লালমনিরহাটের ব্র্যান্ডিং পণ্য ভুট্টা, কম খরচে অধিক মুনাফা

উত্তর জনপদের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট। এই অঞ্চলের চাষীদের ভুট্টাচাষে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাই তো নানা ফসলের মাঝখানে এই ভুট্টা ব্যাপকভাবেই চাষ করে এই অঞ্চলের মানুষ। ফলে দিন দিন এই জেলায় ভুট্টার চাষাবাদ বাড়ছে। বিশেষ করে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা দুই উপজেলায় ভুট্টা চাষ বেড়েছে বহুগুণে। ব্যাপক ফলনের কারণে এ জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্থান পেয়েছে ভুট্টা। আর অল্প খরচে অধিক মুনাফা অর্জনের আশায় এই অঞ্চলের অনেক কৃষক ভুট্টার চাষ বাড়াচ্ছেন।

কৃষকরা জানান, কখনও আলু আবার তামাক চাষ করলেও অধিকাংশ সময় ভুট্টার চাষও করেন তারা। মানুষ, গবাদিপশু, পাখির খাদ্য এবং জ্বালানি হিসেবে প্রতিনিয়ত ভুট্টার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ হাজার ৫২০ হেক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে। আর চাষ হয়েছে ২৫ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। গত বছর দুই মৌসুমে এ জেলায় দুই লাখ ৮১ হাজার ৮৯৮ মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়। যার মধ্যে হাতীবান্ধায় ১০ হাজার ২০ হেক্টর এবং পাটগ্রাম উপজেলায় ভুট্টা চাষ হয়েছে ১২ হাজার ৫০ হেক্টর।

সরেজমিনে লালমনিরহাটের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাতাসে দুলছে সবুজ ভুট্টা গাছ। কোন কোন ক্ষেতে ফুলও এসেছে। চাষীরা মন দিয়ে যতœ নিচ্ছেন। দূর থেকে দেখলে এক একেটি ভুট্টার ক্ষেত মনে হবে একটি সবুজের বৃত্ত।

তিস্তার জেগে ওঠা চর থেকে শুরু করে উঁচু ও নিচু সকল জমিতেই ভুট্টা চাষ করছেন। এতে করে কমতে শুরু করেছে ধান চাষও। কারণ ধানের চেয়ে ভুট্টায় খরচ কম আর লাভ বেশি হয় বলে জানা গেছে। তাই কৃষকদের ধান চাষে তেমন আগ্রহ নেই বললে চলে। তবে ভুট্টার সঙ্গে অন্যান্য ফসলেও আগ্রহ রয়েছে এই জেলার চাষীদের। রংপুর থেকে লালমনিরহাট যেতে সড়কের দুই পাশে দেখা যাবে ভুট্টার বড় বড় ক্ষেত। এ ছাড়াও হাতিবান্ধা ও পাটগ্রামে রয়েছে ভুট্টার বিশাল বিস্তৃত ভুট্টা ক্ষেত। এসব উপজেলার বিস্তৃতি দেখে মনে হবে কোন বিশাল বড় বন। এলাকাগুলোর অধিকাংশ ক্ষেতে শুধু কৃষকেরা ভুট্টার চাষ করেছেন।

কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভুট্টা চাষ করতে যে খরচ হয়। অন্যান্য আবাদে তার থেকে অনেক বেশি খরচ হয় এখন। এ ছাড়াও ভুট্টা চাষাবাদের ক্ষেত্রে সার, কীটনাশক, সেচ ও মজুরি তুলনামূলক কম লাগে।

লালমনিরহাটের মুস্তাফীরহাট এলকার একাধিক কৃষক জানিয়েছেন এবার ভুট্টায় ভাল ফলন হবে। দামটাও ভাল আশা করছেন তারা। চাষী রহিমউদ্দিন (৪৫) বলেন, বিগত দিনগুলোতে অন্যান্য ফসল করে লোকসান গুনেছি। কিছু ফসলে লাভ পেলেও তা সামান্য। এবার ১০ একর জায়গায় পুরোটাই ভুট্টা আর অল্প একটু মরিচ লাগিয়েছি। আশা করছি ভাল ফলন পাব। সদর উপজেলার সানাউল নামের ব্যক্তি বলেন, আমরা চাষবাস করে খাই। একেক বছর একেটা করি। কম-বেশি সবই করতে হয়। গত বছর অল্প লাভ পেয়ে এবার একটু বেশি জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন এই সানাউল। তবে ফলন আর লাভ নিয়ে এখনই কিছু বলতে চান না তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জেলার পাঁচ উপজেলায় ২৪ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। যার মধ্যে ২২ হাজার ৯১০ হেক্টর জমির আবাদ থেকে ২ লাখ ৩ হাজার ৮৯৯ টন ভুট্টা উৎপাদন হয়। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৮ দশমিক ৯০ টন ফলন পাওয়া যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয় ২৪ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে। এ থেকে ভুট্টা উৎপাদন হয় ২ লাখ ১৮ হাজার ২২৮ টন। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৮ দশমিক ৮৮ টন করে ফলন পান কৃষক।

জেলায় ভুট্টাজাত পণ্য তৈরির শিল্প কারখানা গড়ে তোলা প্রয়োজন মনে করে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিধু ভূষণ রায় জনকণ্ঠকে জানান, কৃষক যে ফসলে কম খরচে বেশি মুনাফা পায়, সেটা চাষাবাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে ভুট্টা চাষাবাদ বাড়াতে মাঠে কাজ করছে কৃষি বিভাগের লোকজন। ফলে বাড়ছে ভুট্টার চাষাবাদ। আর আগামীর দিনগুলোতে এই চাষাবাদের ক্ষেত্রে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানা গেছে।