দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতেই হবে

সমকাল :আপনি বলেছিলেন, ২০১৭ সাল হবে দুর্নীতিবাজদের জন্য আতঙ্কের বছর। বছরটি শেষ হতে যাচ্ছে। বাস্তব চিত্র কী?

ইকবাল মাহমুদ : ঘুষখোরদের মাঝে আতঙ্ক সৃস্টি করতে চেয়েছি এবং সেটা হয়েছে। ফাঁদ পেতে (ট্র্যাপ) ২২ জন ঘুষখোরকে ধরা হচ্ছে, চালু করা হয়েছে ‘হটলাইন ১০৬’। ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিন। অনেক ক্ষেত্রে জনগণ চোখ রাখছে ঘুষখোরদের ওপর। এসব কারণে এই বছরে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন কমে এসেছে।

সমকাল :বর্তমান কমিশনের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে গ্রেফতার অভিযান। বহুসংখ্যক অভিযুক্ত এখনও গ্রেফতার হয়নি। তাদেরকে কবে ধরা হবে?

ইকবাল মাহমুদ :বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর এ পর্যন্ত ৫৬৫ জন অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছে। দুর্নীতি করলে কেউ রেহাই পাবে না- গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আমরা এই বার্তাটি দিতে চেয়েছি। যারা দুর্নীতি করবে তাদের ঠাঁই হবে কারাগারে। যারা গ্রেফতার হয়নি তাদেরকেও ধরার জন্য খোঁজা হচ্ছে।

সমকাল :দুর্নীতি মামলার অভিযুক্তদের শতভাগ সাজা হয় না কেন? এ ক্ষেত্রে দুর্বল দিক কী?

ইকবাল মাহমুদ : দুর্নীতি মামলার সাজার হার বেড়ে ৬৫ শতাংশ হয়েছে। আগামী বছর শতভাগ সাজা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। প্রায়শই দুর্বল চার্জশিট ও আদালতে সাক্ষীদের হাজির করতে না পারায় অভিযুক্তরা ছাড়া পাচ্ছে। বিচারিক কাজে দুদকের তৎপরতা জোরদার করা হচ্ছে।

সমকাল :দুর্নীতি দমনে ‘হটলাইন ১০৬’ চালু দুদকের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। কী রকম সাড়া পাচ্ছেন?

ইকবাল মাহমুদ :’হটলাইন ১০৬’ চালুর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। দেশের মানুষ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছিল না। ১০৬ কথা বলার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়েছে। হটলাইনে অভিযোগ থেকে এ পর্যন্ত ফাঁদ পেতে পাঁচজন ঘুষখোর ধরা হয়েছে। অডিট, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিআরটিএসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। গত ২৭ জুলাই থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত হটলাইনে চার লাখ সাত হাজার কল এসেছে।

সমকাল :আপনি দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি কমবে বলে মানুষ আশাবাদী হয়েছিল। এই প্রত্যাশা পূরণে কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন?

ইকবাল মাহমুদ :মানুষ আশাবাদী- এটা আমাদের কাজের প্রেরণা। আশা আছে বলেই প্রতিদিন শত শত মানুষ ফোন করছে। তাদের প্রতিটি কথা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়।

সমকাল :সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বন্ধে কমিশনের নানা পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রে সমস্যা কী?

ইকবাল মাহমুদ : সরকারি কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (ডিসক্রিশনারি পাওয়ার) অপব্যবহারে অনিয়ম, দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে। এই ক্ষমতা কমাতে কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করেছে। স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা জিরোতে আনা হলে দুর্নীতি কমবে। যে কোনো ফাইলের বিষয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা থাকলেও সেটি করা হচ্ছে না। মন্ত্রণালয়, দপ্তরের সচিব ও যুগ্ম সচিব, কাস্টমস, পুলিশ, ইনকাম ট্যাক্স, ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা রয়েছে।

সমকাল : দুর্নীতি বন্ধে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি আছে কি?

ইকবাল মাহমুদ :দুর্নীতি দমনে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা বৈঠকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলেছেন। এরপর দুদকের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা থাকার কোনো কারণ নেই।

সমকাল :দুর্নীতির উৎস বন্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?

ইকবাল মাহমুদ :দুর্নীতি কোথায় হয়, কীভাবে হয়, কারা দুর্নীতি করে- এসবই আমাদের জানা। আমরা দুর্নীতির উৎস বন্ধ করতে চাই। দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার আগেই তা বন্ধ করতে কাজ শুরু করেছি। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরের কাজের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কথা বলছি।

সমকাল :কোচিং বাণিজ্য বন্ধে আপনাদের অভিযান চলছে। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

ইকবাল মাহমুদ :শিক্ষার্থীদের কোচিং পড়াকে ‘ক্যাপসুল লেখাপড়া’ উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, সীমিত জ্ঞানের এই বাণিজ্যিক লেখাপড়া বন্ধ করা হবে। কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত শিক্ষক ও কোচিং সেন্টার মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। ২০১৮ সালে কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের জন্য দুদক হবে আতঙ্কের নাম। কোচিংবাজদের বিরুদ্ধে কমিশনের সর্বাত্মক কার্যক্রম চালু করা হবে।

সমকাল :শিক্ষকদের অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি?

ইকবাল মাহমুদ :পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের উত্তীর্ণ করা হচ্ছে। এটি করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষার মান ধ্বংস করা হচ্ছে। ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের উত্তীর্ণের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষার খাতা সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। এটা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সমকাল :অভিযোগ আছে যে, দুদকের ভেতরেই দুর্নীতি। এ সমস্যার সমাধান কী?

ইকবাল মাহমুদ :দুদক কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কমিশন কঠোর নীতি অনুসরণ করছে। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদেরকে বাড়ি পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে সাতজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বদলি করা হয়েছে ৭-৮ জনকে। আরও কিছু কর্মকর্তা নজরদারিতে রয়েছে।

সমকাল :দুদক আইনে কোনো দুর্বল দিক আছে কি?

ইকবাল মাহমুদ :একসময় মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত সব অপরাধ দুদকের তফসিলভুক্ত ছিল। সম্প্রতি মানি লন্ডারিং আইন সংশোধন করে অপরাধগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ, এনবিআর, সিআইডি ও দুদকের তফসিলভুক্ত করা হয়। এরই মধ্যে আদালতের এক রায়ে মানি লন্ডারিং বিষয়ক সব অপরাধ দুদকের কার্যক্রমের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কমিশন থেকে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। মানি লন্ডারিং আইনের বিধিমালার খসড়াও পাঠানো হয়েছে।

সমকাল :সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপ্রবণ খাত কোনটি? ওইসব খাত দুদকের নজরদারিতে আছে কি?

ইকবাল মাহমুদ :ফ্ল্যাট ও জমি রেজিস্ট্রেশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ফি ফাঁকি দিতে ক্রেতা, বিক্রেতা যোগসাজশে ফ্ল্যাট ও জমির প্রকৃত মূল্য গোপন করছে। অনুপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে এই খাতে। উদাহরণ হিসেবে বলেন, এক কোটি টাকা মূল্যের জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় ২০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হচ্ছে।

সমকাল :গত দুই বছরেও আলোচিত বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হয়নি কেন?

ইকবাল মাহমুদ :ব্যাংকটির লোপাট হওয়া টাকা কীভাবে, কোথায়, কার কাছে গেল- তার প্রমাণ সংগ্রহের কাজ এখনও শেষ হয়নি। এ কারণে মামলাগুলোর চার্জশিট আদালতে পেশ করা সম্ভব হয়নি। বিচার কার্যের জন্য ওইসব প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্রেডিট কমিটির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন বোর্ড ঋণ প্রস্তাবগুলোর অনুমোদন দিয়েছে- এ বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনে করলে বোর্ড সদস্যদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। অপরাধী যেই হোক না কেন- কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।