জেগে ওঠার সম্ভাবনায় রানীরবন্দরের তাঁত

ব্রিটিশ শাসনামল থেকে তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে দিনাজপুরের রানীরবন্দরের পরিচিতি আর সুনাম ছিল। এখানকার উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালে, মশারি ও গুল টেক্স চাদর জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো।

ফলে গড়ে উঠেছিল ছোট-বড় দুই শতাধিক তাঁতশিল্প কারখানা। এ তাঁতশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ সহস্রাধিক মানুষ জড়িত ছিল। কিন্তু ১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এ এলাকার অধিকাংশ তাঁত নষ্ট হয়ে যায়। সুতা ও কাপড় তৈরির সরঞ্জামের মূল্য বৃদ্ধি এবং পুঁজির স্বল্পতা আর বাজারজাতে সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে এ তাঁতশিল্পে ধস নামে। এতে বেশির ভাগ তাঁত বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে দীর্ঘদিন তাঁতের মাকুর ঠুক ঠুক শব্দ ছিল না। মাকুর ঠুক ঠুক শব্দে মানুষের ঘুমও ভাঙত না। শ্রমিক আর পাইকারদের আনাগোনাও তেমন ছিল না। তবে আবার শোনা যাচ্ছে মাকুর ঠুক ঠুক আওয়াজ। রানীরবন্দর তাঁতশিল্প যখন বিলুপ্তির পথে তখন আবারও নতুন সম্ভাবনা জাগিয়ে তুললেন তাঁতি মো. জহুরুল হক। জহুরুলের একটি তাঁত থেকে এখন ১৮টি তাঁত হয়েছে। তার তাঁতে হয়েছে ২২ জন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান। এখানে তৈরি হচ্ছে ডোর ম্যাট, ডাইনিং ম্যাট, ফ্লোর ম্যাট, দরজার পর্দা, সোফার কাপড়, থ্রি-পিস, টাওয়েল, গ্রামীণ চেক শার্টের কাপড়, পকেট রুমাল, ওড়না, বেড কভার ইত্যাদি। তার তাঁতশিল্পে অর্জিত সফলতায় তৈরি টেবিল ক্লথ, বেড কভারসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড় ‘হ্যান্ড টাচ কোম্পানি’ সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে।
এতেই আশার আলো জ্বলে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে কাপড়ের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ তাঁতশিল্প বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করছেন এখানকার বাসিন্দারা। তাঁতশিল্প আবার জেগে উঠলে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবদান ছাড়াও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তাঁতি আবদুল খালেক জানান, এ অঞ্চলের তাঁতশিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা, সুদক্ষ তাঁতশিল্পী, সহজলভ্য শ্রমিক থাকা সত্ত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, রপ্তানির বন্দোবস্ত ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব, সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাঁচা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি রানীরবন্দরের ঐতিহ্য তাঁতশিল্পকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বর্তমানে যে শতাধিক তাঁত চালু অবস্থায় রয়েছে সেগুলো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তাঁতি আবদুল মালেক বলেন, ‘১০ বছর আগেও আমাদের দুই ভাইয়ের ৭০টা তাঁত ছিল। বর্তমানে আছে ১০টা। পুঁজি কম, বাজারজাতকরণে অসুবিধা এবং সুতা কিনতে যেতে হয় বিভিন্ন জেলায়। তাই সরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারতাম। ’ বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বেসিক সেন্টার চিরিরবন্দরের (রানীরবন্দর) লিয়াজোঁ অফিসার মো. মনজুরুল হক বলেন, ‘আমরা তাঁতিদের ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছি। তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমরা তাদের উন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছি। ক্যাটাগরি অনুযায়ী একটি তাঁতের জন্য ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ’ তিনি জানান, সুতার সহজলভ্যতা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে সরকারের কোনো প্রজেক্ট নেওয়া হলে এ অঞ্চলের তাঁতশিল্প আবার জেগে উঠবে। উল্লেখ্য, প্রায় ৫০০ বছর আগে এই রানীরবন্দর এলাকা জঙ্গল ও অনাবাদি ছিল। তৎকালীন রংপুরের জমিদার তার নিজের কাজের জন্য এখানে তাঁতিপল্লী গড়ে তুলেছিলেন। তখন থেকেই বংশগতভাবে কাপড় বোনার শিল্প গড়ে ওঠে এখানে। দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার নশরতপুর, দক্ষিণ নশরতপুর, রানীপুর, আলোকডিহি, গছাহার, কিষ্টহরি, খামার সাতনালা, জোত সাতনালা, তেঁতুলিয়া, খোচনা এবং খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি, ছাতিয়ানগড় ও কুমড়িয়া গ্রামের তাঁতশিল্প নিয়ে গড়ে উঠে বৃহত্তর রানীরবন্দর তাঁত অঞ্চল।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ