বাড়ছে ওষুধ রপ্তানির বাজার

ওষুধ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এক সময় চাহিদার ৭০ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি হতো। আর এখন দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বিশ্বের ১২৭ দেশে বাংলাদেশের প্রস্তুত ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এ ছাড়া ওষুধ প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরেই প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজার। আর ৬৫০ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়।ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে দেশের দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে, যার মধ্যে বড় ১০ কোম্পানি দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশ মিটিয়ে থাকে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, ইতালি, কানাডা, স্পেন, নেদারল্যান্ডসসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। বড় ২০ কোম্পানি বিবেচনায় নিলে তারা মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ সরবরাহ করছে। আর ৪০ কোম্পানি ১৮২টি ব্র্যান্ডের সহস্রাধিক রকমের ওষুধ রপ্তানি করে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি হয়েছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের ওষুধ। আর গত বছর পুরো সময়ে আয় হয়েছে ৮ কোটি ২১ লাখ ডলার বা ৬৫০ কোটি টাকা।উদ্যোক্তারা বলছেন, স্বল্প মূলধন ও ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখায় বিদেশি বাজারে দেশীয় ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ওষুধের দাম অনেক কম। আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের ওষুধবাণিজ্যের ১০ শতাংশ দখল করা সম্ভব। এতে ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। একই সঙ্গে এ খাতে ২ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অনেক কোম্পানিই এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। একই সঙ্গে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশ কিছু কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ অন্য দেশে ওষুধ রপ্তানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে।ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, এ শিল্পের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। এর বড় কারণÑ দেশে কাঁচামালের অভাব। এ ছাড়া নতুন করে তৈরি হওয়া ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্যও ব্যবসায়ীদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে।ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব এসএম শফিউজ্জামান বলেন, মুন্সীগঞ্জের এপিআই পার্কে প্লট বরাদ্দ শুরু হয়েছে। পার্ক পূর্ণাঙ্গ চালু হলে ওষুধশিল্পের কাঁচামালের জন্য আর কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। বরং আমরাই উল্টো কাঁচামাল রপ্তানি করতে পারব। তাই এপিআই শিল্পপার্কে দ্রুত গ্যাস সংযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।ওষুধশিল্প নিয়ে আয়োজিত এক মেলায় বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বলেছিলেন দেশের ওষুধশিল্প সব দিক দিয়ে পরিপক্বতা অর্জন করেছে। মান বেড়েছে, সরকারের নিয়ন্ত্রণও উন্নত হয়েছে। এখন ওষুধশিল্প উড়াল দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ১০-১২টি কোম্পানি বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বে ওষুধের রপ্তানি বাজার ১৭০ বিলিয়ন ডলারের। এর ১০ শতাংশ ধরা গেলে রপ্তানি আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার হবে।ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখনো দেশের অধিকাংশ ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে ওষুধের কাঁচামালের বাজার প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কাঁচামাল উৎপাদন করছে। এ পর্যন্ত ৪১টির বেশি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েছে। বেক্সিমকো, স্কয়ার, অপসোনিন, ইনসেপ্টা, একমিসহ ৩৫ প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল উৎপাদন করছে।অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১ হাজার ৩৩৮টি ছোট-বড় ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। বিশেষ করে বেক্সিমকো, স্কয়ার, গ্লাক্সো, রেনেটা, ইনসেপ্টা, হেলথ কেয়ার, এসকেএফ, সেনডোজসহ বেশ কিছু কারখানায় আন্তর্জাতিকমানের ওষুধ উৎপাদিত হয়। দেশের উন্নতমানের ৫৪টির বেশি কোম্পানি ৩০৩টি গ্রুপের ওষুধ রপ্তানি করে।জানা যায়, ২৭৮টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে। এ ছাড়া দেশের ২৬৬ ইউনানি, ২০৫ আয়ুর্বেদিক, ৭৯ হোমিওপ্যাথিক ও ৩২টি হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বিকাশ খুবই আশাব্যঞ্জক। বছর কয়েক আগেও জীবনরক্ষাকারী ৫০ শতাংশেরও বেশি ওষুধ আমদানি করতে হতো। এখন সেটি অনেক কমে এসেছে।সমিতির তথ্যমতে, সারা দেশে প্রায় ৩ লাখ ওষুধের দোকান রয়েছে। রাজধানী ঢাকার মিটফোর্ড ছাড়া খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে আরও ৫টি বড় ওষুধের মার্কেট রয়েছে।বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির সভাপতি ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ থেকে আমরাই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানি শুরু করেছি। যুক্তরাষ্ট্র ওষুধের জন্য একটি বড় বাজার। সেখানে ওষুধ রপ্তানির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি আমরা। এটি শুধু আমাদের জন্য নয়; দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।