এশিয়ার সবচেয়ে বড় মানববর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র খুলনায়

সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মানববর্জ্য পরিশোধনের জন্য খুলনায় গড়ে তোলা হয়েছে দেশের প্রথম মানববর্জ্য শোধনাগার। ইতিপূর্বে বাসা-বাড়ির সেপটিক ট্যাংক ও পিট থেকে মল সরাসরি নদী ও ড্রেনে ফেলে দেওয়া হতো, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরিবেশ রক্ষায় থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজি এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে নির্মাণ করেছে এই মানববর্জ্য শোধনাগার।

প্রতি মাসে ১৮০ হাজার লিটার বর্জ্য পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন শোধনাগারটি তৈরি হয়েছে খুলনা নগরী থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে রাজবাঁধে পরিত্যক্ত স্যানিটারি ল্যান্ড ফিল্ডের ১ দশমিক ৩ একর জমির ওপর। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে কাজ শুরু হয়ে চলতি বছরের ৪ মার্চ চালু হয়েছে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় এই প্রাকৃতিক শোধনাগার। নেদারল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসএনভি) সহায়তায় মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।

প্রায় পানি শোধনাগারের মতোই দেখতে মানববর্জ্য শোধনাগার। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এটি দেখতে আসছেন। শোধনাগারের ভেতরে কলাবতী গাছে

লাল ও হলুদ রঙের ফুল দেখে বোঝার উপায় নেই- এই গাছই বর্জ্যের ব্যাকটেরিয়া অপসারণে মূল ভূমিকা রাখে।

এনএসভির প্রকৌশল বিভাগের উপদেষ্টা শহিদুল ইসলাম জানান, ‘বর্জ্য গাড়িতে করে এনে সোজা শোধনাগারের নির্দিষ্ট বাক্সে ফেলা হয়। সেখানে পাইপের মাধ্যমে তা ভাগ হয়ে পুরো বেডে ছড়িয়ে পড়ে। বেডগুলোর ওপর ইটের খোয়া, পাথর ও বালু দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক ফিল্টার ব্যবহার করে বর্জ্যের পানি পরিশোধন করা হয়। আর বর্জ্য শোধনের জন্য ওপরের স্থানে কলাবতী (ক্যানা), হেলিকোনিয়া ও সাইপেরাস গাছ লাগানো হয়েছে। এই গাছগুলো বর্জ্যের ব্যাকটেরিয়া শোষণ করে নেয়। নিচের পানি ফিল্টারের মাধ্যমে পাশের আরেকটি চৌবাচ্চায় চলে যায়। সেখানে তা আরেক দফা পরিশোধিত হয়ে বের হয়ে যায়।’

এসএনভির আরেক কর্মকর্তা সাম হোসাইন জানান, পরিশোধনের পর বর্জ্যগুলো বেডেই জমতে থাকে। উৎকৃষ্ট মানের জৈব সার হিসেবে সেগুলো ব্যবহার করা যাবে। বর্জ্য যাতে মাটির সঙ্গে মিশতে না পারে সে জন্য একেবারে নিচে জিওটেক্সটাইল ও হাই ডেনসিটি পলিথিন ব্যবহার করা হয়েছে।

এত কিছুর পরও প্রচারণা ও জনসচেতনতার অভাবে শোধনাগারের সক্ষমতার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতি মাসে ১৮০ হাজার লিটার বর্জ্য এখানে ফেলার কথা থাকলেও গড়ে মাত্র ৪০ হাজার লিটার মানববর্জ্য এখানে ফেলা হয়।

কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ সমকালকে বলেন, ‘মানববর্জ্যের বিষয়ে কথা বললে এখনও মানুষ হাসাহাসি করে। অথচ বিষয়টি নিয়ে সারাবিশ্বেই কাজ চলছে। আর মানববর্জ্য নিয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে এশিয়া অন্যতম। উন্নত দেশগুলো যান্ত্রিক শোধনাগার ব্যবহার করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রাকৃতিক উপায়ে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এখনও গবেষণা চলছে। খুলনার শোধনাগারটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটিই হবে বিশ্বের মডেল।’