পাটে সোনালি দিনের হাতছানি

সত্তরের দশকে নব্যস্বাধীন দেশটিকে যে খাতটি ব্যাপক সম্ভাবনা দেখিয়েছিল তার নাম পাট। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সোনালি আঁশের খ্যাতি অর্জন করে কৃষিনির্ভর এ পণ্যটি। কিন্তু দিনের পর দিন অনিয়ম আর অবহেলার শিকার হয়ে হারাতে বসেছিল পাটের ঐতিহ্য। সময়ের পরিক্রমায় পুনরায় আশা জাগাতে শুরু করেছে সোনালি আঁশ। জিন আবিষ্কারের পর উদ্ভাবিত হয়েছে পাট ছাড়ানোর অটোমেটিক মেশিন ‘আঁশকল’। পাট দিয়ে পলিথিন তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে নাম দেয়া হয়েছে ‘সোনালি ব্যাগ’। এসবের মাধ্যমে পাটে সোনালি দিনের হাতছানি দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধান, ভুট্টা ও গম মাড়াইয়ের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে অটোমেটিক মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে; কিন্তু পাটের আঁশ ছাড়ানোর জন্য এত দিন ওই ধরনের কোনো মেশিন ছিল না। পাটগাছকে অনেক দিন ‘জাগ’ দিয়ে এর ছাল ছাড়াতেন কৃষকেরা। এতে দীর্ঘ সময় ও বেশি শ্রম দিতে হতো। পানির অভাবে নষ্ট হতো অনেক পাট। আবার পানি পাওয়া গেলেও পাটের কারণে দূষিত হতো পানি ও আশপাশের পরিবেশ। এই সমস্যার সমাধানে সেমি-অটোমেটিক মেশিন ‘আঁশকল’-এর উদ্ভাবন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পাটের সোনালি দিন ফেরাতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে আঁশকল।
এ দিকে পাট থেকে পলিথিন ব্যাগ উদ্ভাবন করেছেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান। এ ব্যাগের নাম দেয়া হয়েছে ‘সোনালি ব্যাগ’। পাট থেকে সেলুলোজ আহরণ করে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় সিট। তা থেকেই তৈরি হয় ব্যাগ। উদ্ভাবক দাবি করেছেন, পাট থেকে তৈরি পলিথিন ব্যাগ প্রচলিত পলিথিনের তৈরি ব্যাগের চেয়ে অধিক কার্যকর। এ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করার পর ফেলে দিলে সহজেই মাটির সাথে মিশে যায়। উপরন্ত তা মাটিতে সারের কাজ করে। সহজলভ্য উপাদন এবং সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এ পলিথিন ব্যাগ বিদেশে রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ সোনালি ব্যাগ আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
অন্য দিকে পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনসহ দশ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আদলে গড়া এ ফান্ডের একটি অংশ পাটের বীজের উৎপাদন বৃদ্ধি ও কাঁচা পাট রফতানিকারকদের বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত হবে। সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ২ শতাংশ সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার ‘পাট শিল্প উন্নয়ন তহবিল’ গঠন এবং তহবিলের গ্যারান্টি পেতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে পাটপণ্যের প্রোপটকে গুরুত্ব দিয়ে গত বছরের ৬ মার্চ পাটপণ্যকে ‘প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য’ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এ বছরের পাট দিবসেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় নতুন করে এসব উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
পাট থেকে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী ড. মোবারক আহমদ খান জানিয়েছেন, প্রাথমিক উৎপাদন ল্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে দৈনিক তিন টন। সরকারিভাবে এ ব্যাগ উৎপাদন হলেও বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পাটকলগুলোতেই এর উৎপাদন হতে পারে। তা ছাড়া যে কেউ ুদ্র পরিসরে এর কারখানা স্থাপন করতে পারেন। স্বল্প পরিমাণে সোনালি ব্যাগ উৎপাদিত হওয়ায় এর বিপণন এখনো সীমিত। প্রতি ব্যাগের দাম হবে তিন-চার টাকা। অধিক পরিমাণ উৎপাদিত হলে দাম প্রতিটি ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সোনালি ব্যাগই হতে পারে প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের উত্তম বিকল্প। প্রচলিত ‘অয়’ পলিথিন ব্যাগের কারণে পরিবেশ দূষণ, ভূমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস, নদ-নদী ভরাট, শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি ইত্যাদি থেকে রা পাওয়া সম্ভব যদি সোনালি ব্যাগ প্রয়োজন মতো উৎপাদন, বাজারজাত ও ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এর ফলে পাটের অর্থনীতিও অনিবার্যভাবে চাঙা হয়ে উঠতে পারে।
যে পলিথিন ব্যাগ আমরা বাজারে দেখতে পাই, তার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ১৯৮২ সালে। কিন্তু যে ইথাইলিন (মলিকিউলাস) থেকে পলিথিন বা পলিথাইলিন উৎপাদিত হয় তা পরিবেশের জন্য ভয়ঙ্কর তিকারক। এ পলিথিন ব্যাগ কোনোভাবেই এমনকি পুড়িয়েও ধ্বংস করা যায় না। ফলে জমিতে, পানিতে, ড্রেনে যেখানেই ফেলা হোক না কেন, তা অত থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিতে এই পলিথিন ব্যাগ পড়ার কারণে জমির ফসল উৎপাদন মতা হ্রাস পাচ্ছে। নদ-নদী ও জলাশায়ে পতিত হওয়ার ফলে সেগুলোর বুক ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর জলাবদ্ধতা সঙ্কটের পেছনেও রয়েছে এই পলিথিন ব্যাগ। তা ড্রেনে পড়ে তার পানি নিষ্কাশন মতা অকর্যকর করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে তোলার পেছনে এর বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। ভূমিকল্প, বজ্রপাত, আলট্রাভায়োলেট রেডিয়েশন ইত্যাদির জন্যও এই পলিথিনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
পলিথিন বা পলিথিন ব্যাগের এই পরিবেশ বিপর্যয়কর নানামুখী প্রতিক্রিয়ার কারণে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এর বদলে পাট, কাগজ ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের কথা বলা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ হয়নি। বিকল্প ব্যাগের ব্যবহার তেমনভাবে বাড়েনি। পরিবেশ আন্দোলনের (পবা) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেরই প্রতিদিন এক কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। এ শহরের জলাবদ্ধতার জন্য ৮০ শতাংশ দায়ী এই পলিথিন ব্যাগ। সারা দেশে পলিথিন ব্যাগ কত ব্যবহৃত হয় এবং তার কী ধরনের বিরূপতা পরিবেশ, উৎপাদন ও জীবনযাত্রায় পতিত হয়; তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার কিভাবে হচ্ছে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে নজরদারির অভাব ও ব্যবস্থা গ্রহণের অমতাই এজন্য মূলত দায়ী। এ অবস্থায় সোনালি ব্যাগ সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এ দিকে আঁশকলের সুফল সম্পর্কে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক স ম আশরাফ আলী বলেন, পাটের মান ঠিক না থাকলে কৃষকেরা সঠিক মূল্য পান না। আঁশকল পাটের মান ঠিক রাখবে; এতে ফ্যাশকাজাতীয় অপচয় হবে না। আঁশকলের ব্যবহার কৃষি েেত্র বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। মাধ্যমে সহজেই মেশিনে ছাল ছাড়িয়ে শুধু ছাল জাগ দিতে পারবেন। ফলে খরচও কমে আসবে। পাটকাঠিও নষ্ট হবে না। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার ৬০ জন উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে আঁশকল দিয়ে পাটের ছাল ছাড়ানো শুরু করেছেন। এর ব্যবহার বাড়লে চাষি ও পাটের ছাল ছাড়ানোর কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কষ্ট কমবে।
প্র্যাক্টিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা অল্প কিছু আঁশকল দিয়ে পাটযাত্রা ক্যাম্পেইনে আঁশকলের সাথে কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। এবার তারা নিজেরাই এর ব্যবহার করতে পারবেন। তিনি জানান, শুরুতে আঁশকলের যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও স্থানীয়ভাবে কিছু উদ্যোক্তাকে প্রশিণ দেয়া হচ্ছে। তারা দ কর্মীতে পরিণত হলে দেশেই এই আঁশকল বানানো সম্ভব। এতে পৃথক উদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে তোলা সম্ভব। হাসিন জাহান বলেন, প্রথাগত পদ্ধতিতে পাটের আঁশ ছাড়াতে যে খরচ হয়, তার মাত্র ৩৩ শতাংশ খরচ হবে আঁশকলে। আঁশের গুণগত মানও থাকবে ভালো।
এ দিকে পাটের সোনালি দিন ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে জুলাই মাসে একটি বৈঠক করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বৈঠকে পাট শিল্পের উন্নয়নে তহবিল গঠনের বিষয়টি উত্থাপন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধি জানান, বাজেট থেকে বরাদ্দ দিয়ে ইডিএফের আদলে পাট শিল্প উন্নয়ন তহবিল গঠন করা যেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় যদি গ্যারান্টি বা বন্ড দেয়, তাহলে পাট শিল্প খাতের উন্নয়নের জন্য স্বল্প সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তহবিল গঠন করবে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২ শতাংশ সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার পাট শিল্প উন্নয়ন তহবিল গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হবে।
পরে এ তহবিলের গ্যারান্টি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয় গ্যারান্টি দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মতি দিয়েছে।
পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নাসিমা বেগম এ প্রসঙ্গে বলেন, পাট শিল্পের উন্নয়নে ইডিএফের আদলে ১০ হাজার কোটি টাকার ফান্ড গঠনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি, এগুলো বাস্তবায়নে পাট খাত পুনরুজ্জীবিত হয়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে। বাংলাদেশ জুটমিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান ড. মো: মাহমুদুল হাসান বলেন, দেশের স্বার্থে মৃতপ্রায় পাট খাতকে পুনরুদ্ধার করা সবার দায়িত্ব। নীতিগত পরিবর্তন এনে রফতানি উন্নয়ন তহবিলের আদলে ২ শতাংশ সুদে পাট শিল্প খাত যেন ঋণ নিতে পারে, সেজন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন জরুরি।