পদ্মার চরে চাষাবাদ, সবুজ দেখতে ভিড়

ভরা মৌসুমে পদ্মায় উত্তাল উতুঙ্গু থৈ থৈ ঢেউ, তারপর পড়ে অবিরত চর। শীত থেকে গরমের মাঝামাঝি কয়েক মাস পানি কম থাকে নদীতে। এসময় পদ্মার পাড় সংলগ্ন এলাকায় জেগে ওঠে চর। আর সেই চরে ফলানো হয় সবুজ ফসল। সকাল-দুপুরের রোদের প্রকোপ শেষে বিকালের হাল্কা ঠাণ্ডা বাতাসে ফসলি জমির সবুজ সমারোহ ও মায়া ছড়ানো চরের সৌন্দর্য হাতছানি দিয়ে ডাকে দর্শনার্থীদের। নদীর বুকে ফসলের চাষাবাদ এবং নয়নাভিরাম সবুজের সমারোহ দেখতে পদ্মার চরে নিয়মিতই ভিড় জমাচ্ছেন বিনোদনপ্রেমী মানুষরা।

জানা গেছে, গত দুই বছর ধরে চরে জন্মানো আগাছা কেটে সেখানে রোপণ করা হয়েছে আবাদি ফসল। সেখানে রীতিমতো চাষ করে ধান, গম, মসুর, মটরসহ নানা ধরনের শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে। এর ফলে বেড়েছে কর্মসংস্থান, বেড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের মানুষগুলো সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বিকালে পদ্মার চরে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে খুঁজে পায় গ্রামের সবুজ মাঠের স্পর্শ। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে পদ্মার চরে ঘুরতে আসেন পর্যটকরা। প্রতিদিন শহর এবং শহরের বাইরে থেকে পরিবার-পরিজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘুরতে আসেন লোকজন।

সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলেই বিনোদনপ্রেমী সকল মানুষের আনাগোনা শুরু হয় পদ্মার চরে। দুপুরের রোদ কমলে বিকালে নামতে থাকে মানুষের ঢল।  তবে ছুটির দিনগুলোতে দ্বিগুণ হারে বেড়ে যায় বিনোদনপ্রেমীদের ভিড়। পদ্মার পাড় থেকে চর পর্যন্ত প্রায় সকল স্থানগুলোতেই কমবেশি দেখা মেলে তাদের।

 

রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্পটের মধ্যে আলুপট্টি, মুন্নুজান, পদ্মা গার্ডেন, মুক্তমঞ্চ এলাকা, বিজিবির সীমান্তে অবকাশ, সীমান্তে নোঙ্গর, আই-বাঁধ, টি-বাঁধ ইত্যাদি স্পটগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে। কেউ পরিবার-পরিজন, কেউ বন্ধু-বান্ধব মিলে আড্ডা দিতে; কেউবা নিছক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে ভিড় জমায় চরে। দর্শণার্থীরা জানান, পদ্মার চরের বালুতে হাঁটতে কিংবা একটু পানির ছোঁয়া নিলেই ভরে যায় মন-প্রাণ। এর সঙ্গে মিলিয়ে পদ্মার চরে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমাণ দোকানে ফুচকা, চটপটি কিংবা ফলমূলের নানা স্বাদ নেওয়ার মজাই আলাদা।

রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিনাথ বলেন, ‘আমাদের কলেজ ক্যাম্পাসের কাছেই এই পদ্মার চর। তাই সময় পেলেই বন্ধুরা মিলে বেড়াতে চলে আসি এখানে। পড়াশুনার মধ্যে মানুষের সুস্থ বিনোদনের দরকার রয়েছে, আর সেই সুস্থ বিনোদন এই পদ্মার চরে এলেই পাওয়া যায়। প্রকৃতিকে উপভোগ করা যায় মুগ্ধভাবে। বিকালের হাল্কা মিষ্টি বাতাসে চরের মধ্যে হাঁটতে অসম্ভব ভালো লাগে।’

পরিবারের দুই ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন রাজশাহী নগরীর শিরোইল কলোনির বাসিন্দা সাবিনা নাজনিন। তিনি বলেন, ‘বাচ্চারা মাঝে মাঝে বেড়ানোর কথা বললেও ব্যস্ত থাকায় তেমনভাবে সময় দিতে পারি না। তাই যখন সময় পাই, তখনি চলে আসি এই চরে। গোটা শহরের মধ্যে মুক্ত বাতাসের জন্য প্রিয় এই পদ্মার চর। আগে চরে আসলে বাচ্চাদের নিয়ে বিবৃতকর অবস্থায় পড়তে হতো, ভয় কাজ করতো। তখন জঙ্গলের পাশ দিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগতো। আর এখন গোটা চর গ্রামের মাঠে পরিণত হয়েছে। এখানে এলে বাচ্চারা গ্রামের আসল রূপ খুঁজে পায় এবং তাদের বিভিন্ন ফসলের সঙ্গেও পরিচিত করাতে পারছি। তবে কর্তৃপক্ষ যদি আরও ভালোভাবে গোটা চরটা সাজায়, তাহলে বাংলাদেশের মধ্যে বিনোদনের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ জায়গা হবে এই পদ্মার চর।’

এ ব্যাপারে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর হবিবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে নদীর ধারের দোকানপাট অনেক বেড়ে গেছে। কোথাও কোথাও চলাচলের জন্য খুব কম জায়গা থাকছে, এর ফলে অনেক সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বিষয়গুলো এখন থেকেই কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত। আমি রাজশাহীর নাগরিক হিসেবে বলতে চাই, পরিকল্পিতভাবে এখন থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। বর্তমানে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সামনে ভরা বর্ষার মৌসুমে অনেক অসুবিধা পোহাতে হবে আমাদের।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুস্থ বিনোদনের জন্য মানুষের হাঁটাচলার জায়গা থাকতে হবে, নাহলে অনেক অসুবিধা সৃষ্টি হবে। তাই সুস্থ বিনোদনের জন্য এখন থেকেই এই সমস্যার সমাধান করা উচিত।’