বাংলাদেশ ও বহুমাত্রিক উন্নয়ন

উন্নয়ন

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জিডিপি বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে। সৌজন্য

এদেশের মানুষ মেধার দিক থেকে বিশ্ব যে কোনো দেশের তুলনায় পিছিয়ে নেই। যে যার অবস্থান থেকে নির্ধারিত দায়িত্বটুকু পালন করলে ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশের যে স্বপ্ন সেটা আর অলীক মনে হবে না

উন্নয়ন কিংবা অর্থনীতির ছাত্রদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা মিরাকল।  নিক্সনের বটমলেস বাস্কেট থেকে এশিয়ান টাইগার পর্যন্ত যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিলো না। গত বেশকিছু বছর ধরেই বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ৬% এর উপরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।

আজ থেকে ১৪ বছর আগে, ২০০৬ সালে যখন আমাদের জিডিপি পাকিস্তানকে প্রথমবারের মতো টপকে যায় তখনো এটাকে হাল্কাভাবে দেখা হয়েছিলো। ধারণা করেছিলো– এটা একটা অঘটন।

তারপর সময় যতো গড়িয়েছে ততোই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। বুঝেছে এটা মোটেও অঘটন নয়।

মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এমজিডি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বেশ ভালো করে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির সে সময়ে প্রকাশিত মূল্যায়নে বলা হয় “সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ বেশ সফল। আটটি লক্ষ্যের সব কটিতেই ভালো করেছে বাংলাদেশ। এসব লক্ষ্য অর্জনে ৩৩টি উপসূচকের মধ্যে ১৩টি পুরোপুরি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এমডিজির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যটি অর্জিত হয়েছে। ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল, বাংলাদেশ এ সময়ে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এ ছাড়া শিক্ষা, লিঙ্গবৈষম্য, শিশুমৃত্যু, মাতৃস্বাস্থ্য, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখা, টেকসই পরিবেশ— এসব মূল লক্ষ্যের বেশির ভাগ উপসূচকই লক্ষ্য অর্জন করেছে।”

গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ঊর্ধ্বমুখী। সৌজন্য

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন দেশের উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জনসংখ্যা ছিলো সাড়ে সাত কোটি। অথচ তখন দেশের অধিকাংশ লোকের কপালে তিনবেলা খাবার জুটতো না। সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটিতে ঠেকেছে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত ৪০ বছরে এ জমির পরিমাণ কমেছে ১ দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। কমতে কমতে বর্তমানে দেশে মোট ৮ দশমিক ৫২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি আছে। এমন অবস্থাতে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও ধরে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বেশ ভালো করছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণের বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম। আবার ১৩৬টি দেশের মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে বাংলাদেশের অবস্থান।

৭৫তম, যা গত ১০ বছরে এগিয়েছে ১১ ধাপ (Global Gender Group Report 2013, World Economic Forum)। নারীরা তাদের মেধা, শ্রম, সাহসিকতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন।

অন্যান্য উল্লেখ যোগ্য সাফল্যের মধ্যে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু ও পারক্যাপিটা ইনকামের বৃদ্ধি অন্যতম। কিন্তু রয়ে গেছে বেশকিছু দুর্বলতা যেগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও বেশ ভালো করতে পারে।

প্রথমেই আসি বেকারত্বে। সবাই ডেমোগ্রাফিক

ডেন্ড এর কথা বলে থাকেন। দেশে এখন কর্মক্ষম মানুষের চেয়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক কম। বেশ ভালো। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছি না। জরিপ বলছে দেশের ৪৭% গ্রাজুয়েট বেকার। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং প্রতি বছর ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে।

যদিও বিশ্বব্যাংকের এই বেকারত্ব মাপার পদ্ধতি নিয়ে অনেকের ভিন্নমত আছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড স্থায়ী থাকবে আর বছর দশেক। এরপর একেক জন কর্মক্ষম মানুষকে একাধিক বয়স্ক লোকের বোঝা বইতে হবে। তাহলে আমরা সে সময়ের জন্য কি প্রস্তুত করতে পারছি? তরুণরা বলছে চাকুরি নেই, আর চাকরিদাতারা বলছে যোগ্য লোক নেই। তার মানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। অবস্থা এতোই বেগতিক যে, যে যতো বেশি শিক্ষিত তার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ততো কম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্রুত বর্ধনশীল কোটিপতি বৃদ্ধির দিকে থেকেও বাংলাদেশ এগিয়ে।সম্প্রতি দেশে আলোচিত খবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণার ৯৮% নকল। পাশের দেশ ভারতের আইআইটিগুলো একদিকে যেমন রেকর্ড পরিমাণ পেপার্স প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে সরকার এবং ইন্ডাস্ট্রির সাথে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি কোলাবোরেশন (সমন্বয়) করেছে।

দেশে আয় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। যাদের টাকা আছে তাদের আরও টাকা হচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পদ বাড়ছে না তেমন। বাংলাদেশে অতিধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় সবোর্চ্চ। অন্যদিকে রিপোর্ট বলছে, উত্তরের পাঁচ জেলায় দারিদ্রের হার নতুন করে বাড়ছে।

২০০০ সালে দেশে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৩৫% এর মতো। ২০১৬ সালে এসে যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২.৯%। কিন্তু দারিদ্র বিমোচনে শীর্ষ ১৫ দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ।

উত্তরবঙ্গের একটি অংশে নতুন করে দারিদ্র্যের তীব্রতা ফিরে এসেছে। বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে দরিদ্রপ্রবণ ১০টি জেলার মধ্যে ৫টিই রংপুর বিভাগের। জেলাগুলো হলো- কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট। বাকি জেলাগুলো হলো খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, জামালপুর, মাগুরা ও কিশোরগঞ্জ। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে।

দেশের রপ্তানির অন্যতম হাতিয়ার গার্মেন্টস শিল্প। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে সবকিছু অটোমেশনের হাতে চলে যাবে। পূর্বাভাস বলছে গার্মেন্টস সেক্টর সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে। নিম্নমজুরির কারণে যে শিল্প এদেশে এতো ভালো করছে, যার ফলে এতোগুলো নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে, অটোমেশনের ফলে আর সেসব সম্ভব হবে না। ফলে একদিকে এই শিল্পে অনেকগুলো মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে, অন্যদিকে রপ্তানিতে এর উপর একক নির্ভরশীলতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে একটা বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই সময়ের সাথে মানিয়ে নিতে নিম্ন মজুরি নয়, বরং দক্ষকর্মী বানানো আর রপ্তানিপণ্যে বৈচিত্র্যতা আনতে হবে। এ জন্য ওষুধ, চামড়া ও সফটওয়্যার শিল্প হতে পারে আমাদের নতুন সময়ের দিশা।

দেশের দরিদ্র ও ধনী তিন জেলার তুলনামূলক চিত্র। সৌজন্য

আরেকটা বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত বলে হয়। বিদেশে পাড়ি জমানোর মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনানোর জন্য এই পর্যন্ত কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অফ প্যানিসেলভিনিয়ার গবেষক ড. রউফুল আলম অনেকদিন ধরে লিখছেন। তার মতে উচ্চশিক্ষার্থে দেশের বাইরে পাড়ি জমানোর মেধাবীদের একদিকে যেমন দেশের জন্য কাজ করার প্রচণ্ড আগ্রহ আছে, অন্যদিকে

তাদের দেশের কাজে লাগিয়ে বেশ উন্নতি করার সুযোগও আছে। ভারত কিংবা চীন এই প্রক্রিয়ায় ভালো সাফল্য পেয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটা অকথিত নিয়ম তৈরি হয়ে গেছে। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার আবেদন করছেন তাকে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট হতে হবে। আমরা দেখেছি দেশের বাইরের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে আবেদন করে ভাইভাতে হেনস্তার স্বীকার হয়েছেন। তাই তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের সাথে সাথে তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

এদেশ অবারিত সম্ভাবনার। এদেশের মানুষ মেধার দিক থেকে বিশ্ব যে কোনো দেশের তুলনায় পিছিয়ে নেই। যে যার অবস্থান থেকে নির্ধারিত দায়িত্বটুকু পালন করলে ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশের যে স্বপ্ন সেটা আর অলীক মনে হবে না।

ইউসুফ মুন্না, শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়