এক বছরে রেলের আয় বেড়েছে ৪শ’ কোটি টাকা

যাত্রীসেবা ও পণ্য পরিবহনে ক্রমবর্ধমান হারে আয় বাড়ছে রেলওয়ের। রেলের হিসাব বিভাগের তথ্যমতে, শুধুমাত্র গত এক অর্থ বছরের রেলের আয় বেড়েছে প্রায় ৪ শত কোটি টাকা। এর মাধ্যমে যে কোন সময়ের রেকর্ড ভেঙ্গেছে রেলওয়ে। এর মাধ্যমে পুরনো অবস্থা থেকে বেরিয়ে রেলের দুর্নাম ঘুচিয়ে সম্পূর্ণরূপে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পরিবহন সেবা খাতের সরকারী এ সংস্থাটি। গত দুই অর্থবছরের মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আয় হয় ৯শ’ ৪ কোটি ১ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩শ’ ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আগের বছরের চেয়ে শতকরায় যা দাঁড়ায় ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নতুন নতুন রুটে ট্রেন সার্ভিস চালু, ভাড়া বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি কোচ সংযোজন, নতুন আন্তঃনগর তিনটি ট্রেন সার্ভিস চালু, নতুন ইঞ্জিন আনা, গন্তব্যে পৌঁছার সময় আগের চেয়ে অনেক কমে আসা, স্টেশন থেকে সময়মতো ট্রেন ছাড়া ও গন্তব্যে পৌঁছানো, রেলপথের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন, যাত্রীসেবার মান বাড়ানো, টিকেটের মূল্য বৃদ্ধিসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন পর এই আয়ের হার বেড়েই চলছে। এর ফলে ক্রমান্বয়েই বাড়ছে রেলের আয়। এছাড়া গত অর্থবছরে রেলের বেশ কয়েকটি বৃহত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প চালু হওয়ায় রেলের আয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।

সংস্থাটির হিসাব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রেলের মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৯শ’ ৪ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় বেড়েছে ৩শ’ ৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রেলের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে তিনটি নতুন ট্রেন সার্ভিস চালুর পাশাপাশি কোচ আমদানির মাধ্যমে কোচ সংযোজনের মাধ্যমে সেবার পরিসর বাড়ানোয় প্রতিষ্ঠানটির আয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত রেলওয়ের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বার্ষিক আয় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বেশি আয় বেড়েছে যাত্রী পরিবহন খাতে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেলের যাত্রী পরিবহন খাতে আয় ছিল ৫শ’ ৩৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। সেখান থেকে প্রায় ২শ’ কোটি টাকা বেড়ে গত অর্থবছর তা দাঁড়ায় ৭শ’ ১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। এছাড়া পণ্য পরিবহন খাতের আয় ৮৭ কোটি ৪৬ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২শ’ ৬৪ কোটি ১৪ লাখ টাকায়। বিবিধ খাতের আয় ২০১৫-১৬ অর্থবছর ছিল ১শ’ ৩০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সেখান থেকে গত অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২শ’ ৬৪ কোটি ১৪ লাখ টাকায়। এ সময় পার্সেল খাতে আয় ২ কোটি ২৯ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ১৩ লাখ টাকায়।

আয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানা গেছে, পূর্বে আন্তঃনগর ট্রেনসমূহে কোচের সংখ্যা কম ছিল। আরামদায়ক ও নিরাপদ পথ হিসেবে যাত্রীদের ব্যাপক আগ্রহ ও চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা শুধুমাত্র কোচ সঙ্কট থাকায় রেলপথে ভ্রমণ করতে পারতেন না। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে ২২০টি কোচ দেশের বিভিন্ন রুটে চলমান আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর সঙ্গে যোগ করায় ট্রেনে যাত্রী ধারণক্ষমতা বেড়েছে। ফলে যাত্রী চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় রেলের আয় তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রেলসূত্র জানায়, ইন্দোনেশিয়া থেকে ১শ’ টি মিটার গেজ কোচ এবং ভারত থেকে ১শ’ ২০টি ব্রডগেজ কোচ আমদানির মাধ্যমে দীর্ঘবছর পর ট্রেনে নতুন করে কোচ সংযোজন শুরু হয়। এছাড়া পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস চালু করা হয়। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ রুটের আন্তঃনগর ট্রেনে নতুন কোচ সংযোজনের পর পুরনো কোচগুলো অন্যান্য ট্রেনে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া আন্তঃনগর ট্রেনের বেশকিছু কোচ ওয়ার্কশপে মেরামত বা সংস্কার করে ও টাইপ পরিবর্তনের মাধ্যমে দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেনে সংযোজন করা হয়। ফলে যাত্রী চলাচল বেশি করতে পেরেছে।

তথ্যমতে, গত অর্থবছরে রেলের আয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চলতি বছরের জুনে। অর্থবছরের শেষ মাসে পুরনো বকেয়া সংগ্রহ হওয়ায় মাসভিত্তিক আয়ের ক্ষেত্রে জুন মাসেই সবচেয়ে বেশি আয় হয়। এ মাসে সংস্থাটির মোট আয় হয়েছে ২শ’ ৩৯ কোটি ৯৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জুলাইয়ে রেলের মোট আয় ছিল ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। যা মাসভিত্তিক সবচেয়ে কম আয় হয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক আয়ের হিসাবে দেখা যায়, গত অর্থবছরে পশ্চিমাঞ্চলের তুলনায় পূর্বাঞ্চল বেশ এগিয়ে ছিল। রেল সংশ্লিষ্টরা জানান, সেবা পরিধি বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুর আইসিডির মাধ্যমে কন্টেনার, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য পরিবহনের সুযোগ বেশি থাকায় পূর্বাঞ্চল রেলের আয় তুলনামূলক বেশি। তথ্যমতে, গত অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলের আয় হয়েছে ৮শ’ ৩৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর মধ্যে যাত্রী খাতের আয় ছিল ৪শ’ ৭৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যাত্রী ছাড়া (পার্সেল) আয় ১১ কোটি ৭৮ লাখ, পণ্য পরিবহনে ১শ’ ১৯ কোটি ৬০ লাখ ও বিবিধ খাতে আয় হয়েছে ২শ’ ২৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। একই সময় পশ্চিমাঞ্চল রেলে মোট আয় হয়েছে ৪শ’ ৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে যাত্রী খাতে ২শ’ ৩৭ কোটি ২৩ লাখ, পার্সেল আয় ৭ কোটি ৩৫ লাখ, পণ্য পরিবহনে ১শ’ ৪৪ কোটি ৫৩ লাখ ও বিবিধ খাতে ৭৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কোচ ও ইঞ্জিন সরবরাহ আরও বাড়ানো গেলে রেলওয়েকে অতি দ্রুত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব। মূলত অপর্যাপ্ত কোচ ও ইঞ্জিন আমদানির কারণে চাহিদা অনুযায়ী যাত্রীসেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সবগুলো ট্রেনে পর্যাপ্ত সংখ্যক কোচ ও চাহিদামাফিক ইঞ্জিনের ব্যবস্থা করা গেলে আয় দ্রুত আরও বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া সেবাপরিধি বাড়ানোর চলমান প্রক্রিয়া ধরে রাখা গেলে রেলের আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য কমে আসবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, যাত্রীসেবা বৃদ্ধি করতে রেলওয়ের উন্নয়নে নতুন নতুন রুটে ট্রেন সার্ভিস চালু, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি নতুন নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংযোজন, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে নতুন আন্তঃনগর তিনটি ট্রেন সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এছাড়া গন্তব্যে পৌঁছার সময় আগের চেয়ে অনেক কমে আসা, স্টেশন থেকে সময়মতো ট্রেন ছাড়া ও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো, রেলপথের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন, যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর ফলে রেলওয়ের আয় আগের চেয়ে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। ফলে গত এক বছরের ব্যবধানেই প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা বেশি আয় করা সম্ভব হয়েছে। গত দুই অর্থবছরের মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আয় হয় ৯শ’ ৪ কোটি ১ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩শ’ ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে শতকরা ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। যাত্রী ও পণ্যপরিবহন উভয় খাতেই আয় বেড়েছে। আয় আরও বাড়াতে রেলের জমিতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

মহাপরিচালক বলেন, রেলওয়ে একটি সম্পূর্ণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। বিএনপি সরকারের আমলের সেবার পরিবর্তে রেলওয়ের উন্নয়ন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেলওয়ে আয়ও অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেল খাতের উন্নয়নে বিশেষ নজর দেয়। রেলের উন্নয়নে একের পর এক বৃহৎ আকারের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে ও বাস্তবায়ন করতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে গত কয়েক বছর এর সরাসরি প্রভাব পরেছে। বর্তমানে রেলওয়ের উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ও চলমান সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে অতি দ্রুত রেলওয়েকে পরিবহন খাতে অন্যতম সেবাদানকারী সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে যাত্রীসেবার মান ও কলেবর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। এজন্য তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।