পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ মহাপ্রকল্প

মহেশখালী দ্বীপের মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠছে দেশের সর্ববৃহৎ জ্বালানি কেন্দ্র বা এনার্জি হাব। এর অন্যতম দিক হচ্ছে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ মেগাপ্রকল্প। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। শুধুই বিদ্যুতের অভাবে বিনিয়োগ-শিল্পায়ন, রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্য মন্দাদশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বিদ্যুৎ ঘাটতি নিরসন করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এই মেগাপ্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর সিংহভাগই জাপান অর্থায়ন করবে। দশ বছরের রেয়াতি সুবিধাসহ এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৪০ বছরে। সুদের পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। গোড়াতে ৬শ’ মেগাওয়াটের দুইটি ইউনিট থেকে ১ হাজার ২শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। তবে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে ইউনিটের সংখ্যা ও উৎপাদন ক্ষমতা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হবে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির, সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। পাহাড়-বন, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং সমুদ্র উপকূলভাগের উপর কোন রকম বিরূপ প্রভাব যাতে না পড়ে সেটি নিশ্চিত রেখেই উন্নততর কারিগরি প্রযুক্তির সন্নিবেশন থাকছে। এরজন্য আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হচ্ছে।

মেগাপ্রকল্প কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে আমদানিকৃত কয়লা খালাস ও মজুদের জন্য জেটি-বার্থ নির্মাণ, মাতারবাড়ী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় আরও কিছু ভৌত ও কারিগরি অবকাঠামো। প্রস্তাবিত জ্বালানি হাবসহ সমগ্র কক্সবাজারে এখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে যাবে মাতারবাড়ীর বিদ্যুৎ। যা শিল্প-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রসারিত করবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার বিশেষজ্ঞরা মাতারবাড়ীর ভূ-প্রাকৃতিক ও অবকাঠামো সুবিধা সম্পর্কে নিবিড় সমীক্ষা ও গবেষণা চালান। মেগাপ্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের শেষ পর্যায়ে এখন অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে।
মহেশখালীর মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ মেগাপ্রকল্পটি আগেই চূড়ান্ত অনুমোদন পায় একনেকে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ঐকান্তিক আগ্রহে প্রকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচিত হয়। মেগাপ্রকল্পে মোট ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে জাইকার মাধ্যমে জাপান বিনিয়োগ করবে ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, সরকারি বরাদ্দ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৬৬ লাখ এবং জ্বালানি সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করা হবে ২ হাজার ১১৮ কোটি ৭৭ লাখ। মেগাপ্রকল্পের অধিভূক্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মহেশখালীর মাতারবাড়ী ও ধলঘাট ইউনিয়ন। প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সরবরাহ হবে।
জ্বালানি বিভাগ মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ মেগাপ্রকল্পের ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী। সূত্র জানায়, সেখানে নির্মিত হবে পর্যায়ক্রমে ৬টি বড় ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এ প্রকল্পে প্রয়োজনীয় পরিমাণে কয়লা আমদানি করে সাগরের ধারেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরাসরি ব্যবহৃত হবে। সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা যদি যথাসময়ে বাস্তবায়ন হয় তাহলে আগামী এক দশক ব্যবধানে মাতারবাড়ী থেকে ধাপে ধাপে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। জাপানের পরিকল্পিত মেগাপ্রকল্পের সাথে সমন্বয় রেখে কয়লাভিত্তিক আরও কয়েকটি বিদ্যুৎপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এরমধ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ উদ্যোগে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব এসেছে। এরজন্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন করছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এতে ব্যয় হবে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি তেনেগা ন্যাশনাল বারহেড ও পাওয়ারটেক বারহেডের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামের সাথে পিডিবি যুক্ত হচ্ছে। প্রস্তাবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমান অংশীদারিত্ব থাকার কথা বলা আছে। মহেশখালীতে ৭শ’ মেগাওয়াটের আরও একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সিঙ্গাপুরের সাথে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার কোটি টাকা। সরকার ও এডিবির অর্থায়নে মাতারবাড়ীতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তাছাড়া দেশি-বিদেশি আরও বিভিন্ন কোম্পানি সেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে যৌথ অংশীদারিত্ব বা উদোগের ভিত্তিতে একে একে পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসছে। মাতারবাড়ী ছাড়াও মহেশখালীর অন্যান্য স্থানে এবং পাশের দ্বীপ কুতুবদিয়ায়ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এলএনজি, এলপিজি, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমন্বয়ে জ্বালানি হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। সেখানে বন্দর সুবিধা সৃজনের দিকটি তদারক করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, মাতারবাড়ীর বন্দর সুবিধায় উদ্যোক্তারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে কমপক্ষে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে সরকার আশাবাদী। এ লক্ষ্য নিয়ে কয়লা আমদানিতে সেখানে বন্দর জেটি-বার্থের সুবিধাসমূহ গড়ে তোলা হচ্ছে। সেই সাথে তৈরি হবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাতারবাড়ীতে পর্যায়ক্রমে ৬শ’ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৪টি (২৪শ’ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এ ব্যাপারে জাপান অর্থায়নে সায় দিয়েছে। জাইকা সেখানে ৪টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ৮০ শতাংশ অর্থায়নে আগ্রহী। এক্ষেত্রে সুদের হারও সর্বনিম্নে রাখার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। সমন্বিত এসব প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ হাজার কোটি টাকা। তিন ধাপে এ মেগাপ্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে ২০২৩ সাল নাগাদ।
প্রথম ধাপে ৬শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপনের কাজ ২০১৮ সালে শেষ করার টার্গেট রাখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি-প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়ে জাপানের সুমিতোমো ও মারুবেনি কর্পোরেশন প্রকল্প প্রস্তাব সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। এ প্রকল্প নির্মাণকাজের জন্য প্রাক-যোগ্যতা দরপত্রে (প্রি-কোয়ালিফিকেশন) এ দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। জাইকার সাথে উভয় প্রতিষ্ঠান মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ মেগাপ্রকল্প, পোর্ট-সুবিধাসহ জ্বালানি হাবের নির্মাণ কার্যক্রমে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পটি জাইকার পরিকল্পনায় বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ও সর্বোচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এটি হবে অত্যধিক জ্বালানি সাশ্রয়ী (আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল) প্রযুক্তির, যাতে তাপীয় দক্ষতা (থার্মাল এফিসিয়েন্সি) হবে প্রায় সাড়ে ৪১ শতাংশ। মেগাপ্রকল্পটি কয়লাভিত্তিক হলেও যাবতীয় বর্জ্য নির্গমনে সর্বাধুনিক কারিগরি প্রযুক্তি অনুসরণ করা হবে। এরফলে পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমুদ্র উপকূলভাগ ও জীববৈচিত্র্য বান্ধব হয়ে উঠবে এই মেগাপ্রকল্প।