৩৩.৫ শতাংশ। গত বছর সেটি বেড়ে ৩৬.৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিবিএসের বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। এর মধ্যে মাত্র ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে কাজ করছে। তাদের মাসিক আয় গড়ে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে, বেতন ও মজুরি বাবদ তারা বছরে আয় করেন ৮৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। অর্থনীতিতে নারীর আরেকটি বড় সাফল্য হলো, দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে।

বিবিএসের তথ্য মতে, দেশের কৃষি খাতে নিয়োজিত আছে ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী। এ ছাড়া শিল্প খাতে ৪০ লাখ ৯০ হাজার ও সেবা খাতে ৩৭ লাখ নারী কর্মরত। দেশের কলকারখানায় পুরুষের চেয়ে এক লাখ বেশি নারী শ্রমিক কাজ করেন। চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, কারখানায় ২১ লাখ ১ হাজার ৮৩০ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন আর পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫৭ জন। গত এক যুগে বাংলাদেশে কৃষির নারীকরণ হয়েছে। বিবিএসের তথ্য হলো, গত ১০ বছরে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। আর পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে দুই শতাংশ। খাদ্যনীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০১৫ সালের একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৯০ শতাংশ বাড়িতে মুরগি পালন নিয়ন্ত্রণ করেন নারী। ছাগল ও গরু পালনে নারীদের নিয়ন্ত্রণ ৫৫ শতাংশ।

মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৯৯৫-৯৬ সালে ১৫.৮ শতাংশ, ২০০২-০৩ সালে ২৬.১ শতাংশ, ২০০৫-০৬ সালে ২৯.২ শতাংশ এবং ২০১১-১২ সালে ৩৯.১ শতাংশ।

সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, গৃহস্থালিতে নারীর যে কাজ জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না, সেই শ্রমের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য (২০১৩-১৪ অর্থবছর) জিডিপির ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। গৃহস্থালি কাজে দেশের নারীর বছরে ব্যয় ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা, যার আর্থিক মূল্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জিডিপিতে এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে নারীর হিস্যা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই দেশের নারীরা। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (এমআরআই) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালের জুনে দেশে ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার। এর ৯০ শতাংশই নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশের মোট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ৩৫ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে কাজে কোনো অর্থ দেওয়া হয় না, সেটা জিডিপিতে যুক্ত হবে না। এটাই নিয়ম। এখন নারীর মজুরিবিহীন কাজের (আনপেইড) মূল্য হিসাব করা কঠিন। তিনি বলেন, ‘নারী বাসায় রান্না করে, এই কাজ বুয়াকে দিয়ে করালে মূল্য এক রকম, শেফ টমি মিয়াকে দিয়ে করালে আরেক রকম মূল্য। এর কোনটা স্ট্যান্ডার্ড ধরা হবে? এ জন্যই মূল্যায়ন করা যাচ্ছে না।’ নাজনীন বলেন, সরকারি তথ্য অনুসারে গৃহস্থালির কাজে একজন পুরুষ যেখানে দেড় ঘণ্টা সময় ব্যয় করে, সেখানে একজন নারী ব্যয় করে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। তিনি বলেন, দেশের কৃষি খাতের ৫০ শতাংশের বেশি শ্রমিক নারী। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় করা তৈরি পোশাকশিল্পে, নারী শ্রমিকের হার ৬০ ভাগ। সেবা খাতেও তারা এগিয়ে। কিন্তু সব মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে নারী রয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশ ৮০ শতাংশ।