সাদা ভুট্টায় সম্ভাবনা

পরোটা, নানরুটি, পিঁয়াজু, সবজি পাকোড়া, চিকেন রোল, শর্মা, মিষ্টি তেলপিঠা, কেক, পাস্তা, জিলাপি, কর্ন স্যুপ—থরে থরে সাজানো মুখরোচক সব খাবার। তাৎপর্যের বিষয় হলো, এসব খাবার তৈরি হয়েছে সাদা ভুট্টা দিয়ে।

আবার চাল ও গমের আটার খাবারের তুলনায় এতে পুষ্টিগুণও কম নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশি। সেই সুবাদে টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিবেচনায় এসব খাবার হয়ে উঠতে পারে ধান-গমের বড় বিকল্প। আর সে জন্য যথাযথ প্রচার ও পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত ‘মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশে সাদা ভুট্টার চাষ’ শীর্ষক কর্মশালায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা এমন মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এ দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার করতে ধান ও গমের পাশাপাশি সাদা ভুট্টার ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলে ভাতের ওপর চাপ কমবে। গম আমদানির পরিমাণও কমবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সম্মেলন কক্ষে সকাল সাড়ে ১০টায় কর্মশালার উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ।

বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সেকান্দার আলী, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল হক বেগ এবং কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. ওয়ায়েস কবির।
বক্তারা বলেন, পৃথিবীজুড়ে পশু-পাখির খাদ্য হিসেবে হলুদ ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে মানুষের খাবার হিসেবে সাদা ভুট্টার উপযোগিতা অনেক। এর বাজারমূল্যও হলুদ ভুট্টার চেয়ে অনেক বেশি। সাদা ভুট্টায় স্নেহ ও আমিষের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি থাকে। এর তেল উন্নত দেশে বহুল ব্যবহৃত। বিশেষ করে সাদা ভুট্টা দিয়ে তৈরি করা যায় হরেক রকমের সুস্বাদু খাবার।

‘বাংলাদেশে মানুষের খাদ্য হিসেবে সাদা ভুট্টা প্রবর্তন’ শীর্ষক প্রকল্পের সমন্বয়ক ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাফর উল্লাহ কর্মশালায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, খাদ্য হিসেবে ধান-গমের বিকল্প হিসেবে সাদা ভুট্টা গ্রহণ করা যেতে পারে। পুষ্টিমান বিবেচনায় অনেকাংশে চালের চেয়ে সাদা ভুট্টা ভালো। প্রতি ১০০ গ্রাম সাদা ভুট্টায় চালের চেয়ে আমিষের পরিমাণ ১.৪৮ গ্রাম বেশি রয়েছে। এ ছাড়া চর্বি ১.৮২ গ্রাম, লৌহ ১.২৪ গ্রাম, জিংক ০.১৯ গ্রাম, পটাসিয়াম ৬৪ গ্রাম এবং সোডিয়াম ২৮ গ্রাম বেশি রয়েছে। অন্যান্য গুণাগুণও প্রায় চালের কাছাকাছি। তাই সাদা ভুট্টা চালের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে ভালো বিকল্প হতে পারে।

কর্মশালায় জানানো হয়, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে চলতি শতকের ত্রিশ দশকের পর খাদ্যঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশে বিকল্প খাদ্য হিসেবে সাদা ভুট্টাকে বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া এখনই প্রয়োজন। ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার উৎপাদনশীলতা বেশি হওয়ায় সাদা ভুট্টা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খাদ্যঘাটতি পূরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, ‘সার্বিক বিবেচনায় দৈনন্দিন খাদ্য হিসেবে সাদা ভুট্টা ধান ও গমের চেয়ে বেশি উপযোগী। এক কেজি ধান উৎপাদন করতে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়, যার বেশির ভাগই আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। অথচ ভুট্টা উৎপাদন করতে এর চেয়ে অনেক কম পানির প্রয়োজন হয়। আবার তাপমাত্রা বাড়ায় গমের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সে তুলনায় সাদা ভুট্টার উৎপাদন অনেক বেশি। এটি সুস্বাদুও। তাই আগামীতে দেশের বাড়তি জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিতে ধান-গমের বিকল্প হতে পারে সাদা ভুট্টা। ’

কৃষিতত্ত্ব বিভাগে চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল করিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বহিরাঙ্গনের পরিচালক প্রফেসর ড. মো. মোফাজ্জল হোসাইন। কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীগণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খাদ্যদ্রব্য তৈরি-সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা শিক্ষিত গৃহিণীরাও কর্মশালায় অংশ নেন।

কর্মশালায় সাদা ভুট্টা দিয়ে তৈরি পরোটা, নানরুটি, পিঁয়াজু, সবজি পাকোড়া, চিকেন রোল, শর্মা, মিষ্টি তেলপিঠা, কেক, পাস্তা, জিলাপি, কর্ন স্যুপসহ হরেক রকম খাবার প্রদর্শন করা হয়। কিছু কিছু খাবার তৈরির পদ্ধতিও বর্ণনা করা হয়।

পরোটা : পরোটা তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো—সাদা ভুট্টার আটা ১ কাপ, গমের ময়দা ২ কাপ, গুঁড়াদুধ ১ টেবিল চা চামচ, ইস্ট আধা চা চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ, ভোজ্য তেল আধা চা চামচ। প্রস্তুত করতে একটি পরিষ্কার পাত্রে সাদা ভুট্টার আটা, ময়দা, গুঁড়াদুধ ও লবণ মেশাতে হবে। সিকি কাপ তেল দিয়ে মাখাতে হবে। এরপর ১ কাপ পানি দিয়ে খামির তৈরি করতে হবে। খামিরটুকু ৮-১০টি ভাগ করতে হবে। প্রতিটি অংশ গরম তাওয়ায় সেঁকে প্রস্তুত করতে হবে একেকটি পরোটা।

নানরুটি : প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো—সাদা ভুট্টার আটা ১ কাপ, গমের ময়দা ২ কাপ, চিনি ২ চা চামচ, ইস্ট ২ চা চামচ, দুধ ১ কাপ, পানি ১ কাপ, ভোজ্য তেল ২ টেবিল চামচ, গুঁড়াদুধ দেড় টেবিল চামচ ও লবণ স্বাদমতো। প্রস্তুত করতে পরিষ্কার পাত্রে মৃদু গরম পানিতে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর উপাদানগুলো ভালোভাবে মাখাতে হবে। ইস্ট মিশ্রিত পানি ও দুধ মিশিয়ে ১০ মিনিট মথে নিতে হবে। এরপর তেল দিয়ে খামির তৈরি করতে হবে। বাতাস যেন না লাগে এমন জায়গায় খামির ভেজা কাপড় দিয়ে তিন-চার ঘণ্টা ঢেকে রাখতে হবে। খামির ফুলে উঠতেই আবারও মথে নিতে হবে। এবার খামির খণ্ডটি ১০-১২ ভাগ করে একেকটি ১০ সেন্টিমিটার পুরু করে রুটি বেলতে হবে। এরপর তাওয়ায় সেঁকে মাখন লাগালেই হয়ে যাবে সুস্বাদু নানরুটি।

পিঁয়াজু : সাদা ভুট্টার আটা আধা কাপ, চালের গুঁড়া আধা কাপ, ডালের বেসন আধা কাপ, পিঁয়াজ কুচি আধা কাপ, চারটি কাঁচা মরিচ কুচি, আদা বাটা আধা চামচ, হলুদ আধা চা চামচ, ধনিয়া ১ চা চামচ, কালিজিরা ১ চা চামচ, তেল ও লবণ পরিমাণমতো মিশিয়ে আঠালো করে মেখে নিতে হবে। গরম তেলে এপিঠ-ওপিঠ করে ভাজলেই প্রস্তুত হবে মচমচে পিঁয়াজু।

সবজি পাকোড়া : পছন্দমতো সবজি চাকা চাকা করে কেটে নিতে হবে। পরিষ্কার পাত্রে সাদা ভুট্টার আটা ও চালের গুঁড়া তিন টেবিল চামচ করে, ডালের বেসন ৫ টেবিল চামচ, টেম্পুরা পাউডার ১ টেবিল চামচ, আদা ও হলুদ আধা চা চামচ, কালিজিরা ১ চা চামচ এবং প্রয়োজনমতো লবণ ও পানি নিয়ে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর সবজির চাকগুলো ওই মিশ্রণে ডুবিয়ে গরম তেলে ভেজে ট্রেতে ন্যাপকিন পেপারে রাখতে হবে।

চিকেন রোল : সাদা ভুট্টার ২ কাপ আটা, আধা কাপ ময়দা, দুটি ডিম ও তেল ২ কাপ নিতে হবে চিকেন রোল বানাতে। সব উপাদান পরিষ্কার পাত্রে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করে দুই ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। একটি ননস্টিক ১৫ সেন্টিমিটার তাওয়ায় পাতলা কাপড়ের টুকরো হালকা তেলে ভিজিয়ে লাগিয়ে নিতে হবে। উনুনে তাওয়া গরম করে চামচ গোলা দিয়ে রুটির মতো সেঁকে নিতে হবে। এরপর সেই রুটি দিয়ে বানাতে হবে রোল। এই পরিমাণ গোলায় ৪০টি রোল তৈরি করা যেতে পারে।

তেলপিঠা : তেলপিঠা বানাতে ২ কাপ সাদা ভুট্টার আটা, ১ কাপ ময়দা, আধ কাপ বেকিং পাউডার মিশিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেলে বাদামি করে ভেজে নিতে হবে।

কেক : কেক তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো—আধা কাপ ময়দা, আধা কাপ সাদা ভুট্টার আটা, ডিম ২টি, চিনি ২ কাপ, তেল আধা কাপ, দুধ আধ কাপ, বেকিং সোডা আধা চা চামচ ও কোকা পাউডার দেড় চা চামচ।

প্রস্তুত করতে প্রথমেই পরিষ্কার পাত্রে ডিম ভেঙে তাতে চিনি মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর বেকিং পাউডার, বেকিং সোডা, ময়দা ও সাদা ভুট্টার আটা ভালোভাবে মেশাতে হবে। কোকা পাউডার ও তেল মিশ্রণে দিয়ে খুব ভালোভাবে মেখে নিতে হবে। এরপর তা ওভেনে ভরে দিতে হবে। ব্যস, তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু কেক।