ইইডিতে দুর্নীতি আর টেন্ডারবাজির দিন শেষ

গত আট বছরে সারাদেশে ১০ হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় একাডেমিক ভবন নির্মাণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কাজ চলছে আরও আড়াই হাজার ভবন উন্নয়নের। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর (ইইডি) অতীতের সকল ব্যর্থতাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করছে সফলতার সঙ্গে। এক সময় যে অধিদফতর ছিল দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, সংঘর্ষের কেন্দ্র সেখানে এখন কেবলই উন্নয়ন। পুরো কার্যক্রম ই- টেন্ডারিংয়ের আওতায় আনায় যেমন বন্ধ হয়েছে টেন্ডারবাজদের দৌরাত্ম্য তেমনি কাজে এসেছে স্বচ্ছতা। নামকাওয়াস্তে ভবন নির্মাণের দিন শেষ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এখন প্রতিটি স্থাপনায় থাকছে নান্দনিকতার ছোঁয়া।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়, সেভাবে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার টেকসই ভবন নির্মাণ করতে হবে। এখন সেভাবেই ইইডি কাজ করছে। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ইইডি সারাদেশে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে। এ উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত আছে এবং নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত সাড়ে আট বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী সকলেই বলছেন, শিক্ষার অন্যান্য সূচকের চেয়ে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে। বরং গত আট বছরে নান্দনিক ভবন নির্মাণ, আধুনিক ক্লাসরুমসহ অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর। কাজে অগ্রাধিকার পাচ্ছে পিছিয়ে থাকা ও অনগ্রসর অঞ্চলও। এসব ভবনে থাকছে পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার ছোঁয়া। যারাই এখন কাজের জন্য আসছেন তারা সকলেই সন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, একসময় টেন্ডার নিয়ে সংঘর্ষ যেখানে ছিল চিরাচরিত দৃশ্য, সেখানে এসেছে পরিবর্তন। শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণে খুশি হলেও এই সুনাম অক্ষুণœ রাখার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ৮ বছর ধরে প্রতিবছর শতকরা ৯৯ ভাগ উন্নয়ন কর্মকা- যথাসময়ে বাস্তবায়ন করেছে। এ সুনাম অক্ষুণœ রাখতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশের জন্য মানসম্মত ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছর জুন পর্যন্ত ১২ হাজার ৪৯৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে ১০ হাজার ১১টি ভবনের। প্রকল্প চলমান রয়েছে ২ হাজার ৪৮৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে সরকারী ও বেসরকারী মাধ্যমিক স্কুলের প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ৮ হাজার ৯০২টি। যার মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে ৭ হাজার ৮৫১টি এবং চলমান রয়েছে এক হাজার ৫১টি। সরকারী ও বেসরকারী কলেজের ভবন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২ হাজার ১২৬টির। এর মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে ৯৭৭টি এবং চলমান আছে এক হাজার ১৪৯টি। সরকারী ও বেসরকারী মাদ্রাসায় ভবন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয় এক হাজার ৪৭১টি। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রকল্প সমাপ্ত হয়ে গেছে এক হাজার ১৮৩টির এবং চলমান রয়েছে ২৮৮টি মাদ্রাসার ভবন নির্মাণ কাজ।

২০০৯ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত দেশে ৫টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও ৩টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের নির্মাণ কাজ চলছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৩৮৯টি টেকনিক্যাল কলেজ স্থাপন করা হবে। ঢাকা শহরে ১১টি সরকারী স্কুল ও ৬টি সরকারী কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা, খুলনা ও সিলেটে ৭টি নতুন সরকারী স্কুল স্থাপন কাজও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। রাজস্ব বাজেটে মেরামত মঞ্জুরি খাতের আওতায় ৪ হাজার ৬৯৭টি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরামত ও সংস্কার কাজ করা হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে ২০০টি সরকারী কলেজ ও ৩২৩টি সরকারী স্কুলের উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। এই কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৮০৫ কোটি ও ৪ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া তিন হাজার বিদ্যালয়ের নতুন ভবন ও তিন হাজার ২৫০টি বিদ্যালয়ের ভবন সম্প্রসারণ প্রকল্প এর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির কাজ চলছে। এছাড়া দুই হাজার মাদ্রাসার ভবন নির্মাণ প্রকল্প একনেক সভায় উপস্থাপনের প্রক্রিয়াধীন আছে। বর্তমান অর্থবছরে ৮ হাজার ৭৭৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একযোগে ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করার বিষয়ে আশাবাদী শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত তিন বছরে সরকারী- বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় ছয় হাজার ১০৪টি, সরকারী- বেসরকারী কলেজ দুই হাজার ৪১৪টি, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটে ১২টি এবং অন্যান্য বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০৪টি মোট ৮ হাজার ৭৩৪টি শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। এই সময়ে আন্ডারসার্ভড এরিয়ায় ২৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন, ১০৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, ছাত্রীদের আবাসনের জন্য মহিলা কলেজে ও সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৪টি হোস্টেল নির্মাণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ১০ হাজার ৫১৪টি সরকারী- বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরামত ও সংস্কার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার ভবন নির্মাণ, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, পলিটেকনিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভবন নির্মাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর খুলনায় পাইকগাছা কৃষি কলেজ স্থাপন, সখীপুরে মহিলা কলেজের জন্য ৫০০ আসনবিশিষ্ট ছাত্রীনিবাস নির্মাণ করেছে। সদর দফতর ও জেলা কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর শক্তিশালী করা, নির্বাচিত বেসরকারি মাদ্রাসাসমূহে একাডেমিক ভবন নির্মাণ, নির্বাচিত বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, এ্যানহান্সম্যান্ট দি লার্নিং এনভায়রনমেন্ট অব সিলেকটেড মাদ্রাসা ইন বাংলাদেশ, শেখ হাসিনা একাডেমি এ্যান্ড উইমেন্স কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, মাদারীপুরের কালকিনিতে ডি.কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এ্যান্ড কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, লালমাটিয়া মহিলা কলেজ ও আগারগাঁও তালতলা সরকারী কলোনি এ্যান্ড কলেজের উন্নয়ন করা হয়েছে।

চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মাধ্যমিক পর্যায়ে আরও ৬২৫টি নতুন ভবন নির্মাণ, ৫ হাজার ভবন মেরামত ও সংস্কার, ৭০৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ কাজ করা হবে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৪টি কলেজের ভবন নির্মাণ, ৬৬৬টি কলেজ ভবনের সম্প্রসারণ কাজও হবে একই সময়ে। এছাড়া অনগ্রসর এলাকায় ৩৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ, ছাত্রীদের জন্য দুই হাজার ৩৩টি টয়লেট নির্মাণ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ৬৫৯টি র‌্যাম্প নির্মাণ করা হবে। ইইডির প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোঃ হানজালা বলছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে ইইডির কার্যক্রম ইতোমধ্যেই অনলাইনের আওতায় এসেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় শিক্ষা অধিদফতরের পাশের ভবনের নবম তলায়। ইইডির অধীনে সারাদেশে ৩৮ জোনাল অফিস রয়েছে।

কাজের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ছাত্রছাত্রীদের পাঠদানের উপযোগী আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজ করে যাচ্ছে অধিদফতর। এছাড়াও টেন্ডার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। এখন জেলা থেকে বিভিন্ন কাজের টেন্ডার দেয়া হয়। ফলে শিক্ষা ভবনে আগের মতো টেন্ডার নিয়ে মারামারি, কাড়াকাড়ি হয়না। এই কাজকে এমপি, মন্ত্রীরা ভাল বলছে বলেও দাবি তার। বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্থাপনায় নান্দনিকতা নিয়ে আসা হয়েছে। এখন ভবনগুলো গড়ে তোলা হচ্ছে নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব। ছেলেমেয়েদের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা। আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন, প্রতিবন্ধীদের জন্য র‌্যাম্পের ব্যবস্থা থাকছে। ছাদগুলো করা হচ্ছে ঢালু ও টাইলস দিয়ে।