‘উন্নত গ্রামে আধুনিক জীবন’ : গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল

প্রতি বছর প্রায় ৭০ ভাগের বেশি ভূমি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। গ্রামের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বন্যার পানি দ্বারা খণ্ডকালীন বেকারত্বসহ ও ব্যাপকভাবে আর্থিক ও জানমালের ক্ষতি হয়। এতে করে গ্রামীণ মানুষের জীবন যাত্রার মান তেমন কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। ‘উন্নত গ্রামে আধুনিক জীবন’ মডেলের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ মানুষকে দারিদ্র্য চক্রের মধ্য থেকে বের করে নিয়ে আসা এবং উন্নত জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। এ মডেলটি মূলত বাংলাদেশের প্রায় ৮৭ হাজার ৩২০টি গ্রামকে ১,৬০০টি উন্নত গ্রামে পরিণত করা লক্ষ্য। অর্থাৎ ৬৪টি জেলাকে গড়ে ২৫টি করে উন্নত গ্রামের আদলে গড়ে তোলা। প্রতিটি উন্নত গ্রামে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করা। এক্ষেত্রে পদ্মা ও অন্য বড় নদীগুলো থেকে বালু তুলে নির্ধারিত অঞ্চলগুলো ভরাট করে প্রতিটি পরিবারকে ৩ ও ৫ কাঠা জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা। এতে পদ্মা নদীর গভীরতা বাড়বে পাশাপাশি বন্যা কমবে। ফলে বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটবে। প্রতিটি উন্নত গ্রাম হবে এক একটি পর্যটন কেন্দ্র।

উদাহরণ হিসেবে শরীয়তপুর জেলাকে ধরা যাক, ১,১৮১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শরীয়তপুর জেলায় ৬৫টি ইউনিয়নে ১,২৪৩টি গ্রামে ২,৪৭,৮৮০টি পরিবার রয়েছে। এই ১,২৪৩টি গ্রাম অপরিকল্পিত ও বিক্ষিপ্তভাবে এক একটি দ্বীপের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ফলে সরকারের সর্বোচ্চ সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সহজেই তাদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না কিংবা পাচ্ছে না। তাই গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবনমানকে উন্নত করার লক্ষ্যে শরীয়তপুর জেলার ১,২৪৩টি গ্রামের মানুষকে যদি ২৫টি উন্নত গ্রামে পরিণত করা যায়, তাহলে সহজেই যে কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া সম্ভব।

সারা দেশে ১,৬০০টি উন্নত গ্রামের মাধ্যমে মডেলটি বাস্তবায়ন করলে বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ গ্রামীণ উন্নয়ন বাজেট নির্ধারণ করা হয় তার ৭০ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় হবে। কৃষি জমি বৃদ্ধি পাবে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। অপরদিকে নদীগুলো থেকে বালু উত্তোলন করার ফলে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পাবে বর্ষা মৌসুমে পাহাড় থেকে আসা পানি সহজে বঙ্গোপসাগরে নেমে যেতে পারবে। নদী ভাঙন হ্রাস পাবে। বন্যার পরিমাণ ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস পাবে। নদীর গভীরতা বাড়ানোর জন্য সরকারের যে অর্থ বর্তমানে ব্যয় করতে হচ্ছে তা সাশ্রয় তো হবেই বরং তার দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ ফেরত পাবে। কেননা যেহেতু বালুগুলো পুনর্বাসন কেন্দ্র ভরাটের জন্য ব্যবহার হবে, তাই জনগণ জমি ভরাটের জন্য অর্থ দিবে। অর্থাৎ বিনা খরচে নদী খনন হবে আবার দেশের প্রতিটি গ্রামকে উন্নত গ্রামে পরিণত করা যাবে। উন্নত গ্রামের মডেলের পরিপ্রেক্ষিতে ২ থেকে ৩ বর্গকিলোমিটারের প্রতিটি অঞ্চলে গড়ে ২টি করে বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়, তাহলে প্রায় ১৮টি বিদ্যালয়ের সমপরিমাণ অর্থ ও জনবল দিয়ে ১টি তৈরি করা যায়। ফলে অবকাঠামোগত ব্যয় হ্রাস হবে এবং কৃষি জমি বৃদ্ধি পাবে, অসাধু ব্যক্তিদের অর্থ আত্মসাৎ হ্রাস পাবে, শিক্ষার্থীদের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া যাবে, একই বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষক থাকার ফলে গ্রামের শিক্ষকরা দক্ষ শিক্ষকদের সংস্পর্শে আসার ফলে নিজেরা নিজেকেই দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রেও অনুরূপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাবে। প্রতিটি জেলায় ১টি আধুনিক হাসপাতাল করে, উন্নত গ্রামের জন্য গড়ে ১টি করে চিকিৎসা কেন্দ্র পরিণত করে, সেই একটি কেন্দ্রের মধ্যেই সব বিভাগ বণ্টন করে দেয়া যায়। এতে প্রতি ৫টা হাসপাতাল করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। সেই একই পরিমাণ অর্থ, জনবল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি দিয়ে একটি হাসপাতালে পরিণত করলে সহজে আধুনিক মানের সেবা দেয়া সম্ভব। পাশাপাশি ভূমির অপচয় হ্রাস পাবে। জনগণ ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাবে।

প্রতি বছর সরকারকে বাজেটের উন্নয়ন ব্যয়ের হাজার হাজার কোটি টাকা গ্রামের রাস্তা নির্মাণে ব্যয় করতে হচ্ছে। তারপরও গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন হচ্ছে না। দেশের ৮৭,৩২০টি গ্রামের রাস্তাগুলো নির্মাণ ও মেরামত না করে শুধু মডেলের উন্নত গ্রামগুলো রাস্তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নির্মাণ করলে ১০ বছরেও রাস্তার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা রাস্তাগুলো উন্নত গ্রামের প্রকল্পের মধ্য দিয়ে থাকবে। ফলে সেখানে বর্ষা মৌসুমের পানি প্রবেশ করতে পারবে না। যার ফলে সরকারকে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর থেকে ১০ বছরের মধ্যে কোনো রাস্তা নির্মাণে অর্থ ব্যয় করতে হবে না। ফলে রাস্তা, কালভার্ট, ব্রিজ নির্মাণ ব্যয় হ্রাস পাবে, কৃষি জমি বৃদ্ধি পাবে। তাই সহজেই উন্নত গ্রামের সব মানুষ অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, নিরাপত্তাসহ সব সেবা পাবে।

বর্তমানে প্রতি বছর মোট কৃষি জমি থেকে ১ শতাংশ করে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে এ হিসেবে আগামী ৪০ বছরে মোট কৃষি জমির প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পাবে। কিন্তু মডেলের আদলে গ্রাম ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে উল্টো বর্তমান সময়ই ৮৭,৩২০টি গ্রামে জন্য যে পরিমাণ কৃষি জমি ব্যবহার হয়েছে তা যদি ১,৬০০টি উন্নত গ্রামে পরিণত করা হয় তাহলে ৪০-৫০ শতাংশ জমিতেই সম্ভব। অর্থাৎ জমি তো হ্রাস পাবেই না বরং বর্তমান অপরিকল্পিত গ্রামগুলো থেকেই ৫০-৬০ শতাংশ জমি বৃদ্ধি পাবে।

প্রায় প্রতি বছরই বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় এ দেশের মানুষকে। সম্প্রতি ২০১৭ সালের বন্যায় ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশের ৩২ জেলায় মৌসুমি বন্যায় ঘর-বাড়ি ভেঙে যাওয়ায়, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ও বাঁধ ভেঙে ক্ষতি, অবকাঠামোগত মোট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মোট ১৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। বন্যা চলাকালে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সেবাসহ বন্যার পরবর্তী সময়ে বন্যাদুর্গত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য আরো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে। অর্থাৎ ২০১৭ সালের বন্যায় শুধু ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্বাসনের জন্য। তা ছাড়া ফসলের ক্ষতি, বন্যাকবলিত মানুষগুলো খণ্ডকালীন বেকারত্বের কারণে আর্থিক ক্ষতি আরো ১০ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। বিশ^ব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তাই ‘উন্নত গ্রামে আধুনিক জীবন’ মডেলের আওতায় গ্রামগুলোকে আনা হলে প্রতিটি পরিবার এ ধরনের সমস্যা থেকে রেহাই পাবে। অন্যদিকে পরিকল্পিত গ্রাম গড়ে তোলার কারণে সহজেই বিদ্যুৎ বিতরণ করা যাবে। বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের খরচ ৮০ ভাগ হ্রাস পাবে। ফলে সবাইকে সহজেই বিদ্যুতের আওতায় আনা যাবে। এই মডেলের আদলে পরিকল্পিত গ্রাম গড়ে তোলা হলে গ্রামের প্রতিটি ঘরের সামনে গাড়ির মাধ্যমে সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সহজেই গ্যাস পৌঁছে দিতে পারবে।

দ্বীপের মতো বিক্ষিপ্ত ও অপরিকল্পিত গ্রামব্যবস্থার কারণে গ্রামের ৯০ ভাগ মানুষ ফায়ার সার্ভিস সেবা পায় না। অথচ সরকার দেশের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করেছে। শুধু গ্রামের গঠনগত ভুলের কারণে হাতের কাছে সেবা থাকার পরও তা গ্রহণ করতে পারছে না। তাই মডেলের আদলে গ্রামব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে গ্রামের শতভাগ মানুষকে ৫-১০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস সেবা দেয়া যাবে। ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগবান্ধব দেশ। বছরের ১২ মাস কাজ করা যায়। মডেলের আওতায় এলে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে পার্থক্য হ্রাস পাবে। তাই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে ‘উন্নত গ্রামে আধুনিক জীবন’ মডেলের কোনো বিকল্প নেই।