বরেন্দ্র অঞ্চলে মাল্টা চাষে জাদুকরী সাফল্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ লাল মাটিতে মাল্টা চাষ করে জাদুকরী সাফল্য পেয়েছেন চাষীরা। গত কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফলটির চাষ হচ্ছে এ অঞ্চলে। চার বছর আগে লাগানো গাছে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে ফলটি। চাষীরা বলছেন, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ায় অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠেছেন মাল্টা চাষে ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ পাশের কয়েকটি জেলার প্রায় ২৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বিশাল বরেন্দ্র অঞ্চল মানেই আবাদি জমির মাঝে মাঝে ‘এক পায়ে’ দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি তাল গাছ, আর ধু ধু মাঠ। এক সময়ের মরু এলাকা হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলে কিছুদিন আগেও ধান ছাড়া আর কিছু চাষ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় এখন আম, পেয়ারা, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের বাগান গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলে।

শুষ্ক আবহাওয়া আর কঠিন মাটিতে মাল্টা চাষের অলিক কল্পনাকে বাস্তবে প্রথম রূপ দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষী মতিউর রহমান। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ফলটি চাষের কলাকৌশল ছড়িয়ে পড়ছে এখানকার প্রত্যন্ত এলাকায়। ব্যাপক লাভজনক হওয়ায় তার সাফল্য অনুসরণ করে এ অঞ্চলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মাল্টার চাষ। জানা গেছে, কৃষি বিভাগের দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের (এসসিডিপি) আওতায় ২০১৩ সালের জুলাইয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের জামতলায় চাষী মতিউর রহমানের দু’বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বারি মাল্টা-১ জাতের ২০০ চারা রোপণ করা হয়। চারা লাগানোর দু’বছর পর ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে প্রথম ফল আসে এ বাগানে। প্রথম ফলনেই সাফল্য পান মতিউর। ওই বছর একটি গাছে সর্বোচ্চ ৪০টি করে মাল্টা উৎপাদন হয়। উৎপাদনের তৃতীয় বছরে ব্যাপক পরিমাণে ফলটি ধরেছে এ বাগানে। জামতলায় মতিউর রহমানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ছোট ছোট গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় মাল্টা। এ ফলনে দারুণ খুশি চাষী মতিউর। তিনি জানান, একেকটি গাছে এবার তিন শতাধিক মাল্টা ধরেছে। আগস্টের শেষনাগাদ থেকে বাগানে উৎপাদিত মাল্টা বাজারজাতকরণ করছেন তিনি। তিনি আরও জানান, তার বাগানের ফলটি দারুণ রসালো। এছাড়া বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত মাল্টার চেয়ে বেশি মিষ্টি। এছাড়া পাইকারি বাজারে মাল্টার দামও অনেক বেশি। তিনি জানান, তার বাগানের প্রতি হালি মাল্টা ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-আমনুরা সড়কের পাশেই মতিউরের মাল্টার বাগান ‘মনামিনা কৃষি খামার’। এ সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেরই চোখে পড়ে এই বাগান। বারি মাল্টা-১ চাষের সাফল্য দেখে অনেকেই ফলটি চাষে আগ্রহবোধ করছেন এবং চারা সংগ্রহের জন্য তার খামারে আসছেন। ইতিমধ্যেই মাল্টা গাছের চারা বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। গত তিন বছরে প্রায় ৫শ’ বিঘা জমিতে লাগানোর জন্য তিনি প্রায় ৫০ হাজার চারা সরবরাহ করেছেন বলে জানান। তিনি আরও জানান, সারা দিন রোদ পড়ে এবং বৃষ্টির পানি জমে না- এমন উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি মাল্টা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত জমিটি পর্যায়ক্রমিক চাষ ও মই দিয়ে সমান করে সমতল ভূমিতে বর্গাকার বা ষড়ভুজি পদ্ধতিতে চারা রোপণ করতে হয়। তবে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বছরের যেকোনো সময় চারা লাগানো যেতে পারে বলে জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফল বিজ্ঞানী ড. সরফ উদ্দিন জানান, মাল্টা চাষে তেমন কোনো রোগবালাই নেই। এছাড়া চাষাবাদ পদ্ধতিও খুব সহজ। এ কারণেই ফলটি চাষের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ মাটিতে বারি মাল্টা-১ চাষে যে সাফল্য পাওয়া গেছে, তাতে এ অঞ্চলে এটি একটি সম্ভাবনাময় ফল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।