নেত্রকোনার হাওড়ে ধান কাটা, মাড়াই শুরু আনন্দে আত্মহারা চাষী

নেত্রকোনার বৃহত্তর হাওড়াঞ্চল জুড়ে আগাম জাতের বোরো ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। আবাদ মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও হয়েছে বেশ ভাল। নতুন ফসল ঘরে তুলে গতবারের অকাল বন্যার ধকল কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন- এমনটাই আশা করছেন হাওড়ের চাষীরা। তাই ক্ষেতের বাম্পার ফলনে আনন্দে আত্মহারা তারা। যদিও শ্রমিক সঙ্কট কিছুটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাওড়দ্বীপ খালিয়াজুরির কীর্তনখোলা, রাঙামাটিয়া, পাঙ্গাসিয়া, সোনাতলা, মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপুঁতা, মদনের বাঘড়া প্রভৃতি হাওড় ঘুরে দেখা গেছে, ক’দিন আগেও যেখানে ছিল ঘন সবুজের সমারোহ- এখন সেখানে সোনালি আভা। চারদিকে ম ম গন্ধ। এরই মধ্যে বি-আর-২৮ জাতের কিছু কিছু জমির ধান কাটা শুরু হয়েছে। বিআর-২৮ অপেক্ষাকৃত আগাম জাতের ধান। গতবারের অকাল বন্যার পর ঝুঁকি এড়াতে এবার বেশিরভাগ চাষী নিচু এলাকার জমিতে বিআর-২৮ জাতের ধান আবাদ করেছেন। এ কারণে বেশ আগেভাগেই শুরু হয়ে গেছে হাওড়ের ‘দাওয়া-মাড়ি’। স্থানীয় কৃষকরা জানান, সপ্তাহখানেক পর তা পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে। খালিয়াজুরির সোনাতলা হাওড়ের বোরো চাষী রহিম আলী জানান, তিনি এ বছর ছয় একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। এর মধ্যে বিআর-২৮ রোপণ করেছেন পাঁচ একরে। এরই মধ্যে এক একর জমির ধান কেটে ফেলেছেন তিনি। বাকি চার একর জমি কাটতে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ লাগবে তার। তিনি জানান, এক একরে ৫৮ মণ ধান পেয়েছেন তিনি। বিআর-১৯ এর জমিতে উৎপাদন আরও বেশি হবে বলে জানান এ কৃষক। তবে শ্রমিক সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাওড়ে এবার ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্যবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক আসত। এবার তাদের সংখ্যা কম। পুরানহাটি গ্রামের শফিকুল ইসলাম জানান, তার জমির ধান পেকে গেছে। কিন্তু শ্রমিক না থাকায় পাবনায় গিয়ে শ্রমিক সংগ্রহ করে এনেছেন। এর কারণ বর্ণনা করে তিনি বলেন, গেল বার ফসলহানির কারণে শ্রমিকরা খালি হাতে ফিরে গেছে। এ কারণে তারা এবার তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

খালিয়াজুরি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর খালিয়াজুরির ৭৯ হাওড়ে প্রায় ১৯ হাজার ৯শ ২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছেÑ যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা বেশি। এরই মধ্যে বিআর-২৮ জাতের গড় ফলনের একটি হিসাবও বের করেছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। এতে দেখা গেছে, এবার প্রতি হেক্টরে ৫ দশমিক ৮ থেকে ৯ মেট্রিক টন হারে ধান উৎপাদিত হচ্ছেÑ যা অন্যান্যবারের তুলনায় বেশি। ওদিকে বিআর-২৯ এবং হাইব্রিড ধানের ক্ষেত্রে উৎপাদন আরও বেশি হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলার ১০ উপজেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯শ ৩০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে পাঁচ উপজেলার (খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন, আটপাড়া ও কলমাকান্দা) হাওড়াঞ্চলে রয়েছে প্রায় ৪১ হাজার ১০ হেক্টর। জেলায় এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫শ ৫৫ মেট্রিক টন ধান। তবে হাওড়াঞ্চলে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে উৎপাদনের এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

এদিকে গতবারের অকাল বন্যার পর এবার হাওড়ের ফসল রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে ব্যাপক উদ্যোগ। এরই মধ্যে সবক’টি ফসল রক্ষা বাঁধের শতভাগ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আখতারুজ্জামান জানান, গতবার যেখানে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র আড়াই কোটি টাকাÑ এবার সেখানে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ৭৩ প্রকল্প কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে এসব বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত করা হয়েছে। প্রতিটি বাঁধই অন্যান্যবারের তুলনায় বেশ মজবুত ও উঁচু করে নির্মাণ করায় স্থানীয় কৃষকরাও খুশি। পাউবো ও স্থানীয় কৃষকরা বলেছেন, এবার পাহাড়ি ঢল এলেও ফসল ঘরে তোলার সময় পাওয়া যাবে।