হাটে উঠছে নতুন ধান

তিন বিঘা জমিত ধান লাগাছিনু, বানের পানি হামার জমিতও উঠিছিলো। ক্ষতি যা হোছে তা হছেই। চাঁচে মুছে যা পাওয়া যাছে তাই লিয়া এ্যকোন শুকুর গুজার করোছি। কথাগুলো বলছিলেন রানীনগরের কৃষক বছির উদ্দীন। এবার রোপা-আমনের সময় নওগাঁ জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ধানী জমির পরিমাণ ৩৮ হাজার ৪শ’ ৩১ হেক্টর। এখনো মাঠে মাঠে ধান ব্যাপক ভাবে কাটা শুরু হয়নি। গত বুধবার কর্তনকৃত ধানী জমির পরিমান শতকরা ২৩ ভাগ। কৃষক জানায়, রোপা আমন চাষে সার, কীটনাশক, জমি প্রস্তুত, ক্ষেত মজুর ও বারবার জমিতে কিটনাশক প্রয়োগে যে খরচ হয়েছে তাতে কুলিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে যাবে। সবে হাট-বাজার গুলোয় ধান উঠতে শুরু করেছে। ফলে দাম একটু চড়া। তবে এক সপ্তাহ বাদেই ওই দামে হেরফের হবে। শুকনো ধানের দামই একটু বেশী পড়ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি সূত্রে জানা যায়, নওগাঁয় এবার রোপা আমন ধান চাষ হয়েছিল ২ লাখ ১৪০ হেক্টর জমিতে। এবার বন্যায় ধানের ক্ষতির জমির পরিমান ৩৮ হাজার ৪শ’ ৩১ হেক্টর। বর্তমান এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৯৯ হেক্টর। এবার প্রতি বিঘা জমিতে ধান আকারে উৎপাদনের পরিমান ধরা হয়েছে সাড়ে ১৬ মন। চাল আকারে ১১ মন। মাত্র ১০ আগে ধান কাটার কাজ শুরু হয়েছে। গত বুধবার পর্যন্ত কর্তনের পরিমাণ ছিল শতকরা ২৩ ভাগ।
সরজমিন দেখা যায়, মাঠে এখনো সব ধান পেকে ওঠেনি। ফলে সোনানী দৃশ্য এখনো নজর কারছেনা। তবে কৃষক-কৃষানী ইতোমধ্যে খলিয়ানসহ নানান আয়োজনে ব্যস্ত নতুন ধান ঘরে তুলতে। যে ক্ষেতের ধানগুলো পাকছে কৃষক সেই ক্ষেত থেকে ধান কাটছে। অনেক মাঠে এখনো কাস্তের শুভক্ষন হয়নি। প্রাকৃতিক কারনে এবার পোকা-মাকড়ে উপদ্রব একটু বেশীই। ফলে প্রতিটা সময় কাটছে কৃষকের দুঃচিন্তায়। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোয় পরবর্তীতে চিনি আতপ ধান চাষ করা হয়েছে। মাঠে এখন সেই ধান সবে মাত্র ফলতে শুরু করেছে। চিনি আতপ ধান বিঘাতে সর্বচ্চো ১২ মন পর্যন্ত উৎপাদন হয়। জেলা জুড়ে জিরাশাইল, পাইজাম, স্বর্ণা-৫, বীনা-৭ সহ নানান জাতের ধান চাষ করা হয়েছে এবার রোপা-আমন মৌসুমে।
মাদেবপুর উপজেলার চোমাশিয়া গ্রামের কৃষক সাজ্জাদ হোসেন মন্ডল বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও আমি ৬ বিঘা জমিতে আমন স্বর্ণা-৫ জাতের ধান লাগিয়েছি। ইতিমধ্যে কিছু ধান কেটে বাজারে নিয়ে মাত্র ৯২০ টাকা দরে প্রতিমন বিক্রি করেছি। ধান চাষে যে পরিমান খরচ পড়েছে সেই হিসেব কষলে লোকসান গুনতে হবে। রাইগাঁ গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম (৪৫) বলেন, ধান চাষে যে পরিমান খরচ পড়েছে বিশেষ করে সার ও বার বার কিটনাশক ব্যবহার করে খরচ বেশী পড়েছে সেই তুলনায় বাজারে ধানের মূল্য কম হওয়ায় লোকসান হচ্ছে। রাইগা গ্রামের আতিকুর রহমান ও একই কথা জানিয়ে বলেন, তাদের মাঠে আতব চিকন জাতের ধানে ব্যাপকহারে মরক ব্যাধি আক্রমণ করেছে। বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক স্প্রে করেও ফল ভাল পাওয়া যাচ্ছেনা। ধান পাকার আগমূহুর্তে পোকার আক্রমনে অনেকেই প্রবাদ গুনছেন।
গতকাল জেলার প্রসিদ্ধ ও বড় ধানের হাট রানীনগর উপজেলার আবাদপুকুর ও ত্রিমোহনী ধানের হাটে গিয়ে দেখা যায়, শুখনো ধানের অমদানী খুবই কম। কৃষক তাঁদের খরচ চালাতে অনেকটাই বাধ্য হয়েই আধা শুকনো ধান হাটে বিত্রির জন্য এনেছেন। তবে ক্রেতার সংখ্য অনেক।
ধান ব্যবসায়ি সালাউদ্দিন খান টিপু বলেন, হাট-বাজারে সবে নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। ব্যাপক হারে ধান ওঠার জন্য এখনো ৮/১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। যে টুকু ধান হাটে কৃষকরা আনছে তা ধান কাটার খরচের টাকার জন্য। যা দিয়ে তারা কৃষি শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য কাজে খরচ করবেন। ফলে শুখনো ধানের জন্য আরো সময় লাগবে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মনোজিৎ কুমার মল্লিক বলেন, গড় উৎপাদনের লক্ষমাত্রা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এ’কদিনে শতকরা ২৩ ভাগ জমির রোপা-আমন ধান কেটেছে কৃষক। বন্যা এবং বন্যার আগে বৃষ্টিতে রোপা-আমন ধান চাষে কৃষকরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েন। বন্যা পরবর্তিতে অনেক কৃষক চিনি আতপ ধান চাষ করেছেন। ওই ধান উঠতে একটু দেড়ি হবে। এছাড়াও বিভিন্ন জাতের ধানের ফলনও পৃথক। কোনাটার ফলন একটু কম কোনিটা ফলন একটু বেশী। এসব মিলে গড় উৎপাদন পেতে একটু সময় লাগবে।