তবু আমনের মাঠে কৃষকের হাসি

রাজশাহী কুড়িগ্রাম দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ধান কাটা শুরু * সরকারি হিসাবে কোথাও লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হয়নি * বাড়তি খরচ হওয়ায় ন্যায্যমূল্য চান কৃষকরা
তবু আমনের মাঠে কৃষকের হাসিবন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দিনাজপুরে কৃষক আমন ধান কাটা শুরু করেছেন। মুখে তাদের হাসি। বিরলের হাসিলা গ্রাম থেকে তোলা ছবি -যুগান্তর
ফসলের মাঠজুড়ে বাতাসে দুলছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন- আমন ধান। বন্যা, ঝড়বৃষ্টি, পোকার আক্রমণ আর নানা রোগবালাইয়ের পরও এবার আমনের বাম্পার ফলনের সুবাস পাচ্ছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। রাজশাহী, বগুড়া, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় কৃষক পরিবারে এখন ধানের মৌ মৌ গন্ধ। ধান কাটা আর মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক-কৃষাণীরা। সরকারি হিসেবে কোথাও এবার আমনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হয়নি। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকরাও দারুণ খুশি। তবে এবার নানা কারণে বাড়তি খরচ হওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ধানের ন্যায্য দাম আশা করেছেন তারা। যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

দিনাজপুর : জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এবার জেলায় মোট দুই লাখ ৫৩ হাজার ৬৮৭ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বন্যার আগেই দুই লাখ ৩২ হাজার ২৮২ হেক্টর জমিতে আমন রোপণ করা হয়। বন্যায় ২৫ হাজার ৪৫৬ হেক্টর জমির আমন ক্ষেত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। পানি নেমে যাওয়ার পর অধিকাংশ কৃষকই নিজস্ব উদ্যোগে আবার কেউ কেউ সরকারি সহযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে পুনরায় আমন চারা রোপণ করেন। এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দুই লাখ ৫৬ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়। ইতিমধ্যেই ধান কাটা শুরু হয়েছে। ফলনও ভালো পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামের কৃষক তুষার কান্তি রায় যুগান্তরকে জানান, শুক্রবার তিন বিঘা জমির বিনা-৭ জাতের আমন ধান কেটে মাড়াই করেছেন। পেয়েছেন বিঘাপ্রতি ২৭ মণ ধান। প্রতি মণ ধান হাটে বিক্রি করেছেন ৮০০ টাকা দরে। এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ২১ হাজার ৬০০ টাকা। তিনি জানান, এবার বন্যা এবং রোগবালাইয়ের কারণে আমন আবাদ করতে তুলনামূলক খরচ বেশি হয়েছে। তাই মণপ্রতি এক হাজার টাকা পেলে ভালো লাভ হতো।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা জানান, এবার আমনের উৎপাদন সাত লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তারা।

কুড়িগ্রাম : সোনালি ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত জেলার কৃষকরা। এখন পর্যন্ত ১০ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান কাটা হয়েছে। এতে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন তিন মেট্রিক টন চাল। এ হিসাবে জেলায় আমন উৎপাদনে সম্ভাবনা তিন লাখ ৪৫ হাজার ৫৩১ মে. টন চাল। উৎপাদনের দিক থেকে অতীতের সব রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনার কথা জানান জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মকবুল হোসেন। পোকা-মাকড় ও অসময়ের বৃষ্টির কারণে যে ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে তা আমলযোগ্য নয় বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ। কারণ কৃষি বিভাগের মহাপরিচালকের দফতর ও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে একাধিক টিম জেলার নাগেশ্বরী, উলিপুর, রাজারহাট ও সদর উপজেলার মাঠপর্যায়ে ঘুরে এবং কৃষদের সঙ্গে কথা বলে এসব সাধারণ ক্ষতি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

তবে কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন ভালো হলেও লাভ থাকবে না। কারণ বাজার দর কম। কুড়িগ্রাম সদরের কৃষক শামসুল ইসলাম, আবেদ আলী, কদিমল জানান, বর্তমান আবাদের যে অবস্থা তাতে বাম্পার ফলন হবে। এখন শুধু প্রত্যাশা সরকার যেন ধানের ভালো মূল্যের ব্যবস্থা করে। কৃষকের কাছ থেকে যেন সরাসরি ধান ক্রয় করা হয়। তা না হলে আবারও কৃষকের লাভের ধন খাবে মধ্যস্বত্বভোগীরা। বর্তমান বাজারে শুকনা ধান মণপ্রতি ৮০০-৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দরে লাভ টিকবে না। ধানের মণ হাজার টাকা হতে হবে।

সরকারি হিসাব মতে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ৩২ হাজার ৫৩৯ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এ হিসাবে অতিরিক্ত চাল উৎপাদন হবে ৯১ হাজার ১১০ মে. টন। ফলে ধান উৎপাদনে উদ্বৃত্ত হবে জেলায়।

বগুড়া : জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, এবার ১২ উপজেলায় এক লাখ ৭৮ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। দু’দফা বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক লাখ ৬৫ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়। এর মধ্যে সাত হাজার ৪৫ হেক্টর স্থানীয় ও অবশিষ্ট উফশী জাত। ফলন টার্গেট ধরা হয়েছে চার লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন চাল। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, খরচ বাদে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে কৃষকের ১৮ টাকা ও প্রতি মণে ৭২০ টাকা খরচ পড়ে। বর্তমানে হাটবাজারে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি হচ্ছে। তাই প্রতি কেজিতে কৃষকের সাত টাকা থেকে সাড়ে ৯ টাকা লাভ হচ্ছে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক প্রতুল চন্দ্র সরকার জানান, দু’দফা বন্যা ও অতিবৃষ্টি সত্ত্বেও এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে সাড়ে পাঁচ মেট্রিক টন ধান ও ৩.৩ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যাচ্ছে। বাজার দর ভালো থাকায় কৃষকরা খুশি রয়েছেন।

রাজশাহী : বন্যা ও রোগবালাইয়ের কারণে কিছু জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। তবে ফলনের হার ভালো হওয়ায় এবং ধানের দাম বেশি থাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক লাভবান হবেন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাতেও কোনো প্রভাব পড়বে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁ জেলায় তিন লাখ ৭৩ হাজার ২৫৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু চাষ হয়েছে তিন লাখ ৯২ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির ধান। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১০ লাখ ১০ হাজার ৭০ মে. টন।

গোদাগাড়ীর কাদিপুর এলাকার কৃষক আজমল হক সুমন জানান, এ বছর তিনি ১০ বিঘা জমিতে রোপা আমন আবাদ করেছেন। ইতিমধ্যে তিন বিঘা জমির ধান কেটেছেন। মাড়াইও হয়েছে। ফলন পেয়েছেন বিঘাপ্রতি ২০ মণ করে। প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন ব্যয় হয়েছে সাত হাজার টাকা। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ৯০০ টাকা। ফলে তিনি এ বছর ধানচাষ করে লাভবান হবেন বলে মনে করছেন।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) : জগন্নাথপুরেও এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। জমিতে সোনালি ফসল দেখে কৃষক-কৃষাণীর মুখে আনন্দের হাসি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেন, এবার আমনের বাম্পার ফলন হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। এতে গত বছর বোরো ফসলহানির ক্ষতি কিছুটা হলেও পূরণ হবে।

সরেজমিন উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের খাশিলা গ্রামের হাওরে গিয়ে দেখা যায়, জমির মালিক আংগুর মিয়া শ্রমিকদের নিয়ে মনের আনন্দে ধান কাটছেন। এ সময় তারা বলেন, এবার জমিতে ভাল ধান হওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। অক্টোবর মাসে টানা তিন দিনের ঝড়োবৃষ্টি ও কারেন্ট পোকার আক্রমণে এ বছর ধানের উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। তবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

সদর উপজেলার আমনুরার কৃষক আবদুর রাজ্জাক জানান, আগাম জাতের আমন ধান কেটে বিঘায় ১৩-১৪ মণ ফলন পেয়েছেন তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হুদা জানান, কৃষি বিভাগের কর্মীদের তৎপরতায় কারেন্ট পোকা সময়মতো দমন করা হয়েছে। তিনি জানান, মাঠে মাঠে ঘুরে ধানের যে দৃশ্য দেখেছেন, তাতে এ বছর ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।

নওগাঁ ও নিয়ামতপুর : বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েক দফায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের আবাদ। এসব ধাক্কা কাটিয়ে এখন ফসল ঘরে তুলছেন কৃষকরা। কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করলেও কৃষি অফিস বলছে হবে না।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি বাদে এক লাখ ৬১ হাজার ৭০২ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর।

জেলার বদলগাছী উপজেলার কোমারপুর গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন বলেন, এবার ১০ বিঘা জমিতে বিনা-১৬ রোপন করেছিলাম। আগাম কাটা-মাড়াই করে বিঘাপ্রতি ১৭-১৮ মণ ফলন পেয়েছি। শুয়ে পড়া ধান কাটতে শ্রমিক খরচ একটু বেশি গুনতে হচ্ছে।

রসুলপুর ইউনিয়নের বাদেচাকলা গ্রামের কৃষক মিজান জানান, বর্তমানে বাজারে ধানের দাম মণপ্রতি এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। শেষ পর্যন্ত এ দাম থাকলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, বৃষ্টিতে ধানের ক্ষতি ও উপকার দুটোই হয়েছে। বৃষ্টিপাত ও ঝড়ে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া কিছু দিন আগে যে বাদামি ঘাস ফড়িংয়ের (কারেন্ট পোকার) আক্রমণ দেখা দিয়েছিল তা অনেকটাই দমন হয়েছে।

ময়মনসিংহ ও ভালুকা : দু’দফা বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার পরও এবার ময়মনসিংহে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে এ অঞ্চলের কৃষকরা আগাম জাতের (ধানী গোল্ড, বরকত, নওশা, বিনাধান-৭. ব্রি-৫৬ ও ৬২) আমন ফসল ঘরে তুলতে শুরু করেছেন। একরপ্রতি ফলন পচ্ছেন ৪৫ থেকে ৫০ মণ। বর্তমানে ধান ও খড়ের বাজারমূল্য ভালো পাওয়ায় দারুণ খুশি এ অঞ্চলের কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, এবার দুই লাখ ৫৯ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমিতে আমনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে দুই লাখ ৬০ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমি। আমন ফলনের গড় অনুযায়ী উৎপাদন হবে ছয় লাখ ৭৭ হাজার মে. টন।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন স্থানে আমন ক্ষেতে পাতা মোড়ানো রোগ ও বিএলডি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায়, সেসব জমিতে ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তবে ধানের বর্তমান বাজারমূল্য পেলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে।

এদিকে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় উঠতি আমন ধানে বাদামি ঘাস ফড়িং, মাজরা, মাইজকাটা ও পাতা ঝলসানো পোকার আক্রমণ ও ব্যাপকভাবে ইঁদুরের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো কাজ হচ্ছে না বলে জানান কৃষকরা।