গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিকে অভূতপূর্ব সাফল্য

প্রথম সন্তান গর্ভে থাকাকালে আমি মাত্র একবার চেক-আপের সুযোগ পেয়েছিলাম। কারণ বাড়ি থেকে হাসপাতালের দূরত্ব অনেক। নিয়মিত চেক-আপের সুযোগ পাইনি। ওষুধের দাম বেশি হওয়ায় কোন ওষুধ খেতে পারিনি। বাড়িতেই ধাত্রী ডেকে আমার ডেলিভারি করানো হয়। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আমার সন্তানটি মারা যায়। এর দুই বছর পরেই আমার দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে আসার সময় থেকে ডেলিভারির আগ পর্যন্ত কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকের সেবা পেয়েছি। নিয়মিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়ে চেকআপ করেছি, বিনামূল্যে ওষুধ পেয়েছি। সেখানেই প্রশিক্ষিত ধাত্রীর মাধ্যমে আমার ডেলিভারি হয়। বর্তমানে আমি ও আমার সন্তান দু’জনেই সুস্থ আছি।’ কথাগুলো বলছিলেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বালিয়াখালী গ্রামের ২৬ বছর বয়সী তাসলিমা নাহার।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মতো দরিদ্র মা ও শিশুর সেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক আশীর্বাদস্বরূপ। আমার এলাকার সব গর্ভবতী নারীই বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যান প্রসবকালীন ও প্রসবপরবর্তী সেবা গ্রহণের জন্য। পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও গর্ভবতী নারীর অনিরাপদ প্রসব বাড়িতে হতো। যার ফলে মা ও শিশু মৃত্যুর হারও বেশি ছিলো। বর্তমানে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার কল্যাণে আমাদের মতো দরিদ্র মায়েরা নিরাপদে প্রসবসেবা ও পরবর্তীসেবা পাচ্ছেন এখান থেকে। সেইসঙ্গে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ।

বর্তমান সরকারের অনেক সাফল্যের অন্যতম দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের প্রতিটি জেলায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের অধীনে একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৪ সাল থেকে দেশে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। সরকারী টার্গেট অনুযায়ী এ সংখ্যা ১৮ হাজারে উন্নীত করার কাজ চলমান। এর ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা নেয়ার হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সরকার মাতৃ মৃত্যু ও শিশু মৃত্যু রোধ করতে নানা কর্মপরিকল্পনা পরিচালনা করছে। পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে নারীর গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবায় অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে। আবার গ্রাম পর্যায়ে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধে ২০১৮ সালের মধ্যে ৪২১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন সাব- সেন্টারে প্রায় তিন হাজার ধাত্রী নিয়োগ দেয়া হবে। সেইসঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামতের কাজও অব্যাহত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক (এমপি) বলেন, ‘আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে না পৌঁছাতে পারলেও বিগত বছরগুলোর তুলনায় মাতৃ মৃত্যুর হার অনেক কমে এসেছে। শুধু সংখ্যাগত অর্জনের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে এখন গুণগত ও মানসম্মত সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়ার লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘শিশু জন্ম দিতে গিয়ে যেসব মা মৃত্যুবরণ করেন তাদের তিন ভাগের এক ভাগ মারা যান অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। খিচুনির কারণে ২০ ভাগ মা সন্তান জন্ম দেয়ার সময় মারা যান। এর মূল কারণ হলো বাল্যবিয়ে এবং অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ। দেশে এখনও ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের বিয়ে হয়। যাদের বেশিরভাগই গর্ভধারণ করেন এবং প্রসবকালীন মৃত্যুবরণ করেন। তাই অন্তত ২০ বছরের আগে যেন কেউ সন্তান না নেন সেজন্য ব্যপক প্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এখনও ৬২ ভাগ নারী বাড়িতেই প্রসব করে থাকেন। তাদের নিরাপদ প্রসবের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে গর্ভকালীন সেবার জন্য একজন প্রশিক্ষিত গাইনি ডাক্তার ও একজন এনেসথেসিয়া ডাক্তার সাত দিন ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে থাকেন।

মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে দেশে মাতৃ মৃত্যুর হার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শিশু মৃত্যুর হার প্রায় অর্ধেক কমেছে। আর এ জন্য মাতৃমৃত্যু রোধে সরকার ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারী সংস্থা নানা কর্মসূচী ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে, সন্তান প্রসবপূর্ব মায়ের যতœ, দরিদ্র নারীর জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার প্রকল্প, কমিউনিটিভিত্তিক স্কিলড বার্থ এ্যাটেনডেন্টস (এসবিএ) নিয়োগ ও মিডওয়াইফারি কর্মসূচি।

ইউএনএফপিএ’র তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে শতকরা প্রায় ৪২ জন গর্ভবতী মা প্রশিক্ষিত ধাত্রীর পরিচর্যায় নিরাপদ প্রসবের আওতায় এসেছেন। বাকি মায়েরা ঘরেই ধাত্রী ছাড়া অন্যের সহায়তায় সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। এর ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি ছাড়াও মায়েরা প্রসব-পরবর্তী নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়াতে পারলে মাতৃ মৃত্যু হার আরও হ্রাস পাবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানা গেছে, দেশের সকল কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ইন্টারনেট প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। দেশের সকল উপজেলার ১২ হাজার ৫৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ও এক হাজার ২৭৫টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট মডেম বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক ডিজিটালাইজড। এ জন্য কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের ই-লার্নিং কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। ই-লার্নিং এর মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবাদানকারীদের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন ঘটছে।