বিশ্বসেরা লোকাল কমিউনিটি

অনুমতিই ছিল না। তার পরও অনানুষ্ঠানিকভাবে গুগল লোকাল গাইড কমিউনিটি তৈরি করে কাজ শুরু করলেন তিনি। তিন বছরের মাথায় মাহাবুব হাসানের নেতৃত্বে এই কমিউনিটি বিশ্বের সেরা লোকাল গাইড কমিউনিটির

 

পুরস্কার জিতেছে। গল্পটি শোনাচ্ছেন মাহবুবর রহমান সুমন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুগল ট্রান্সলেটের ‘ওয়ার্ড অব মাউথ—ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রান্সলেশন অ্যান্ড ভয়েজ’ প্রকল্পে কাজ করছিলেন মাহাবুব হাসান।

প্রকল্প সম্পর্কে খোঁজ নিতে গুগলের সদর দপ্তর থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা ঢাকায় এলেন। তাঁদের অন্যতম ক্যাথি স্যান্ডার্সকে তিনি বললেন, ‘গুগলে চাকরি করতে চাই। ’ ‘সে তো সম্ভব নয়, তবে তুমি লোকাল কমিউনিটিতে গাইড হিসেবে কাজ করতে পারো। ’ গুগল ম্যাপে বিভিন্ন স্থান, পথ, স্থাপনা ইত্যাদির নির্দেশনা থাকে। লোকাল গাইডের সদস্যরা মানচিত্রে সেগুলোর পর্যালোচনা ও সাধারণ পরিচিতি তুলে ধরেন। যেমন—গুগল ম্যাপে জাতীয় জাদুঘরের নির্দেশনা দেওয়া আছে। লোকাল গাইডের সদস্যরা এটি সম্পর্কে নানা বিবরণ দেন। ফলে যেকোনো দর্শনার্থী আরো জানতে পারেন।

তখন সারা দুনিয়ায় ২৩টি গুগল কমিউনিটি ছিল।

১৮টি আমেরিকায়, বাকি পাঁচটি উন্নত দেশগুলোতে কাজ করত। আর কোনো দেশের লোকাল গাইড হওয়ার সুযোগও ছিল না। তবে মাহাবুবের খুব ইচ্ছা—গুগলের সঙ্গে কাজ করবেন।

২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল তাঁদের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ৪০ জন জুনিয়রকে নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে প্রথম লোকাল গাইড কমিউনিটি গড়ে তুললেন। তাঁরা গুগল ম্যাপের রিভিউ করেন, মানচিত্রে বিভিন্ন স্থানের ঠিকানা সংযুক্ত করেন, কখন খোলা ও বন্ধ সেসব তথ্য দেন। তাঁদের অফিস নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে, পার্কে বা রেস্তোরাঁয় মিট-আপ করতেন। গুগলের কোনো স্থান, লেখা বা ছবির পর্যালোচনা করলে এক পয়েন্ট পান। পয়েন্ট বাড়াতে পারলে গাইডের অবস্থার উন্নতি হয়, পুরস্কারও পান। ২০০ পয়েন্ট পেলে লেভেল ফোরে পৌঁছেন, গুগল ড্রাইভ স্টোরেজে ১০০ জিবি স্পেস উপহার দেওয়া হয়। লেভেল ফাইভে পৌঁছতে ৫০০ পয়েন্ট লাগে। সর্বোচ্চ লেভেল ১০-এ পৌঁছলে মডারেটর নির্বাচিত হন। বিশ্বের সেরা মডারেটরদের নিয়ে বছরে একবার ‘গুগল লোকাল গাইড সামিট’-এর আয়োজন করা হয়।

গুগল বাংলাদেশ লোকাল গাইড কমিউনিটির উদ্যোগে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর, জেলা শহরগুলোতে ৭৫টি ‘মিট-আপ’ হয়েছে। প্রতি মিট-আপে অন্তত ৩০ জন তরুণ-তরুণী অংশ নিয়েছেন। আগ্রহীদের তাঁরা গুগল ম্যাপে কোন জায়গাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়, কিভাবে রিভিউ লেখা যায়, গুগল ম্যাপে প্রয়োজনীয় ছবি সংযুক্ত করার নিয়ম, কাস্টর ম্যাপিং ইত্যাদি শিখিয়েছেন। এই কার্যক্রমগুলোর ফলে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে গুগল এই কমিউনিটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁদের ৫০ মিট-আপের খবর সদর দপ্তর থেকে পরিচালিত গুগল লোকাল গাইডের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘জি প্লাস’, ফেসবুক পেজসহ অন্য যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে আপলোড করেছে। মাহাবুব জানালেন, মিট-আপগুলোতে তাঁরা শুধু গুগল নিয়েই কাজ করেননি, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান করেছেন। কেন করেছেন? তিনি বললেন, ‘যাতে আমরা সমাজের জন্য কিছু করতে পারি এবং অন্যরাও উদ্বুদ্ধ হয়। ’ পকেটের টাকা ছাড়াও চাঁদা তুলে খরচ করেছেন তাঁরা।

মাহাবুব বললেন, ‘দিন-রাত তখন খাটতে হয়েছে। ’ শুরুর সেই একজনের দলে এখন সাত হাজার তরুণ-তরুণী আছেন।

বাংলাদেশ লোকাল গাইড কমিউনিটির মডারেটর হিসেবে ২০১৭ সালের মার্চে সাত সদস্য নিয়ে ইউআইইউ’র কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই ছাত্রটি ভারতের ‘সাউথ এশিয়ান মিট-আপে’ অংশ নিয়েছেন। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের লোকাল গাইড কমিউনিটির সমন্বয়ক বা মডারেটররাও ছিলেন। ৩৭ গাইড মিলে ভারতের বিভিন্ন স্থান ঘুরেছেন, আলোচনা হয়েছে। তিনি এবারের সামিটের কথা গুগল লোকাল গাইড কমিউনিটির মেইলে জেনেছেন। অন্যদের মতো আবেদনপত্রের সঙ্গে ভিডিও জমা দিয়েছেন। বেশির ভাগ ভিডিওতে মডারেটর নিজের সম্পর্কে বলেছেন, সেখানে মাহাবুব তাঁর ভিডিওতে এই দেশ ও তাঁদের কাজের বিবরণ পাঠিয়েছেন। চার লাখ আবেদন থেকে প্রাথমিকভাবে দুই হাজারটি বাছাই করা হলো। বিচারকরা ৬২টি দেশের ১৫০ জন লোকাল গাইডকে মূল সামিটে অংশ নিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় আমন্ত্রণ জানান। ১০ থেকে ১২ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার মাউনটেইন ভিউর গুগল সদর দপ্তরে আয়োজনটি হলো। বন্ধুদের জন্য নকশি পিঠা নিয়ে গেলেন মাহাবুব। পিঠাগুলো স্যুভেনির বিভাগে ‘বেস্ট স্যুভেনির’ হলো। সঙ্গী গুগল লোকাল গাইড বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী সোনিয়া বিনতে খোরশেদ পুরস্কার নিলেন। গুগলের টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে পিঠার ছবি আপলোড করা হলো। তবে সেরা চমকটি ছিল শেষ দিন। গুগল লোকাল গাইড কমিউনিটির প্রধান জেসিকা শরফ বাংলাদেশ কমিউনিটিকে ‘গুগল লোকাল গাইড কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’ দিলেন।

মাহাবুবের আরো কীর্তি

*    গুগল কমিউনিটি ম্যানেজার হিসেবে ২০১৬ সালে গুগল সদর দপ্তরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কর্মশালা ‘গুগল আই/ও ১৬’-তে অংশ নিয়েছেন। ছয় হাজার প্রযুক্তিবিদের এই আসরে তিনি ছিলেন আমন্ত্রিত ৩০০ ছাত্রের অন্যতম।

*    গুগল বাংলাদেশ ডেভেলপার গ্রুপ আয়োজিত ২০১৫ ও ২০১৬ সালে জাতীয় হ্যাকাথন প্রতিযোগিতায় মেন্টর ছিলেন। এখন তিনি গুগল ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের ঢাকা কমিউনিটি ম্যানেজার।

*    ২০১৩-২০১৫ সাল পর্যন্ত গুগল ম্যাপের রিজিওনাল লিডার ছিলেন।

*    ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মার্চে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে গুগল ম্যাপ মেকার দলের প্রধান ছিলেন।

*    ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গুগল ম্যাপের প্রশিক্ষক হিসেবে ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রশিক্ষণ কর্মশালা করেছেন।
‘বেস্ট স্যুভেনির’ নকশি পিঠা

*    সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের হয়ে দেশের সব হাইওয়ে, উপজেলা সড়কে সরকারি রোড নম্বর দিয়েছেন। কোড অনুসারে সার্চ করলে নির্দিষ্ট সড়কটি খুঁজে পাওয়া যাবে, কোথায় আছে দেখা যাবে।

*    ‘গুগল বিজনেস ভিউ’র লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন তিনি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গুগল স্ট্রিট ভিউর মতো বিজনেস ভিউ তৈরি করে দেন। একটি আইটি ফার্ম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। ব্যবসার পাশাপাশি সেখানে আগ্রহী কিশোর-তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।