এক দশকে স্থলবন্দরে আয় বেড়েছে তিন গুণের বেশি

দেশের স্থলবন্দরগুলোতে গত ১০ বছরে আয় বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। এই আয় যাতে আরো বাড়ে এ জন্য স্থলবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরো বাড়াতে অন্তত তিনটি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের (বাস্থবক) প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থলবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়াতে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্থলবন্দরগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা ও ভারতীয় অংশে অবকাঠামো উন্নয়ন। পাশাপাশি স্থলবন্দরগুলো দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ পেতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাস্থবকের প্রতিষ্ঠালগ্নের সাংগঠনিক কাঠামোতে ২৮৯টি পদ ছিল। বর্তমানে রয়েছে ৩৪৫টি পদ। এই জনবল আরো বাড়ানোর প্রস্তাব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য মতে, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাস্থবকের আয় ছিল ৩৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, ব্যয় ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ লাভ ছিল ১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাস্থবকের আয় ছিল ১১১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, ব্যয় ৫৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; লাভ ৫৮ কোটি তিন লাখ টাকা।

গত ১০ অর্থবছরের মধ্যে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই অর্থবছরে দুই কোটি টাকার চেয়ে কম লাভ হয়েছে। আর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে উল্টো সংস্থার সাত লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে লাভ ছিল মাত্র এক কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বাস্থবক ২০০৯-১০ অর্থবছরে সাত কোটি ২৩ লাখ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে আট কোটি ৮২ লাখ টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১০ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা লাভ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্থলপথে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রিজিওন্যাল কানেকটিভিটি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ৮৮৫ কোটি ১০ লাখ টাকার সাতটি প্রকল্পের কাজও চলমান রয়েছে। আর প্রায় এক হাজার ৬৮৭ কোটি ৪২ লাখ টাকার নতুন পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো হচ্ছে ৬৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে গোবড়াকুড়া-কড়ইতলী স্থলবন্দর উন্নয়ন, ৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিলোনিয়া স্থলবন্দর উন্নয়ন এবং ৭১ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে ধানুয়া-কামালপুর স্থলবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। এ তিনটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া বেনাপোলে ১৮১ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে কার্গো ভেহিকল টার্মিনাল নির্মাণের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) এবং একই স্থলবন্দরে এক হাজার ৩২১ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে হেভি স্টেকইয়ার্ড, খালি ট্রাক ও আমদানীকৃত চেসিস রাখার জন্য পৃথক টার্মিনালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর নির্মাণের প্রি-ডিপিপি (প্রাক-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বাস্থবক কমিটিকে জানিয়েছে, স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সরকার অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর আওতায় ইতিমধ্যে বেনাপোলে একটি আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ও একটি আন্তর্জাতিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। গত জুনে তা উদ্বোধন করা হয়। ৬৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে তামাবিল স্থলবন্দর উন্নয়নের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় বেনাপোল ও বুড়িমারী স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। সোনাহাট স্থলবন্দর উন্নয়নের জন্য ৩৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ আগামী বছরের জুনে শেষ হবে। বিশ্বব্যাংক ও সরকারের নিজস্ব অর্থে শেওলা, ভোমরা, রামগড় স্থলবন্দরের অবকাঠামো এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ৬৩০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বাল্লা স্থলবন্দর উন্নয়নে অনুমোদন পাওয়া ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এ ছাড়া ঢাকায় বাস্থবকের প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণে সাড়ে ৩৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।

সংসদীয় কমিটিকে আরো বলা হয়েছে, বাস্থবক স্থলপথে আমদানি-রপ্তানি কাজে সহায়তার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ উন্নয়ন, পণ্য হ্যান্ডলিং ও সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সুবিধাজনক ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব্বে অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ ও সাশ্রয়ী সেবা প্রদান করতে চায়। তারা জানিয়েছে, আমদানি-রপ্তানি গতিশীল রাখতে গত ১ আগস্ট থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছে। এই স্থলবন্দরে নজরদারি ক্যামেরা বসানোর কাজও শুরু হয়ে গেছে। একই সঙ্গে নেওয়া হয়েছে এ বন্দরের কার্যক্রম অটোমেশনের উদ্যোগ।

বাস্থবক চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী জানিয়েছেন, স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগামীতে এ কার্যক্রম আরো বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট সুবিধা প্রদান বা মোটরযান চুক্তির আওতায় অদূর ভবিষ্যতে স্থলপথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকারি রাজস্বের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।

এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্য তালুকদার আব্দুল খালেক কালের কণ্ঠকে জানান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে সব স্থলবন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ বা আধুনিকায়নের জন্য কর্মকৌশল ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কমিটির পক্ষ থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ১৭ বছর আগে ২০০১ সালের জুনে যাত্রা শুরু করা বাস্থবকের আওতায় ২৩টি স্থলবন্দর রয়েছে। বর্তমানে বাস্থবকের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ২৬১ দশমিক ৭৩৭২ একর। বন্দরগুলোতে সাত হাজারের অধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।