অটোমেশনের আওতায় আসছে ৩৭ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

যেখানে সেখানে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে যেমন ইচ্ছে তেমন করে জবাবদিহিতা ছাড়া শিক্ষা বাণিজ্য করার দিন শেষ। দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের বহু বছরের দাবি ও সুপারিশ অনুসারে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে অটোমেশনের আওতায় আসছে সরকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরসহ (ডিআইএ) দেশের প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিমুহূর্তে হবে মনিটরিং। তৈরি করা হচ্ছে সফটওয়্যার। যেখানে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য থাকছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্যসংবলিত স্বতন্ত্র ওয়েবপেজ। এর মাধ্যমে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কোন প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানা যাবে এক ক্লিকেই।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পথে প্রধান বাধা হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যদি প্রতিমুহূর্তে নজরদারি ও পরিদর্শনের আওতায় আনা যায় কেবল তাহলেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর ইতোমধ্যেই মান্ধাতা আমলের ব্যবস্থাকে ঝেরে ফেলে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এনেছে অধিকাংশ কার্যক্রম। এনালগ পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে প্রযুক্তির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা সংক্রান্ত সকল কাজে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরসহ (ডিআইএ) দেশের প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনতে দিনরাত কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ একঝাক চৌকস কর্মকর্তা। জানা গেছে, মাত্র সাত দিনে অডিট করা সম্ভব হবে দেশের প্রায় ৩৭ হাজার ৬৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আগামী মাসেই একসঙ্গে অডিট করার উদ্যোগ ডিআইএ। যার নাম দেয়া হয়েছে পেয়ার ইন্সপেকশন সপ্তাহ। কর্মকর্তারা বলছেন, এত কম সময়ে এতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান অডিট করে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে ডিআইএ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেয়ার ইন্সপেকশন সপ্তাহের ডাক টিকেট অবমুক্ত করার সম্মতি দিয়েছেন। সে আলোকেই পেয়ার ইন্সপেকশন সপ্তাহ পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এই অডিট চালু হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক, প্রশাসনিক এবং আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের পরিচালক অধ্যাপক আহম্মেদ সাজ্জাদ রশীদ বলছিলেন, আমরা চাই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসতে। বর্তমান সরকারের মাধ্যমে দেশের ১৬ কোটি মানুষ আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদ পাচ্ছে। আমরা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের অধীন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মনিটরিং ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসার কাজ করছি। যেখানে সেখানে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে যেমন ইচ্ছে তেমন করে জবাবদিহিতা ছাড়া কেবল মানহীন শিক্ষা দেয়া যাবে না। দেশের যে কেউ যে কোন স্থানে বসে যাতে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা জানতে পারে সে লক্ষ্যেই আমাদের কাজ চলছে। অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরসহ দেশের প্রায় ৩৬ হাজার ৬৮৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ লক্ষ্যে তৈরি করা হচ্ছে সফটওয়্যার।

যুগ্ম পরিচালক বিপুল চন্দ্র সরকার নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছেন সামনে থেকে। তিনি বলছিলেন, আমাদের টার্গেট মানসম্মত ও জবাবদিহিতাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি নিশ্চিত করা গেলেই আমরা পাবো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর ঐকান্তিক চাওয়া হচ্ছে দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা। আমরা ইতোমধ্যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষার কাজকে অনেক উন্নত পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এখন কাজ হচ্ছে দ্রুত ও মানসম্মত। তবে আমরা শীঘ্রই প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ছাড়াও অধিদফদরের কাজকে নিয়ে আসছি অটোমোশনের আওতায়। এ লক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে সফটওয়্যার। যেখানে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য থাকছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংবলিত স্বতন্ত্র ওয়েবপেজ। এর মাধ্যমে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কোন প্রতিষ্ঠানের তথ্য যানা যাবে এক ক্লিকেই।

পেয়ার ইন্সপেকশনের বিষয় যুগ্ম পরিচালক বলেন, পেয়ার ইন্সপেকশন করার সব প্রক্রিয়া শেষ। ৭ দিনে দেশে সব প্রতিষ্ঠান অডিট হবে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষে প্রতিষ্ঠানের তথ্য আপলোড করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য আপলোড করেছি। বাকি তথ্য পর্যায়ক্রমে করা হবে। তিনি বলেন, এই অডিট বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে আসবে। এখানে কোন তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই। কেউ গোপন করলেই সঙ্গে সঙ্গে ধরা খাবে।

একই কথা বলছিলেন প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক মোঃ রাশেদুজ্জামান ও সৈয়দ জাফর আলী। তারা বলছিলেন, আসলে আমাদের কাজের বিশাল একটি অংশ ইতোমধ্যেই আধুনিকায়ন হয়ে গেছে। তবে ৩৬ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান অটোমেশনের আওতায় আনার পর দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ধরনই পাল্টে যাবে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পথে এটি হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু কি কি কাজে মান্ধাতা আমলের ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল হয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে?

প্রতিষ্ঠানটির পরিদর্শন ড. এনামূল হক ও খন্দকার আশরুফুল আলমে মতে যুগের পর যুগ ধরে চলা মান্ধাতা আমলের পরিদর্শন ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে ইতোমধ্যেই। জাতীয় তথ্য বাতায়নের অধীনে ওয়েবসাইট নির্মাণ হয়েছে। সকল কর্মকর্তার জন্য পদবি অনুযায়ী ওয়েব মেইল প্রস্তুত ও ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। অধিদফতরের আছে নিজস্ব ফেসবুক ও ইউটিওব চ্যানেল। ই নথি বাস্তবায়ন হয়েছে ইতোমধ্যেই। পিয়ার ইন্সপেকশনও চলমান। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই সুবিধা নিশ্চিত করে কাজ চলছে। সকল ফরম আছে অনলাইনেই। অনলাইনে অভিযোগ দাখিল ও অনলাইন গণশুনানি হচ্ছে ভিডিও কনফারেন্সে, যা প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করতে পেরেছে ডিআইএ।

তবে কেবল কর্মকর্তাই নয়। শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল পরিবর্তন হয়েছে মান্ধাতা আমলের অধিকাংশ কাজেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা এবং তদন্ত কোন গতানুগতিক কাজ নয়। এ কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল। এ কাজের সুফলভোগী দেশের সকল মানুষ এবং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে কাজের পরিধি ও পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম। এসব বিষয়কে মাথায় রেখেই দিয়ে এ কাজ পরিচালনার জন্য ডিআইএর কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনাসহ সার্বিক কার্যক্রমকে মূলত আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজড করা হয়েছে এর কার্যক্রম। জানা গেছে, ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠালগ্নে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এর আওতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ৭ হাজার ৫০০। বর্তমানে এ সংখ্যা ৩৬ হাজারেরও বেশি। জনবল কম হওয়া সত্ত্বে বিগত ২ অর্থবছরে এপিএ ১০০ ভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।

রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরা তাদের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলছিলেন, আগে প্রতিষ্ঠানটির ভ্রমণসূচীর আদেশের সঙ্গে পরিদর্শন বিবরণী ও সংযোজনীসমূহ ডাকযোগে প্রেরণ করা হতো। তখন অনেক প্রতিষ্ঠান উক্ত চিঠি পেত না। পেলেও অনেক দেরি হতো এবং সংযোজনীসমূহে কিভাবে কাজ করতে হবে তা বুঝতে পারত না। কিন্তু এখন পরিদর্শন প্রোগ্রাম এবং সংযোজনী/ফরমসমূহ ডিআইএর ওয়েবসাইটে আপলোড থাকায় এবং পরিদর্শন প্রোগ্রামসমূহ ই-মেইলের মাধ্যমে প্রেরণ করার কারণে পরিদর্শন সহজে পেয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সহজে দ্রুত কাজ করতে পারছে।

অটোমেশনের বিষয়টিকে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে বলছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর পর প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পর্কে সরকারের সর্বশেষ তথ্য জানার কোন সুযোগ থাকে না।

তবে এবার পরিস্থিতি পাল্টেছে। ডিআইএ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আসলে প্রতি মুহূর্তে দেশের যে কোন প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যাবে, যা সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা হাতের নাগালে চলে আসবে বলেও আশা করছেন কর্মকর্তারা।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জাল সনদ ও এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে বলেছেন, আগে শিক্ষক-কর্মচারীদের জাল সনদের তথ্য যাচাই করা হতো না। জাল সনদের বিষয়ে ব্যাপক অভিযোগ থাকায় সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ বিভিন্ন জাল সনদ ব্যাপকভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। গত ৫ বছরে ৫৪৬টি জাল সনদ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের চাকরি বাতিলসহ ১৯ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ২৭৯ টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে সরকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মনিটিরিং কাজকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন দেশের শিক্ষাবিদসহ শিক্ষকরা। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শেখ ইকরামূল কবির বলছিলেন, যে কোন দেশের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই জবাবদিহিতাপূর্ণ ভালমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দরকার। যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কোন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না যায় তাহলে ভাল শিক্ষাও নিশ্চিত করা যাবে না।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম যদি আধুনিকায়ন হয়, যদি অটোমেশনের আওতায় আসে তাহলে এটি অনেক বড় একটা কাজ হবে। প্রতিমুহূর্তে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদ বাধ্য হবে শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে। শিক্ষকদের উপস্থিতি থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের কাজে নজরদারি বাড়লে ভাল মানের শিক্ষা আমরা দিতে পরব আমাদের নতুন প্রজন্মকে।