বাংলাদেশের উন্নয়ন ও যুব-জাগরণ

লেখক : মিল্টন বিশ্বাস অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

১ নভেম্বর জাতীয় যুব দিবস। এ বছরের (২০১৭) প্রতিপাদ্য হলো—‘যুবদের জাগরণ, বাংলাদেশের উন্নয়ন’। ১২ আগস্ট ছিল আন্তর্জাতিক যুব দিবস। সেখানে প্রত্যয় ছিল ‘শান্তিময় বিশ্ব আমরা তরুণরাই গড়ব’। এরই মধ্যে ‘জাতীয় যুবনীতি ২০১৭’ ঘোষিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত অঙ্গীকার অনুসারে শেখ হাসিনা সরকার দেশের যুবসমাজকে গঠনমূলক কাজে উৎসাহী করছে। আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাদের সহযোগিতা ছাড়া দেশের অগ্রগতি অসম্ভব—এ উপলব্ধিও রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবার। তবে দেশের অগ্রগতি জানান দিচ্ছে যুবসমাজের এগিয়ে চলা যথার্থই ঘটছে দিকনির্দেশনামাফিক।

জাতীয় যুবনীতিতে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে যুব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আদমশুমারি ২০১১ অনুযায়ী দেশে যুব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা চার কোটি ৮০ লাখ ২৪ হাজার ৭০৪, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই বিপুল যুবশক্তির মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের শিক্ষায় শিক্ষিত বেকার যুবক বা যুব নারীদের জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস সরকারের একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসূচি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের ২০টি জেলায় দরিদ্রতম ৪৮টি উপজেলার এক লাখ ১২ হাজার ৬৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং এক লাখ ১০ হাজার ৩৫১ জনের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। ৭ নভেম্বর ২০১৬ মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেশের ৬৪ উপজেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি সম্প্রসারণের খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন লাভ করে।

যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে উৎপাদনমুখী ও দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে অত্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ নিউ ইয়র্কে UN-Women এবং Global Partnership Forum প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে Planet 50-50 Champion-এর স্বীকৃতি দেয় এবং Agent of Change Award প্রদান করে। ৩৬ পরিবারভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২৩৬টি উপজেলার ছয় লাখ ২২ হাজার ৮২১ জনকে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ আদায়ের হার ৯৭ শতাংশ। যুব প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৬৪টি জেলার ৪৮৫টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন এলাকার ১০টি থানায় ১৮ লাখ ৮৬ হাজার ২৮৪ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান অব্যাহত আছে। ঋণ আদায়ের হার ৯৪ শতাংশ। ঋণ বিতরণের টাকার পরিমাণ অপ্রাতিষ্ঠানিক ট্রেডে ৫০ হাজার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেডে এক লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৯ বছর ধরে চলছে জনবান্ধব অন্তর্ভুক্তিমূলক এক সচেষ্ট উন্নয়ন অগ্রযাত্রা। ভিশন-২০২১, রূপকল্প-২০৪১, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট সামনে রেখে অভূতপূর্ব উন্নয়ন কার্যক্রম হচ্ছে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগ ও ১০টি অর্থনৈতিক মেগা প্রকল্প উন্নয়নের গতিধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্যাপক উন্নয়নের ফলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতে, ‘যুবকরাই জাতির প্রাণশক্তি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক। যুবসমাজের দৃপ্ত পদচারণে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে এবং অনাগত দিনগুলোতেও তা অব্যাহত থাকবে। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, অমিত তেজ ও সাহস, কর্মস্পৃহা ও কর্মক্ষমতা দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘যুবকরাই জাতির প্রাণশক্তি, দেশের মূল্যবান সম্পদ এবং দেশের মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতীক। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুব। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মধ্যে নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলা সম্ভব।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যুবকদের সংগঠিত করে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে উজ্জীবিত করেছিলেন, উদ্যমী করেছিলেন। এই যুবকরাই মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। এখন তাদের জাগরণেই দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের ঘটনার পর শিক্ষিত যুবসমাজের একাংশের প্রতি জনমনে আতঙ্ক জাগ্রত হয়। সে বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় যুব দিবসে বলেছিলেন, ‘আমাদের যুবশক্তি বিপথে যাক চাই না।’ সে সময় যুবসমাজকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থেকে নিজস্ব মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি এবং পারিবারিক জীবনকে সুন্দর করার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফার সংগ্রাম, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে যুবসমাজ সম্পৃক্ত ছিল। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে এ দেশের যুবসমাজ আত্মত্যাগের যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, জাতি তা চিরদিন স্মরণ করবে। আমাদের যুবসমাজকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে। দেশের উন্নয়নে যুবকদের ভূমিকা রাখতে হবে।’ তবে এ দেশের যুবসমাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে একত্র হয়েছে—জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হলে তার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের পক্ষে থেকেছে। অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে রাস্তায় নেমেছে। এদিক থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদিতায় কিছুসংখ্যক যুবক-যুবতীর সম্পৃক্ততা শেষ কথা নয়। বরং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বেশি। এ জন্য যুবসমাজকে নিয়ে হতাশার কিছু নেই। ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে ভিশন-৪১ ঘোষণা করা হয়েছে। সব আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টা সে লক্ষ্যে নিবেদিত। এ জন্য যুবদের সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সততা, আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে কর্তব্য পালন করলে আমরা অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব। আর এভাবেই জাতীয় যুব দিবসের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।