গাছে গাছে শুধু আম আর আম

‘গত ৩০ এপ্রিল প্রচণ্ড ঝড় আর শিলাবৃষ্টি হয়। গাছের নিচে গিয়ে দেখি, আম বিছিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু তাকিয়ে দেখি, আম ঝরার তেমন চিহ্নই নেই কোনো। কারণ, এবার আমের গুটি টিকেছিল অস্বাভাবিক রকমের বেশি। ঝরে পড়ার পরও তাই প্রচুর আম আছে গাছে। শেষ পর্যন্ত আর কোনো বড় দুর্যোগ না হলে এবার বাম্পার ফলন হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন পুঠিয়া উপজেলার আমচাষি সিরাজুল ইসলাম।

বৈশাখ এলেই মধু ফল আমের কারণে দেশবাসীর নজর কাড়ে রাজশাহী। চলতে থাকে দিন গোনার অপেক্ষা। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরই বাজারে আসছে গোপালভোগ। সঙ্গে থাকবে বিভিন্ন জাতের গুটি আমও।

রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, গাছের পাতা ঢেকে দিয়ে ভেসে আছে আমের থোকা। চাষিরা বাগানের যত্ন নিচ্ছেন, আর মুগ্ধ হচ্ছেন আমের প্রাচুর্য দেখে। বাঘা উপজেলার আরপাড়া গ্রামের আমচাষি মহসিন আলী বলেন, ‘অস্বাভাবিক রকমের আম হয়েছে এবার। এত আম শেষ পর্যন্ত থাকলে গাছের ডালপালা সব ভেঙে যাবে। সামনে আরও ঝড়বৃষ্টি আছে। আরও আম ঝরলেই কেবল গাছের ডালপালা রক্ষা পাবে।’

চাষিরা জানান, প্রতিবছরই গাছে মুকুল এলে বৃষ্টি বা কুয়াশার কারণে আমের গুটি কিছুটা কম টেকে। কিন্তু এবার মুকুল আসার সময় রাজশাহীর আবহাওয়া ছিল চমৎকার। কুয়াশামুক্ত ঝকঝকে আকাশ থাকায় আমের গুটি টেকে বেশি। চৈত্র মাসের প্রচণ্ড খরায় যখন সেচের প্রয়োজন হলো, তখনই আকাশ থেকে ঝরল একপশলা বৃষ্টি। সবকিছুই যেন  আশীর্বাদ হয়ে এলো আমের জন্য। গুটি থেকে আম মার্বেলদানা হওয়ার পর বৃষ্টি হলো আবার। খরা না থাকায় আম ঝরে পড়ার কোনো কারণও  ঘটেনি। আর চাষিরা অনেক বেশি সচেতন ও যত্নবান হওয়ায় শুরু থেকেই নিয়েছেন প্রয়োজনমতো যত্ন। মুকুল ফোটার আগে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করেছেন। আবার আম মটরদানা হওয়ার পরও করেছেন স্প্রে। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকেও রক্ষা পেয়েছে তাই।

বাঘার মনিগ্রাম এলাকার আমচাষি শফিউর রহমান শফি জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি গাছে মুকুল এসেছিল। কোনো কুয়াশা ছিল না। এ কারণেই ছত্রাক বা পোকা আক্রমণ করতে পারেনি মুকুলে। তারপর ফাল্কগ্দুনের মাঝামাঝিতে একপশলা বৃষ্টি উপকারী হয়ে দেখা দিয়েছিল মুকুলের জন্য।

বাঘার মনিগ্রামের আরেক আমচাষি জিন্নাত আলী বলেন, ‘এবার ৯৫ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল। সামনে হালকা ঝড়ে কিছু আম ঝরে গেলও এবার বাম্পার ফলন হবে।’

পুঠিয়ার আমচাষি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমগাছে মুকুল আসাটা অনেকটা যত্নের ওপর নির্ভর করে। ভালো পরিচর্যা করলে প্রতিবছরই ভালো ফলন পাওয়া যাবে।’

বাগমারা উপজেলার আমচাষি আক্কাস আলী মাস্টার বলেন, ‘ভালো ফলন হলে আমের দাম কমে যায়। তাই সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, চাষিরা যেন সহজেই পর্যাপ্ত আম বিদেশ পাঠাতে পারেন।’

রাজশাহী জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, গত বছর জেলায় ১৬ হাজার ৯৬১ হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল। এবার বাগান বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর। কোনো দুর্যোগ না হলে এবার দুই লাখ আট হাজার ৬৬৪ টন আমের ফলন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, ‘গত কয়েক বছরের ইতিহাসে এত আম কখনই টেকেনি। অস্বাভাবিক রকমের আম টিকেছে।’

রাজশাহী ফল গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই ফলের রাজা আম আসে। আশা করছি, এবার দেশের মানুষ পর্যাপ্ত আম খেতে পারবেন। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাকবে গোপালভোগ এবং কিছু গুটি আম। এর পরপরই আসবে খিরসাপাত বা হিমসাগর। এর পর ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি আসবে। তবে এবার পর্যাপ্ত গরম না পড়ায় আম পাকার সময় কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে।’

বিদেশে আম রফতানি : বাজারে পেয়ারার দাম যখন ১৫০ টাকা, তখনও ফলের রাজা আমের দাম ৪০ টাকার বেশি হয় না। ফলে আমচাষিরা হতাশ হন। গত কয়েক বছরে রাজশাহী অঞ্চলের অনেক আমবাগান কেটে তৈরি করা হয়েছে পেয়ারা বাগান। তবে গত দুই বছর বিদেশে কিছু আম পাঠানোর খবর চাষিদের দেখিয়েছে যেমন আশার আলো, তেমনি করেছে হতাশ।

চাষিরা জানান, বিদেশে আম পাঠানোর জন্য তারা ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করেও গত বছর বিদেশে পাঠাতে পারেননি। গত বছর প্রায় ৭০ টন আম (দুই লাখ আম) ব্যাগিং করা হলেও বিদেশে গেছে মাত্র ১৫ থেকে ২০ টন। বাঘার পাকুরিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম সানা বলেন, ‘গত বছর পোকার আক্রমণ করা কিছু আম ইউরোপে যাওয়ার কারণে হঠাৎ করেই আম নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে চাষিদের প্রায় দুই লাখ ব্যাগিং করা আম বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।’

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, ‘গত বছর ৫০ টন আম বিদেশে পাঠানোর টার্গেট ছিল। তবে ১৫-২০ টনের বেশি যায়নি। কারণ, বিদেশিদের উপযোগী করে এখনও দেশে আম উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশে আম পাঠাতে হলে ২৬টি শর্ত মানতে হয়। ব্যাগিং তার মাত্র একটি শর্ত। তাই খালি ব্যাগিং করলেই চলবে না, মানতে হবে আরও ২৫টি শর্ত। এভাবে শর্ত মেনে আম উৎপাদন বেশ কঠিন। তারপরও শুধু বাঘা উপজেলার ১৪ জন চাষির সঙ্গে এবার চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন রফতানিকারকরা। ২৬টি শর্ত মেনেই আম উৎপাদনে রাজি হয়েছেন তারা। ১০০ টন আম বিদেশে পাঠানোর টার্গেট রয়েছে এবার।’