খেলাধুলায় অদম্য বাংলার মেয়েরা

সুযোগ-সুবিধার অভাবতো রয়েছেই। সেই সঙ্গে আছে বৈষম্য। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই যেন দমিয়ে রাখতে পারেনি দেশের নারী খেলোয়াড়দের। একের পর এক সাফল্য তাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।

সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৮-তে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। ফুটবলের সেই আসরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। ২০১৮ সালেই মালয়েশিয়ায় ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। যা এখন পর্যন্ত নারী ক্রিকেটে সবচেয়ে বড়ো অর্জন। মাশরাফি-সাকিবদের ঝুলিতেও উঠেনি এই সাফল্য। এছাড়া টানা দুইবার (২০১৮, ২০১৯) আইসিসি নারী টি-২০ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সালমা বাহিনী। দক্ষিণ এশিয়ার অলিম্পিকখ্যাত এসএ গেমসে গতবারই প্রথম নারী ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হয়। ঐ আসরেই বাংলাদেশের নাম প্রথম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে জায়গা করে নেয় ইতিহাসে। এই আসরেই বাংলাদেশের নারী তীরন্দাজরা সোনা জিতে পুরুষের সঙ্গে রেকর্ড করে। এর আগে এই বিষয়ে আমাদের সোনা অর্জন ছিল না।

যত আন্তর্জাতিক গেমস-এ মেয়েরা অংশ নেয়, সেখানে পুরুষের সমানই তারা পদক জয়ের নজির রাখছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞজনেরা। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি পুরুষ ফুটবল দলের নারী কোচ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ২৬ বছর বয়সি বাগেরহাটের মেয়ে মিরোনা। অ্যাভারেস্ট জয়ের মতো দুর্গম খেলায় মেয়েরা রেখেছে সমান অংশিদারিত্ব। এমন অনেক সাফল্য নিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে নারীরা। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে রয়েছে অনেক না পাওয়ার গল্প। এমন বাস্তবতার মধ্যে ‘প্রজন্ম হোক সমতার:সকল নারীর অধিকার’ প্রতিপাদ্য করে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

আরো কিছু অর্জন

গত বছর এসএ গেমসে দলগত ইভেন্টে সোনা জয়ের ক্ষেত্রে নারীর সমান থাকলেও ব্যক্তিগত ইভেন্টে পিছিয়ে ছিল পুরুষরা। ব্যক্তিগত ইভেন্ট থেকে নারী ক্রীড়াবিদরা জয় করে ছয়টি স্বর্ণপদক, সেখানে পুরুষরা জিতেছে পাঁচটি সোনা। একদিনে কোনো আন্তর্জাতিক গেমসে বাংলাদেশের সাত স্বর্ণজয়ের রেকর্ড, তাতেও মেয়েরা ভাগিদার। মাবিয়া আক্তার সীমান্ত টানা দুই বার সোনা আনেন দেশের জন্য। এমন ঘটনা এর আগে বাংলাদেশের কোন ক্রীড়াবিদের ভাগ্যে ঘটেনি। এই আসরে ১৯ সোনা জয়ের ১১টি এসেছে নারীর হাত ধরে।

এসএ গেমসের আগের আসর ২০১৬ সালে বাংলাদেশ যে চারটি স্বর্ণপদক জয় করেছিল তার তিনটিই জয় করে মেয়েরা। তখন সাঁতার থেকে দেশকে জোড়া সোনা উপহার দিয়েছিলেন মাহফুজা খাতুন শিলা এবং ভারোত্তোলন থেকে স্বর্ণ জিতেছিলেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। ২০১০ এ ঢাকা এসএ গেমসে ১৮টি সোনার মধ্যে আটটি পায় নারীরা।

ফুটবলেও ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে মেয়েরা। কলসিন্দুর স্কুলের মেয়েদের বড়ো সাফল্য সবার জানা। ২০১৬ এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এএফসি অনূর্ধ্ব ১৬ চ্যাম্পিয়ন, ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব ১৫, ২০১৮ সালের জকি কাপ, ২০১৯ সালের বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক ফুটবলে অনূর্ধ্ব ১৯ যুগ্মভাবে জয় করে আমাদের মেয়েরা।

যেভাবে চলছে মহিলা ক্রীড়া সংস্থা

খেলাধুলায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ১৯৭২ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যান মাহবুব আরা বেগম গিনি এমপি ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সময় অনেক ইভেন্ট ছিল না। আবার খেলাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগও ছিল না। এখন এই দ্বারগুলো খুলে যাচ্ছে। সংস্থাকে ১৬ লাখ টাকা ফান্ড দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে অনেক খেলা আয়োজন হয়তো সম্ভব নয়। তারপরেও শহর থেকে শুরু করে গ্রামের মেয়েরা খেলা শিখতে আসছে, এটা বড়ো কথা। আন্তঃস্কুল, কলেজ প্রতিযোগিতাগুলো প্রায় হচ্ছেই না। আগে বিমান, বিজেএমইএ, বিকেএমইএ-এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্লাব ছিল। এখন তারা হাত গুটিয়ে নিয়েছে। জানা যায়, সংস্থায় এপ্রিল থেকে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ শুরু হবে। আর ফুটবল কবে শুরু হবে তা বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে জুুুডো, সাঁতার, শরীরচর্চা, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন, স্কুটি ও বাস্কেটবল বিষয়ে প্রশিক্ষণ চলছে। তবে বাজেট বড়ো সমস্যা বলে জানান চেয়ারম্যান। সংস্থার নিজস্ব কোনো ওয়েবসাইটও নেই বলে জানা গেছে।

সাবেক নারী ক্রীড়াবিদরা যা বলেন

সাবেক ক্রীড়াবিদ কামরুন্নাহার ডানা বলেন, ফেডারেশনগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ কম। শুধু অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনে পাঁচ জন নারী সদস্য আছেন। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) বলছে ফেডারেশনের কমিটিতে নারী প্রতিনিধি রাখতে হবে। যৌন হয়রানির মতো ঘটনা ক্রীড়াজগতে ঘটছে। পাইপলাইনে ভালো প্লেয়ার নেই। তৈরির ব্যবস্থাও বলতে গেলে নেই। নিয়মিত লীগ হয় না, আমাদের সময় ক্লাবে খেলে (আমি বিমানে খেলেছি) মেয়েরা আয় করতে পারত। সেই সুযোগও কম। ফেডারেশনগুলো নিয়মিত জাতীয় টুর্নামেন্ট করে না। ফলে এসএ গেমসে সোনাগুলো ইন্ডিয়া ও শ্রীলঙ্কা পায়, আমাদের ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। মৌলবাদ নারীর খেলার ক্ষেত্রে বড়ো অন্তরায় উল্লেখ করে সম্মিলিতভাবে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করার আহবান জানান তিনি।

গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে জবেদা আক্তার লিনুর স্থান করে নেওয়া প্রমাণ করে টেনিসে ভালো প্লেয়ার আসার গতি কেমন। ২৫ বছরে দাবাতে এক রানী হামিদই উদাহরণ, আর কোনো নারী আন্তর্জাতিক মাস্টার নেই কেন? এ বিষয়ে রানী হামিদ জানান, নারী সংগঠকদের দুর্বলতা বড়ো কারণ। আমরা ভারতের সমানে সমান হয়ে খেলতাম। এখন পার্থক্য আকাশপাতাল। তবে এখন নতুনরা ভালো করছে, আগামী পাঁচ বছরে নতুনদের সাফল্যের আশাবাদ ব্যক্ত করেন দেশের দাবার এই রানী।

মেয়েরা যা পাচ্ছে

১৯৮৬ সালে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপি। শুরুতে কোনো নারী শিক্ষার্থী ছিল না। ২০০০ সালে ১০টি বিষয় মেয়েদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। বর্তমানে ২৫টি বিষয়ে ১৫০ জনের মতো নারী শিক্ষার্থী আছে বলে জানা গেছে। ২০০৪-এ এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে প্রথম অভিযানে পুরুষের সঙ্গে বাংলাদেশের নারীও ছিল। পরে বাংলাদেশের নারীর হাত দিয়ে পৃথিবীর চূড়ায় ওঠে বাংলাদেশের পতাকা। এ বিষয় সংগঠক ইনাম আল হক বলেন, পরিবারগুলোই মেয়েদের অভিযানে সহযোগিতা করেছে। সঙ্গে ছিল তাদের উত্সাহ।

২০০০ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট চলাকালীন প্রথমবার বড়ো মঞ্চে আত্মপ্রকাশ ঘটে নারী ক্রিকেটারদের। ২০০৬ সালে ক্যাম্পের মাধ্যমে গঠন হয় প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দল। জানা যায়, বিসিবির ১৭ জন নারী ক্রিকেটার বেতনভুক্ত, বেতন সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। আর ছেলেদের ক্রিকেটে সর্বনিম্ন বেতন লাখ টাকা? এখানেই শেষ নয় লীগের আয়েও একই বৈষম্য। নারীদের জন্য আলাদা কোনো একাডেমি নেই বলে আক্ষেপ করেন নারী ক্রীড়াবিদরা।

বিসিবির পরিচালক ও উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল জানান, বিকেএসপি থাকলেও আনুপাতিকহারে জেলা থেকেই মেয়েরা বেশি ক্রিকেটে আগ্রহী হচ্ছে। প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক কামরুজ্জামান মনে করেন, প্রান্তিক পর্যায় থেকে মেয়েরা এগিয়ে আসছে। এখন সরকার ও ব্যক্তি মালিকাধীন প্রতিষ্ঠানকে নারী ক্রীড়ায় পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।