ফ্রি চিকিৎসার অনন্য নজির

সুপরিসর আয়তন। দামি সব বিছানাপত্র। নামিদামি একঝাক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। দৃশ্যত ব্যয়বহুল কিংবা কথিত কোনো ফাইভস্টার ধরনের হাসপাতাল। দূর থেকে যেন নিম্ন আয়ের বা দরিদ্র কোনো মানুষের কাছে ওই হাসপাতালে চিকিৎসার কথা ভাবাও দুষ্কর মনে হয়। এত বড় হাসপাতালে অনেক খরচ—এমন ভাবনাই পেয়ে বসতে পারে যে কাউকে। কিন্তু বাস্তবে পুরোটাই উল্টো। বরং কাছে গিয়েই দেখা মিলে বিনা মূল্যে চিকিৎসার মহতী এই প্রতিষ্ঠানের। আপাতত ৩০০ বেডের ওই হাসপাতালের ১০০ বেডেই শুরু হয়েছে গরিব রোগীদের জন্য সব ধরনের ফ্রি চিকিৎসা। এর পাশাপাশি অন্যদের জন্যও রয়েছে নামমাত্র খরচে একই মানের উন্নত সব চিকিৎসার সুবিধা। বিশ্বমানের এমন চিকিৎসাসেবা দিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে গরিব মানুষের কাছে চিকিৎসার ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
গতকাল শনিবার ওই হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বিশ্বমানের অনন্য সেবার নানা নজির। পিত্তথলিতে পাথর নিয়ে গত শুক্রবার ভর্তি হয়েছিলেন ইকুরিয়া এলাকার গৃহিনী রোকেয়া বেগম। মঙ্গলবার হয় তাঁর অপারেশন। এখন মোটামুটি সুস্থ। এমন বড় একটি আধুনিক হাসপাতালে এ চিকিৎসা ও অপারেশন বাবদ কত টাকা খরচ হয়েছে বা হচ্ছে জানতে চাইলে রোকেয়া বলেন, ‘এক পয়সাও তো লাগল না। সবটাই ফ্রি করছে। ’

পাশের বেডের আয়শা বেগম নিজ থেকে বলেন, ‘এইখানে কারোরই কোনো টাকা লাগে না। আমি ১৬ দিন ধইর‌্যা এইহানে আছি। সব চিকিৎসাই তো ফ্রি চলতাছে। এমন হাসপাতাল তো জীবনে এই প্রথম দেখলাম। ’

পুরুষ মেডিসিন ইউনিটের আজাহার আলী বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ, এইখানে গরিবের জন্য কোনো টাকা লাগে না। সবই ফ্রি দেওয়া হয়। তবে যারা বড় লোক বা টাকা দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাগো কাছ থেকেও এখানে নামমাত্র টাকা রাখা হয়। ’

আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. নাহিদ ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চাই কোনো গরিব মানুষ যেন টাকার অভাবে চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন। এ জন্যই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গরিবদের জন্য এখানে বিনা মূল্যে সব চিকিৎসা পরিচালনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আপাতত ১০০ বেড ফ্রি করা হলেও পর্যায়ক্রমে ২৫০ বেড ফ্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে। ’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু যে গরিবরাই এখানে চিকিৎসা পাবে সেটাও নয়, সচ্ছল মানুষও যাতে নামমাত্র মূল্যে এই বিশ্বমানের হাসপাতাল থেকে সব ধরনের সেবা পায় সে জন্য মাত্র ২০ টাকায় রেজিস্ট্রেশন আর ৫০ টাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবাও পাওয়া যাবে। আর আউটডোর খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। এটাও একটা অনন্য নজির। ’

বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় চিকিৎসা। এখন পর্যন্ত দৈনন্দিন গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ ডেলিভারি, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, স্ত্রীরোগ সেবা, শিশু সেবা, টিকাদান, চক্ষু সেবা, মেডিসিন, সার্জারি, অর্থডেপিক্সসহ চিকিৎসা ও অপারেশনসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। চলতি মাস থেকে এই হাসপাতালে গরিব মানুষের জন্য ফ্রি ১০০টি বেড চালু করা হয়েছে। এই বেডে সব ধরনের চিকিৎসা, থাকা, খাওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশন—সবই ফ্রি। এমনকি রোগীর সঙ্গে যারা থাকে তাদের খাওয়াও ফ্রি দেওয়া হয়। ভর্তি ফি এবং ওষুধও ফ্রি দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতি শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ হাসপাতালে সব রোগীর জন্য সব চিকিৎসা আউটডোর-ইনডোর পুরোপুরি ফ্রি। ভর্তি, অপারেশন, বেডভাড়া, ডেলিভারি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডাক্তার দেখানো, ওষুধ, রোগীর খাবার, ভিজিটরের খাবারও ফ্রি। পাশাপাশি রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেলিভারির রোগীদের জন্য অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিসও ফ্রি।

উপপরিচালক ডা. ওয়াহিদা হাসিন বলেন, ফ্রি ১০০ বেডের বাইরে এখানে মাত্র এক হাজার টাকায় স্বাভাবিক ডেলিভারি ও পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে ওষুধসহ সিজারিয়ান ডেলিভারি করা হয়। ৩০০ টাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়। ইসিজি ১০০ টাকা, ডিজিটাল এক্স-রে ২২০ টাকা, নরমাল বেডভাড়া ৩০০ টাকা, কেবিন সিঙ্গেল ৯০০ টাকা ও ডাবল এক হাজার ৫০০ টাকা। রয়েছে চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। এসব কারণে গত পাঁচ বছরে এ হাসপাতালটি মানুষের কাছে খুব আস্থা অর্জন করেছে। এখন গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ রোগী আসে এ হাসপাতালের আউটডোরে চিকিৎসা নিতে। এ ছাড়া ভর্তি রোগী সংখ্যা প্রায় ৩০০ বাড়ছে। বেশির ভাগই শিশু ও গাইনির রোগী। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখ রোগী এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে।

বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাজধানীসংলগ্ন কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভার ভিউ প্রকল্পের ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বমানের এ হাসপাতালটি। দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ গরিব মানুষের জন্য উন্নত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে আরেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনকে সঙ্গে নিয়ে। হাসপাতালটিতে রয়েছে ৫০০ বেডের সার্বিক ব্যবস্থাপনা। এর সঙ্গে রয়েছে বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ। এ বিশ্বমানের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করা হয় ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি।

আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের ইচ্ছায় কোনো লভ্যাংশ ছাড়াই বসুন্ধরা গ্রুপ এ প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপ এই হাসপাতাল কমপ্লেক্সের জমিসহ ভবন দিয়েছে। কলেজের জন্য ছাত্রছাত্রীদের জন্য আরো চারটি ভবন নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থেকে মানুষের সেবায় কাজ করে চলছেন। বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও, ঢাকার মগবাজার, যশোর ও কুষ্টিয়ায়ও মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল আছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত বসুন্ধরা গ্রুপ বহু আগে থেকেই স্বাস্থ্যসেবায় বিভিন্নভাবে কাজ করে আসছে। ঠিক এই ধারাবাহিকতায় বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান পিছিয়ে থাকা জনপদের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ অলাভজনক এ হাসপাতালের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা আরেকটি প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে এ হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করে। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের সুদক্ষ জনবল দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের সার্বিক চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত করছে। এ হাসপাতালে দেশের সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবার সুযোগ রয়েছে। সবক্ষেত্রেই সংযুক্ত করা হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি। এ ক্ষেত্রে বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের জমি, ভবন, যন্ত্রপাতিসহ যাবতীয় অবকাঠামোগত ব্যবস্থা করা হয়েছে বসুন্ধরার পক্ষ থেকে। এ খাতে বসুন্ধরা গ্রুপের বিনিয়োগ ২০০ কোটি টাকারও বেশি।