সম্ভাবনাময় ফার্নিচার শিল্প ছয় বছরে রপ্তানি দ্বিগুণ

ক্রেতারা এর আগে চীনা ফার্নিচার কিনলেও এখন সেখানে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় আসবাবপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো চীনের বদলে এখন বাংলাদেশি আসবাবপত্রের প্রতি ঝুঁকেছেন
বেলাল মুনতাসির
একসময় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলেও এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে নান্দনিক ডিজাইনের ফার্নিচার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। নতুনত্ব ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় গত দুই দশকে দেশের ফার্নিচারশিল্প অনেক দূর এগিয়েছে। তার প্রতিচিত্র দেখা যায় রপ্তানিতেও।
রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর (ইপিবি) হিসাবে, গত ছয় বছরে এ খাতে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্ত্মিকেও ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এতে সম্ভাবনার শিল্পটি নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছেন সংশিস্নষ্টরা।

বিশেস্নষকরা বলছেন, পৃথিবীর বড় বড় দেশের ক্রেতারা এর আগে চীনা ফার্নিচার কিনলেও এখন সেখানে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদিত আসবাবপণ্যের দামও বেড়ে গেছে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো চীন থেকে ফার্নিচার নেয়া অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তারা এখন বাংলাদেশি আসবাবপত্রের প্রতি ঝুঁকেছেন আর এভাবেই আন্ত্মত্মর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে তৈরি ফার্নিচারের নতুন বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। এতে সম্ভাবনাময় এই শিল্প অর্থনীতিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে বলে মনে করেন তারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় দেশীয় ফার্নিচারের দাম বেশি থাকায় পুরনো জাহাজে ব্যবহৃত ফার্নিচারের ওপর নির্ভর করত মধ্যবিত্তরা পরিবারগুলো। আর ঘরের শোভা বর্ধনে শৌখিন লোকেরা ফার্নিচার আনত বিদেশ থেকে। তবে এখন চিত্র পাল্টে গেছে। এখন দেশেই ভালো ফার্নিচার উৎপাদন হচ্ছে, যা দেশের মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যেই রয়েছে। এছাড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি শুরম্ন হয়েছে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের তৈরি ফার্নিচার আন্ত্মর্জাতিকমানের। এ দেশের কারিগরদের হাতে তৈরি বাহারি ডিজাইনের ফার্নিচারের ব্যাপক চাহিদা বিদেশে। তারা বলছেন, অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে আসছে তার মধ্যে ফার্নিচার একটি সম্ভাবনাময় খাত। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তৈরি ফার্নিচার বিশ্ববাজারে স্থান করে নিয়েছে। ইউরোপসহ আরব বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি ফার্নিচারের বেশ চাহিদা রয়েছে। অন্যান্য দেশেও চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ফার্নিচার রপ্তানিকারক সমিতির হিসাব মতে দেশের অভ্যন্ত্মরে ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। আর বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ফার্নিচার রপ্তানি হচ্ছে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলাররেও বেশি। প্রতিনিয়ত রপ্তানির এ পরিমাণ বেড়েই চলছে।
ইপিবির সম্প্রতি প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর মেয়াদে ফার্নিচার রপ্তানি করে বাংলাদেশ এক কোটি ৬ লাখ ডলারের সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮ শতাংশ বেশি, যদিও অর্থবছরের প্রথম প্রান্ত্মিকে এর চেয়ে বেশি রপ্তানি আয় আশা করেছিল বাংলাদেশ। জুলাই-সেপ্টেম্বর মেয়াদে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৪৫ লাখ ডলার।
সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রস্ত্মুত আসবাব বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে সর্বশেষ গত অর্থবছরে এ খাত থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার বা ৪২০ কোটি টাকা। তবে গত কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধি রয়েছে বেশি। যেমন ২০১১-১২ অর্থবছরে আয় ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ ডলার বা ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে খাতটির রপ্তানি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তবে এই বৃদ্ধি অনেকটা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে। যেমন ২০১২-১৩ অর্থবছরে ফার্নিচার রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫.৭৩ শতাংশ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩৫.৫৬ শতাংশ। আবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। সে বছর আগের বছরের তুলনায় ৮.৫৫ শতাংশ কম রপ্তানি হয়েছে ফার্নিচার। তার পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি আবার ধনাত্মক অবস্থায় ফিরে এসেছে। যেমন ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৮.৮০ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৩.৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের তৈরি ফার্নিচার বিশ্ববাজারে রপ্তানির জন্য একটি সম্ভাবনাময় খাত।
ইপিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার রপ্তানি বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি করার জন্য ইতোমধ্যে রপ্তানি পণ্য সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সে মোতাবেক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এ প্রচেষ্টার সুফল পেতেও শুরম্ন করেছে। বাংলাদেশের তৈরি ফার্নিচার নতুন রপ্তানি পণ্যের মধ্যে একটি। তারা বলছেন, এটি বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি খাত। এতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি পাবে, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। রপ্তানি পণ্য সংখ্যা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ফার্নিচারকে বেছে নেয়া হয়েছে।
তবে রপ্তানিতে সরকারের নগদ আর্থিক সহায়তা বাড়লে ও অপরিহার্য কিছু কাঁচামালে আমদানি শুল্ক কমলে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় খাতটি আরও এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন সংশিস্নষ্টরা। এছাড়া দক্ষ কারিগর, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবও বোধ করছেন তারা।