সবজি উৎপাদনে বিপ্লব

আবহাওয়া অনুকুলে। মাঠে মাঠে এখন সবজি আর সবজি। সে এক চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। সবজি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাতে দারুণ ব্যতিব্যস্ত চাষীরা। হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে না কৃষি শ্রমিকদের। তাদের ফুরসত নেই একদন্ড। মাটি নেড়েচেড়ে তারা রকমারী সবজি উৎপাদন করছেন। সবজি আবাদ ও উৎপাদনকে ঘিরে বহুগুণে বেড়েছে মাঠে মাঠে কর্মচাঞ্চল্যতা। মাঠ ভরে গেছে সবজিতে।, হাট-বাজারেও প্রচুর সবজি উঠছে। মাঠে সবজির ফলন দেখে চাষীদের বুক ভরে যাচ্ছে। কিন্তু পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে দারুণ হতাশ হয়ে পড়ছেন চাষিরা। কারণ উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না। আবার ভোক্তারা কম মূল্যে সবজি ক্রয় করতে পারছেন না। মাঝখানে পকেট ভারী হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের।

সরকারী উদ্যোগে বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও আধুনিক কলাকৌশল, উন্নত বীজ সরবরাহ এবং চাষীদের জ্ঞান ও দক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়টি বরাবরই অনুপস্থিত থাকছে। সবচেয়ে সমস্যা মাঠের মূল্য আর বাজার মূল্যের পার্থক্য। যার মূল দায়ী মধ্যস্বত্বভোগীরা। অথচ এর বিরুদ্ধে সরকারের কৃষি ও বিপনন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ন্যুনতম কোন ভুমিকা রাখছেন না বলে অভিযোগ। কাগজ কলমে মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে নেই। সে কারণে সবজি বিপ্লবের সুবিধা পাচ্ছেন না উৎপাদক চাষী ও ভোক্তা। এমনকি উভয়েই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই অবস্থা শুধু চলতি মৌসুমে নয়, প্রায় প্রতিটি মৌসুমেই। এই একই চিত্র দেশের প্রায় সবখানেই। সবজি চাষী, মাঠ শ্রমিক, পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ী, রফতানীকারক, পরিবহন ও ভোক্তাসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে নেই কোন মনিটরিং। যার জন্য বরাবরই একটা অস্থিরতার মধ্যে থাকে সবজি বাজার। এই তথ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সবজি চাষি ও সবজি বাজার সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, দেশে শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন দু’টি মৌসুমে সরকার সবজি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৬ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে। তবে সিংহভাগ সবজি উৎপাদন হয় শীতকালে। তাছাড়া বাস্তবে লক্ষ্যমাত্রার তার অনেক বেশী জমিতে সবজি আবাদ ও উৎপাদন হয়ে থাকে। আবার যার একটা বড় অংশ হচ্ছে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। যশোরের সবজির বড় পাইকারী বাজার বারীনগরে গিয়ে দেখা গেছে, প্রচুর সবজি উঠেছে। মাঠে মাঠেও সবজি আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে। সিম, বেগুন, মুলা ও লাউসহ সব ধরণের সবজিতে ছেয়ে গেছে কাঁচাবাজার। শুধু যশোর নয়, মাগুরা, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও মেহেরপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ছাড়াও নরসিংদী, কুমিল্ল­া, বগুড়া, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, চট্রগ্রাম, রংপুর, ঠাকুরগাও ও দিনাজপুর এলাকায় সবজি আবাদ ও উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিকল্পিভাবে আরো আধুনিক প্রযুক্তি অনুযায়ী চাষাবাদ করা হলে যশোরের সবজি অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিরাট ভুমিকা রাখতে পারবে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, সবজি চাষীরা বছরের বারোমাসই শাক-সবজি উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি করলেও তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। তাদের উপযুক্ত মূল্য পাওয়ার কোন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়নি। পাইকারী বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয় না কখনো। নিত্যনতুন কৌশলে ফুলকপি, সিম, পটল ও বেগুনসহ সবজির আবাদ ও উৎপাদনে বিপ্ল­ব ঘটেছে। হাওড় ও পানিবদ্ধ এলাকাতেও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সবজি উৎপাদন করতে পারদর্শী হয়েছেন চাষীরা। সুত্রমতে, মাঠের দাম আর বাজার দামের বিরাট পার্থক্য ঘোচানোর ব্যবস্থা খুবই জরুরি। চাষীদের কথা, সবজি বিপ্লবের সুফল পাচ্ছি না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাঠচিত্র তুলে ধরে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক জানান, দেশের মোট চাহিদার ৬৫ ভাগ সবজি সরবরাহ হয় এই এলাকা থেকে। শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার জন্য চাষীরাও প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন। উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টির পরও অনেক সবজি চাষীকে পরবর্তী আবাদ করার জন্য অর্থকষ্টে পড়তে হয় অনেক সময়। মধ্যস্বত্বভোগীদের লাগাম টেনে ধরার ব্যবস্থা না নেওয়ায় সবিজর বাম্পার ফলনের সুফল উৎপাদন চাষী ও ভোক্তারা পাচ্ছেন না। সমস্যাগুলোর সমাধান হলে সবজি আবাদ ও উৎপাদনে আরো গতি সৃষ্টি হতো।