পথশিশুদের স্বপ্নের আবাস জরুরি রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র

কাগজ টোকাই, ভাঙারি টোকাই। এই কয়দিনে এইগুলা বেইচা ৯০০ টাকা জমাইছি। মায়ের বাসাভাড়া এক হাজার টাকা। আর একশ টাকা হইলেই মায়েরে দিয়া আসুম।’Ñ এটুকু বলে থামল শাহিন সরদার। বয়স তার ১১ কি ১২ বছর। কথা প্রসঙ্গে জানা যায়, বাবা নেই তার। মা আধাপাগল, মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। ইচ্ছে হলে কাজে যায়, ইচ্ছে না হলে যায় না। মা-বাবার স্নেহ-ছায়া-শাসনে আরও দশটি শিশু যেভাবে বেড়ে ওঠে, সঙ্গত কারণেই শাহিন সেভাবে বেড়ে ওঠেনি। শৈশব থেকেই সে চলেছে নিজের ইচ্ছেমতো। তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল ‘জরুরি রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্র’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। বরিশাল সদরে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শাহিনের মতো পথশিশুদের রাতে থাকার পাশাপাশি তিনবেলা খাবরের ব্যবস্থা করা হয়। পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় রেখে করা হয় পাঠদানও।মা-বাবার সূত্রে তার ঠিকানা জানতে চাইলে মনে করার চেষ্টা করে শাহিন। বলে, কেরানিগঞ্জে একটা বাসস্ট্যান্ড আছে না, হেইডার কাছেই ছিল বাসা। সদরঘাটে বড় হইছি।

উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে একবার একটি লঞ্চে ওঠে পড়ে শাহিন। পৌঁছে যায় বরিশাল। সে লঞ্চ টার্মিনালেই বেশ কিছুদিন রাত্রিবাস। ইতোমধ্যে এক বন্ধুর মাধ্যমে সে জানতে পারে আশ্রয়কেন্দ্রটি সম্পর্কে। এর পর এক সন্ধ্যায় উপস্থিত হয় জরুরি রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্রে।ওই কেন্দ্রেই শাহিনের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন সে জাতীয় স্মৃতিসৌধ আঁকছিল। বড় হয়ে কী হতে চাও? জানতে চাইলে পথে-পথে বেড়ে ওঠা শিশুটির দুচোখ স্বপ্নময় হয়ে ওঠে। বলে, পুলিশ হতে চাই। নেশাখোরদের ধইরা জেলে ঢুকাব। পুলিশের অনেক ক্ষমতা।পাশে বসে সবুজ জমিনে লাল সূর্যখচিত জাতীয় পতাকা আঁকছিল জাভেদ। সে বলে, আমি বড় হয়ে একটা লঞ্চের মালিক হতে চাই। কারণ? আনুমানিক ১০ বছর বয়সী এ বালকের ব্যাখ্যা, অনেক টাকা লাভ হয়। তখন আর ভাঙারি টোকাইতে হইবো না। টাকা থাকবো। আমি পড়ালেখা করব।চাঁদপুর হয়ে লঞ্চে চড়ে তিন বছর আগে বরিশাল লঞ্চঘাটে নেমেছিল জাভেদ। বাড়ি নোয়াখালী। মা নেই। বাবা বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। বাবার সঙ্গে না থাকার কারণ জানতে চাইলে বলে, আমি মনে হয় বাবাকে চিনব না। বাবাও আমাকে চিনবে কিনা, জানি না। ছোটবেলায় কেমনে কেমনে যেন এইখানে চইলা আইছি।জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে বরিশাল সদরে ইউনিসেফের অর্থায়নে অপরাজেয় বাংলা নামের একটি সংগঠন এই আশ্রয়কেন্দ্রটি পরিচালনা করে আসছে। রোজ ৫০ থেকে ৬০টি পথশিশু এখানে রাত্রিযাপন করে।শাহিন, জাভেদ, সুমন, আল আমিন, আতিক, সাইফুলÑ এমন কত নাম, কত শিশু। দূসর বর্তমানে দাঁড়িয়ে তারা প্রত্যেকেই রঙিন ভবিষ্যতের জাল বুনছে। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে সন্ধ্যার পর তারা আসে এ আশ্রয়কেন্দ্রে, তাদের স্বপ্নের আবাসে। রাতে তাদের বয়স ও মেধা বিবেচনায় পাঠদান করা হয়। পাশাপাশি খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষারও ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।আশ্রয়কেন্দ্রের ম্যানেজার গাজী শামছুল আরেফীন আমাদের সময়কে বলেন, ওদের পথশিশু বলা হয়। আসলে আমরাও ওদের ‘পথে’ আনতে চেষ্টা করি, সঠিক পথে। রাতে ওরা এখানে থাকার পাশাপাশি লেখাপড়ার সুবিধা পাচ্ছে। নয়তো রাস্তায় রাত্রিযাপন করতে হতো। তখন নেশা বা ছিনতাইসহ অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকত।তিনি জানান, প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের পর যার-যার সামর্থ্য অনুসারে ওদের স্কুলে ভর্তি করানো হয়। পাশাপাশি ওদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মা-বাবা যদি না-ও থাকে, স্বজনদেরও তো দায়িত্ব থাকে। আমাদের চেষ্টা থাকে পথের শিশুটিকে পরিবারে ফেরানো।পরিবারেই শুধু নয়, জীবনে ফেরার স্বপ্ন শাহিন, জাভেদদের চোখে। সে স্বপ্ন বাস্তবের ফুল হয়ে ফুটুক তাদের জীবনের উঠোনে।