টার্গেট উন্নত ২০ দেশ

উন্নত দেশগুলোয় জনশক্তি রপ্তানির বাজার অন্বেষণে এবার বিশেষ মিশনে নামছে সরকার। ২০টি নতুন দেশসহ ৫২টি দেশের শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণার জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। শ্রমবাজার সম্প্রসারণে স্বতন্ত্র একটি ‘শ্রমবাজার গবেষণা সেল’ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।যেসব দেশের শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা হবে সেগুলো হলোÑ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ইতালি, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, বেলারুশ, বেলজিয়াম, ইউক্রেন, মরিশাস, জাপান, চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান, সৌদি আরব, কুয়েত, লেবানন, উজবেকিস্তান, বাহরাইন, ব্রুনাই, মিসর, উত্তর সুদান, বসনিয়া, হার্জেগোভিনা, সালভেনিয়া, সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ, হংকং, ম্যাকাও, পালাউ ও মালদ্বীপ।

উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানিতে বরাবরই জোর দিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখহাসিনা। এ নিয়ে বাস্তবমুখী কর্মপন্থা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় উপরোল্লিখিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্র জানায়, সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে ‘বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সুযোগ : সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ’ এবং ‘ব্রাজিল, ইতালি, সিঙ্গাপুর ও কাতারের বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সুযোগ’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য সংবলিত পৃথক দুটি জরিপ চালানো হয়। জরিপের তথ্যানুসারে, সুইডেনে উৎপাদন শিল্প, পাইকারি ও খুচরা বিক্রি, অটোমোবাইল মেরামত, কৃষি, বনায়ন ও মাইনিং সেক্টরে শ্রমিক রপ্তানি এবং অস্ট্রেলিয়ায় প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কাঠমিস্ত্রি, পানির মিস্ত্রির মতো পেশাজীবীদের বিশেষ চাহিদা রয়েছে বলে সরকারকে জানানো হয়েছে। ব্রাজিলের শিল্প, কৃষি, মাইনিং, প্রকৌশল, জ্বালানি, জৈব-জ্বালানি, পানি, বর্জ্য ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় জনশক্তির বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। ইতালিতে প্রয়োজন গাড়ি তৈরি ও পর্যটন খাতে দক্ষ কর্মীর। এ ছাড়া ইতালিতে ক্রীড়া প্রশিক্ষক ও ফল উত্তোলনের কর্মীর প্রয়োজন আছে। সিঙ্গাপুরে খোলা তেল, গ্যাস ও কেমিক্যাল কারখানায় রয়েছে শ্রমিকের চাহিদা।জানা গেছে, বাংলাদেশের মোট জনশক্তি রপ্তানির ১ ভাগেরও কম হচ্ছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। এর মধ্যে বেশিরভাগ ইংল্যান্ড ও ইতালিতে এবং তাদের সবাই সেখানে গেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে। জনশক্তি রপ্তানিবিষয়ক সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের চুক্তি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পাশাপাশি অদক্ষ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশের তালিকায়ও বাংলাদেশের নাম প্রথম সারিতে।প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এ দেশে প্রতিবছর ২০ লক্ষাধিক পুরুষ ও মহিলা কর্মী শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এ বিপুলসংখ্যক কর্মীকে দেশের অভ্যন্তরে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রচলিত শ্রমবাজারগুলো ঘিরেই মূলত বৈদেশিক কর্মসংস্থান হচ্ছে। এর মধ্যে কোনো দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ কারণে কর্মী গ্রহণ বন্ধ বা স্থগিত রাখলে চাপ পড়ে দেশীয় অর্থনীতিতে।এদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান শ্রমবাজার ধরে রাখার লক্ষ্যে গত বুধবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাজার বিশ্লেষণের মাধ্যমে ২০টি নতুন দেশসহ ৫২টি দেশে শ্রমবাজার গবেষণার নিমিত্তে গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।বৈঠক সূত্র জানায়, প্রবাসীদের জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৃথক চ্যানেল করা, লাগেজ দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রাপ্তি এবং প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি প্রদানের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একটি স্বতন্ত্র শ্রমবাজার গবেষণা সেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের গুরুত্ব অপরিসীম বিবেচনায় সরকার বিদ্যমান শ্রমবাজার ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির চেষ্টায় অব্যাহত আছে। এ ছাড়া কর্মী নিয়োগকারী দেশের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ও আধুনিক বৃত্তিমূলক কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয় বৈঠকে।মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, উন্নত দেশের চাহিদা বিবেচনায় প্রচলিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উন্নয়ন করা হয়েছে। অধিক হারে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত প্রশিক্ষণের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে এবং এদের সহযোগিতা গ্রহণের কার্যক্রম চলছে।জানা গেছে, সরকারের পূর্বপরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় শ্রমবাজার অন্বেষণে দুই দফা জরিপ চালানো হয়েছে ইতিপূর্বে। উল্লিখিত দেশগুলোর কয়েকটির সঙ্গে জনশক্তি পাঠানোর বিষয়ে চুক্তিও হয়েছে। জাপান ইতোমধ্যে শিক্ষানবিশ কর্মী নেওয়ার ব্যাপারে চুক্তি সম্পাদন করেছে। এ ছাড়া ব্রাজিল, ইতালি, আফ্রিকার কিছু দেশ, সুইডেন, কাতার, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিএমইটি সূত্রও একই তথ্য দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় বিএমইটির নিজস্ব গবেষণা সেল থেকে চালানো জরিপ শেষে সম্প্রতি সরকারকে এমন তথ্য জানানো হয়েছে।